সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। ঘটনার সূত্রপাত যে ইস্যুতেই হোক স্থানীয় জনগোষ্ঠী লাঠিসোঁটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করছে। হামলার ধরন ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর স্থানীয়দের বিশেষ ক্ষুব্ধতা নজরে আসে। করোনাকালে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্থানীয়রা। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মেস ভাড়া ও খাবার বিক্রি করে অনেক স্থানীয়র জীবন চলছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘাতের শুরু জাবি ছাত্রলীগের চাঁদা দাবি ও ক্রিকেট মাঠের খেলাকে কেন্দ্র করে হলেও স্থানীয়রা অপ্রত্যাশিতভাবে সব শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করেছে। ভয়ংকরভাবে স্থানীয়রা সাভারের বিভিন্ন ফেইসবুক গ্রুপে পোস্ট করে তাদের প্রতি সহযোগিতা চায়, সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সাভারবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।
তৎকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর, স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পেরেছিলাম শিক্ষার্থীদের ‘সাংস্কৃতিক আচরণের’ প্রতি স্থানীয়দের ‘বিস্ময়’ আছে যেটাকে ইংরেজিতে কালচারাল শকট বলা হয়। শিক্ষার্থীদের প্রতি স্থানীয়দের বিদ্বেষ নিয়ে জানতে তৎকালে কয়েকজন স্থানীয়র সঙ্গে আমি কথা বলেছিলাম। একজন মধ্য শিক্ষিত ভদ্রলোকের বয়ান ছিল এরকম, ‘ছেলেরময়ে একসঙ্গে বাইকে ঘুরে, আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়, জানালা খুলতে পারি না। আমার মেয়ে বড় হচ্ছে, সে এসব শিখবে’। অন্য আরেকজন বলছিল, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছেলেদের চাঁদাবাজির জন্য আমরা ব্যবসা করতে পারি না।’
গত মাসে একই রকম আরেকটি ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্থানীয় সংঘবদ্ধ বখাটে যুবক দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধর্ষকদের গ্রেপ্তারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করলে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও জনতা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। শুধুমাত্র ধর্ষণের প্রতিবাদ বা সড়ক অবরোধ এই হামলার কারণ নয়। বিভিন্ন পত্রিকার সংবাদ বিশ্লেষণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সাংস্কৃতিক ভিন্নমুখিতা উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের ‘মুক্ত চলাফেরা’ ‘সমাজের পরিবেশ নষ্ট’ ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের কারণে তাদের ছেলেমেয়ে খারাপ হয়ে যাচ্ছে’ বলে নানা ধরনের অভিযোগ স্থানীয়রা করেছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে একজন সাংবাদিকের নেওয়া এক স্থানীয়র উদ্ধৃতি ছিল এমন, ‘চিন্তা করেন ফকিন্নির পোলা, বিড়াল কান্ধে নিয়ে হাফপ্যান্ট পইরা দোকানে এসে বলে মামা বিড়ালের জন্য একটা বিস্কুট দেন তো, এটা তো ঢাকা না।’
স্থানীয়রা শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক আচরণকে তাদের প্রতি আঘাত, তাদের সাংস্কৃতিক নৈতিকতার প্রতি হুমকি মনে করছে। তারা মনে করছে এসব আচরণ ঢাকায় করা যাবে এখানে নয়। আরও ভয়ংকর ব্যাপার এই আমজনতা মনে করে বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থী মানেই খারাপ। কোনো ছেলের সঙ্গে কোনো মেয়ে একত্রে বের হবে এটা তারা মানতে পারে না। এমনকি গোপালগঞ্জের ধর্ষকরা এসব ধারণার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীকে টার্গেট করেছে বলেই মনে হয়।
অতি সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপরও স্থানীয়রা হামলা করেছে। ভাড়া নিয়ে বাসের হেলপারের সঙ্গে কথা কাটাকাটির জেরে শিক্ষার্থীরা বাস আটকালে তাদের ওপর হামলা করে স্থানীয়রা ও বাস সংশ্লিষ্টরা। খবর নিলে জানা যাবে, স্থানীয়রা নানাভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর ক্ষুব্ধ। অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চা, বাসের হাফ ভাড়া দাবি, ছাত্রলীগের চাঁদাবাজি এসব নিয়ে স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ।
ফলে এখানে দুই ধরনের প্রশ্ন রাখা যায়। এক. উচ্চশিক্ষা কি আমাদের বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। দুই. স্থানীয় জনতা বা সাধারণ মানুষ কি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ মনে করছে? তারা তো আমাদের শিক্ষার্থীদের দেশের সম্পদ ভেবে গর্ব করার কথা। শুধুই কি সাংস্কৃতিক ভিন্নমুখিতা নাকি আমরা সাধারণ মানুষের আস্থায় আসতে পারছি না? আমাদের উচ্চশিক্ষা তো আমাদের আরও বেশি দেশ সমাজ জাতি ও মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা। কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের ঘামের টাকায় আমরা গ্র্যাজুয়েট হয়েছি। সে মানুষ আমাদের নিয়ে গর্ব না করে মনে করছে প্রতিপক্ষ। আমরা কি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছি না? মানুষ কি আশাহত আমাদের ও আমাদের চর্চা নিয়ে? আমরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছি। তার মানে এই না যে, আমরা বিচ্ছিন্ন কেউ। আমরা এই কৃষক শ্রমিকের ছেলে। কিন্তু উচ্চশিক্ষা আমাদের তাদের কাছে না নিয়ে কেন দূরে নিয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে ভাবতে হবে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে আমরা কেউই গ্রামে যাই না। শহরের মধ্যবিত্ত এক জীবনে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। এই শহুরে জীবন আমাদের মূল সমাজ এমনকি পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। ফলে অচেনা-অজানা জনপদে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা থাকছে না।
কভিড লকডাউনে যখন গ্রামে আটকে ছিলাম তখন আমি বেশ কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। একটা কুকুরের শরীরের একাংশে পচন ধরে গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আমি স্থানীয় উপজেলা পশু চিকিৎসা কেন্দ্র থেকে ওষুধ এনে কুকুরটাকে সুস্থ করার চেষ্টা করলে মানুষজন আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল। কুকুরকে ওষুধ দিয়ে সুস্থ করতে চাওয়া তাদের কাছে ‘পাগলামি’। আমি গ্রামের তরুণদের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলে আরও অবাক হই। তারা দেশ ও অপরাপর বিষয় সম্পর্কে এমন ভুল ধারণা পোষণ করে রীতিমতো চোখ কপালে ওঠার মতো। আমি বুঝতে পারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন গুজব তাদের এই পরিস্থিতির কারণ। পরে আমি আমার অর্থায়নে গ্রামে পত্রিকা পড়ার ব্যবস্থা করলাম। একটি পাঠাগার দিলাম। যেখানে মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে বইয়ের পাশাপাশি বেশ কিছু শিশুতোষ ও অ্যাকাডেমিক বইও রাখি।
পাঠাগারে ইসলামি বই থাকা সত্ত্বেও পাঠাগারটি আমাকে আর চালাতে দিল না কিছু ধর্মভীরু স্থানীয়। আমার পরিবার সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হয়েও আমাকে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হয়। এটার কারণ পাঠাগার সম্পর্কে এলাকাবাসীর ভুল ধারণা। অ্যাকাডেমিক বইয়ের বাইরে বই পড়া এখানে অনেকাংশে বখে যাওয়া। এমনকি স্কুল পড়–য়াদের পত্রিকা পড়াকে সমীচীন মনে করে না। একসময় নানা বিব্রতকর পরিস্থিতির সামনে পরে আমাকে পাঠাগারটি বন্ধ করে দিতে হয়।
ফলে শিক্ষিত প্রজন্মের ভাবা উচিত তাদের বাইরে থেকে যাওয়া সমাজের বড় একটি অংশকে তারা তাদের অগ্রযাত্রায় সঙ্গে নিতে পারছে না। আমরা অনেকদূর এগিয়েছি। কিন্তু শুধুমাত্র ট্রেনের কয়েকটি বগি নিয়ে, বেশির ভাগ বগি ফেলে এসেছি বহুদূরে। ফলে সমাজে তৈরি হয়ে আছে যোজন যোজন দূরত্ব।
লেখক : শিক্ষার্থী, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি