জ্বালানির জন্য ইউরোপের রুশ নির্ভরতা

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইউরোপের জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা বৃদ্ধির সঙ্গে অনিশ্চয়তার পারদও ক্রমান্বয়ে চড়ছে। জ্বালানির জন্য রাশিয়ার ওপর ইউরোপের দেশগুলোর নির্ভরশীলতা আদৌ কি কাটানো সম্ভব? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া

ইউক্রেনে হামলার পর রাশিয়ার ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশসহ পশ্চিমারা। জার্মানিভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলের হিসাব অনুযায়ী, ২৪ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরুর পর দেশটির ওপর তিন হাজার ছয়শোর বেশি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতি থেকে প্রকারান্তরে রাশিয়াকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তবে এসব নিষেধাজ্ঞায় রাশিয়ার অর্থনীতি বড় ধরনের ঝাঁকি খেলেও ভেঙে পড়েনি। রাশিয়ার অর্থনীতি পঙ্গু করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার বড় কারণও সেই পশ্চিমারাই। সহজ করে বললে, রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদের ওপর ইউরোপের দেশগুলোর অতি নির্ভরতা। ইউরোপের দেশগুলোর গ্যাসের চাহিদার গড়ে ৪০ শতাংশই সরবরাহ করে রাশিয়া। তেলেরও অন্যতম বড় জোগানদাতা দেশটি। এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর জ্বালানির দামে কার্যত আগুন লেগেছে। এতে ইউরোপের দেশগুলো মধ্যম থেকে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা মেটাতে নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে। আবার রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির প্রধান বাজার ইউরোপ এবং এটি তাদের রাজস্বেরও প্রধান উৎস। সব মিলিয়ে রাশিয়া এখনো ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ করছে। তবে পাইপলাইনগুলো বন্ধ করার আশঙ্কা এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। পারস্পরিক নির্ভরশীলতার এমন পরিস্থিতিতে দুপক্ষই দ্বিচারিতার আশ্রয় নিয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ক্রেমলিনের ওপর ইউরোপ নানা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও এড়িয়ে গেছে জ্বালানি খাতকে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে তারা রাশিয়াকে বিশ্বব্যবস্থা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন করে ফেলার চেষ্টা যেমন করছে, একই সঙ্গে দেশটির সঙ্গে জ্বালানি ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছে। আরেকদিকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে রাশিয়া জ্বালানি শক্তি যেমন ব্যবহার করছে, আবার ইউরোপে তেল, গ্যাস সরবরাহও ঠিক রাখছে।

জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক দেশ রাশিয়া। এ অবস্থান অবশ্য মাঝেমধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে ওঠানামা করে। রাশিয়া প্রতিদিন প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে, যার অর্ধেকের মতো ব্যবহৃত হয় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে। বাকি অর্ধেক তেলের একটি বড় অংশ রপ্তানি করে ইউরোপের দেশগুলোতে এবং আরেক অংশ যায় চীনে। জ্বালানির আরেকটি বড় উৎস প্রাকৃতিক গ্যাসের চেয়ে ইউরোপে তেলের চাহিদা বেশি। কারণ গ্যাস সংরক্ষণ এবং পরিবহনের জন্য জটিল অবকাঠামো প্রয়োজন, যেখানে তেল যেকোনো স্থান থেকে সহজে সংগ্রহ ও সরবরাহ করা যায়। আবার অনেক দেশ এবং অঞ্চল রাশিয়ার মানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। গ্যাসের তুলনায় সবচেয়ে বেশি আয়ও তেল থেকে করে রাশিয়া। ২০২১ সালে তেল রপ্তানি থেকে দেশটির আয় ছিল ১১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বিভিন্ন দেশে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি থেকে আয়ের দ্বিগুণ।

ইউরোপ তার জ্বালানি শক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশ পায় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে। ২০১৯ সালে সেই গ্যাসের ৪১ শতাংশই সরবরাহ করেছিল রাশিয়া। গ্লোবাল এনার্জি পলিসি সেন্টারের গবেষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অ্যানি সোফি করবেউ জানান, ২০২০ সালে তুরস্কসহ ইউরোপের দেশগুলো প্রায় ১৮৫ বিলিয়ন ঘনমিটার (বিসিএম) রাশিয়ান গ্যাস আমদানি করে। এর মধ্যে ১৬৮ বিসিএম সরবরাহ হয় পাইপলাইনের মাধ্যমে এবং ১৭ বিসিএম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে। এটি ইউরোপের ৫১২ বিসিএম গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩৬ শতাংশের সমান। শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাব করলে ২০২১ সালে রাশিয়া থেকে ১৫৫ বিসিএম গ্যাস আমদানি করে জোটভুক্ত দেশগুলো। এর মধ্যে ১৪২ বিসিএম পাইপলাইনের মাধ্যমে এবং ১৪ বিসিএম এলএনজির মাধ্যমে। ইইউ তার গ্যাস আমদানির ৪৫ শতাংশ এবং মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই নিয়েছে রাশিয়া থেকে। সব মিলিয়ে ইউরোপের জ্বালানি বাজারে রাশিয়ার আধিপত্যের বড় জায়গা গ্যাস। বিশাল মজুদ এবং বিস্তৃত সরবরাহ পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া এটি ধরে রেখেছে। কারণ ইউরোপে গ্যাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস নরওয়ে সরবরাহ করে মাত্র ১৬ শতাংশ। এটিও দিন দিন কমছে।

কতটা নির্ভরশীল ইউরোপ

অর্থনৈতিক নির্ভরতার হার পরিমাপে দেখা হয়, কোনো দেশ বা অঞ্চল তার শক্তির চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর কতটা নির্ভরশীল। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, ২০১৯ সালে ইইউর নির্ভরতার হার ছিল ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক এ ব্লকের অর্ধেকেরও বেশি শক্তির চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। এর মধ্যে কিছু দেশ যেমন এস্তোনিয়া প্রায় সম্পূর্ণটাই রাশিয়ার জ্বালানি ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা হিসাব করলে নির্ভরতার মাত্রা আরও বেশি। গত দশক থেকেই ইউরোপের দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে কমতে শুরু করেছে। একবিংশ শতকের প্রথম দশকেও চাহিদার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই ইউরোপ উৎপাদন করেছে। ওই সময় নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও যুক্তরাজ্য ছিল গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী দেশ। তবে গত ১০ থেকে ১৫ বছরে যুক্তরাজ্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমছে। এ ছাড়া একসময় ইউরোপের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র নেদারল্যান্ডসের গ্রোনিংজেনে ভূমিকম্পের কারণে গ্যাস উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমেছে। ক্রমহ্রাসমান উৎপাদনের কারণে ২০১৬ সাল থেকে ইউরোপে ৮০ বিসিএমের বেশি গ্যাস আমদানি বেড়েছে। গত ১০ বছরে দেশগুলো এলএনজি পুনর্গঠন ক্ষমতা বাড়িয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বর্তমানে প্রায় ২৫০ বিসিএম এলএনজি পুনর্গঠনের সক্ষমতা থাকলেও সেই অনুযায়ী আমদানি বাড়াতে পারেনি। এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে ইউরোপকে এশিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে হচ্ছে। উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়া ও লিবিয়ার মতো দেশগুলো থেকে আমদানি কমেছে। আরেক উৎস আজারবাইজানও গ্যাস সরবরাহ বাড়ায়নি। তবে রাশিয়া বর্ধিত চাহিদার সঙ্গে অনেকটা সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়েছে। সংক্ষিপ্ত সময় ছাড়া বিশেষ করে ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন ইউক্রেনের ক্রিমিয়া উপদ্বীপ দখল করে, তখনো ইউরোপে দেশটির সরবরাহ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ইউরোপের নির্ভরশীলতা বাড়ার আরেক কারণ কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করা এবং সেই চাহিদা নবায়নযোগ্য শক্তি (বাতাস, পানি ও সৌরশক্তি) থেকে মেটাতে না পারা। ২০১৬ সাল থেকে ইউরোপ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা শুরু করে। জার্মানি চেষ্টা করছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সরে আসাতে। এজন্য ইউরোপের দেশগুলো গত দশকে নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়াতে নানা পদক্ষেপ নেয়। তবে প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অধিকাংশ সেক্টরই বহুমুখী হতে পারেনি। উল্টো ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের ব্যবহার কমাতে গিয়ে উৎপাদনই উল্লেখযোগ্য হারে কমে গিয়েছিল। কয়লা থেকে সরাসরি নবায়নযোগ্য শক্তিতে আসার লড়াইয়ের মধ্যবর্তী শূন্যতা পূরণের জন্য প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর একটি শক্তির উৎসের প্রয়োজন ছিল। রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাসই মূলত শক্তির চাহিদা ও জোগানের মধ্যবর্তী এই ব্যবধান পূরণ করছে।

রাশিয়ার রপ্তানি বন্ধের প্রভাব

প্রথমত জ্বালানি এবং পাইপলাইন ফি থেকে প্রাপ্ত আয়ের জন্য মস্কোর ওপর অতি নির্ভরশীলতার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ইউক্রেনই। আর দেশটির সঙ্গে সংঘর্ষে মস্কো এবারই প্রথম তার জ্বালানি খাতকে ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বিষয়টি তেমন নয়। ২০০০ সালের পরও ইউক্রেন তার সোভিয়েত ইউনিয়নে থাকার সময়ের মতো বড় ধরনের ভর্তুকিসহ গ্যাস পেত। তবে ২০০৪ সালে কমলা বিপ্লবের পর রাশিয়াপন্থি প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর দেশটির রাষ্ট্রীয় গ্যাস উৎপাদনকারী সংস্থা গ্যাজপ্রম ইউক্রেনকে সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য পরিশোধ করতে বলে। এ ছাড়া সোভিয়েত যুগে রাশিয়ার গ্যাসের পাইপলাইনগুলো প্রায় একচেটিয়াভাবে ইউক্রেনের মধ্য দিয়ে গেলেও এরপর থেকে কিয়েভকে বাদ দিয়ে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে রাশিয়া। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো জার্মানিতে সরাসরি গ্যাস সরবরাহের জন্য নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন নির্মাণ করে রাশিয়া। ২০১১ সালে চালু করা এ পাইপলাইনের কারণে ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার নির্ভরতা অনেকাংশে কমেছে। এতে আনুমানিক ৭২০ মিলিয়ন ডলারের বার্ষিক ট্রানজিট ফিও হারিয়েছে ইউক্রেন। রাশিয়ার পাইপলাইন থেকে ট্রানজিট ফি হিসেবে বছরে আনুমানিক ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি আয় করত ইউক্রেন। গত বছরই এসব পাইপলাইন থেকে সরবরাহ ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় এ আয়ে বড় ধাক্কা লাগে। এখন গত মাসে হামলা শুরুর পর সরবরাহ আরও ব্যাহত হওয়ায় আয়ও অনেক কমবে।

এখন রাশিয়া যদি সরবরাহ কমিয়ে দেয় বা বন্ধ করে দেয় তবে ইউরোপের বাকি অংশও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে। এত দিন রাশিয়া তার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পূরণ করে এসেছে। এমনকি সংঘাতের মধ্যেও রাশিয়া এটি ঠিক রেখেছে। তবে এর আগে অনেক দেশে শীতের মাসগুলোতে জরুরি অতিরিক্ত সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছিল রাশিয়া। সেই কারণে এবার ইউরোপের দেশগুলো আরও খারাপ কিছুর আশঙ্কা করছে।

করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে সীমিত সরবরাহের কারণে ২০২১ সালে জ্বালানির দাম এমনিতেই বাড়ে। গত মাসে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর তা আকাশচুম্বী হয়। প্রাকৃতিক গ্যাসের তাৎক্ষণিক মূল্য নির্ধারণকারী সংস্থা নেদারল্যান্ডসের টাইটেল ট্রান্সফার ফ্যাসিলিটি (টিটিএফ) এখন সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে লেনদেন করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে সর্বাধিক বিক্রীত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২০১৪ সালের পর সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। জ্বালানির পরবর্তী দামের পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, উন্নত দেশগুলোতে অর্থনীতি বৃদ্ধির হার গত বছরের ৪.৪ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পরামর্শদাতা ক্যাপিটাল ইকোনমিকস সতর্ক করেছে, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি অতিরিক্ত ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। এতে অনেক দেশে মুদ্রাস্ফীতির হার বিপজ্জনক ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকবে।

নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা

ইউক্রেন নিয়ে ২০২১ সালে দ্বন্দ্বের শুরু থেকেই রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কিছুটা কমায় ইউরোপ। এতে অন্য উৎস থেকে ইউরোপে এলএনজি আমদানি ১৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। ইইউ বলছে, এখন রাশিয়া গ্যাস সংযোগ বন্ধ করলেও তারা সাময়িকভাবে তা মোকাবিলা করতে সক্ষম। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, মিসর, আজারবাইজান এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে কথা বলছে ইউরোপ। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নভেম্বর ২০২১ এবং জানুয়ারি ২০২২ এর মধ্যে এলএনজি রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ করেছে। তবে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতার ক্ষেত্রে দুটি উল্লেখযোগ্য সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। পাইপলাইন দিয়ে আসা গ্যাসের তুলনায় এটি অনেক বেশি ব্যয়বহুল (৪০ শতাংশ পর্যন্ত)। কারণ এলএনজিকে প্রথমে তরলে পরিণত করে পরিবহন করতে হয়। এরপর বিভিন্ন বাসা বা কলকারখানায় ব্যবহারের আগে তা আবার গ্যাসে রূপান্তরিত করতে হয়। দ্বিতীয়ত, এলএনজি সরবরাহে তীব্র ঘাটতি। এলএনজির সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারকরা এরই মধ্যে তাদের সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি রয়েছে এবং তরলীকরণ ও রপ্তানি ক্ষমতা বাড়াতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই এখনই এলএনজি দিয়ে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটানোর কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া এশিয়াতেও প্রাকৃতিক গ্যাসের উচ্চচাহিদা রয়েছে। এখানে আবার অন্যতম আমদানিকারক রাশিয়ার বন্ধুরাষ্ট্র চীন। উদ্বেগের আরেক কারণ ইউরোপে গ্যাসের বর্তমান মজুদ। গত বছর তীব্র শীতের পাশাপাশি গ্যাজপ্রম সংরক্ষণাগারগুলো পূরণে অনীহা দেখানোয় ইউরোপে গ্যাসের মজুদ পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। রাশিয়া এখন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দিলে বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, এ দিয়ে দুই মাস এবং অন্যরা বলছে চার মাস চলা সম্ভব হবে। ইউরোপ যদি এখন শীতে বেঁচে থাকার জন্য তার গ্যাসের মজুদ ব্যয় করতে বাধ্য হয়, তার অর্থ গ্রীষ্মে মজুদের ঘাটতি পূরণে তাকে আরও বেশি ব্যয় করতে হবে। আর্থিক পরিষেবা খাতের বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের পূর্বাভাস অনুযায়ী, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ না হলেও অতিরিক্ত দামের কারণে ইউরোপের এই বছর জ্বালানি খাতের জন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মতো ব্যয় হবে, যা ২০১৯ সালের ৫০০ বিলিয়নের চেয়ে দ্বিগুণ।

ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে বা করলে রাশিয়ার ওপরও ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করলে শুধু গ্যাস থেকে গ্যাজপ্রম প্রতিদিন ২০৩ থেকে ২২৮ মিলিয়ন ডলার হারাবে। এমনিতে শত শত নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। তার ওপর এখন যদি জ্বালানি বিক্রির অর্থও না পায়, তবে চরম সংকটে পড়বে দেশটি। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে ইউরোপই। এজন্যই বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিলেও ইউরোপ এখনো জ্বালানি বিষয়ে চুপ।