স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু স্বাধীনতার চর্চা করা যেতেই পারে। কিন্তু দিন দিন এমন স্বাধীন হয়ে যাচ্ছেন দাতারা যে ভয় হয়, কবে না স্বাধীনতা পুরস্কারটাই পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যায়। দেওয়ার কোনো ব্যাপার থাকবে না। যার ইচ্ছা সে নিজের মতো করে নিয়ে নেবে। দায়িত্বে থাকা মানুষদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের ড্রইংরুম ভরে উঠবে দেশের সর্বোচ্চ পুরস্কারে।
এক বন্ধু বলল, ‘এখনই বা এর চেয়ে কম কী?’
‘তুমি কি আমীর হামজার কথা বলছ?’
‘আমীর হামজা একা কেন? এর আগে স্বাধীনতাবিরোধী শর্ষিনার পীরকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।’
থামতে হলো। এটা ছিল পুরস্কার নিয়ে ছেলেখেলার চূড়ান্ত। এর ফলে পরের সরকারগুলোও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিকে মোটামুটি যেমন খুশি তেমন ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছে। সব ক্ষেত্রে না হলেও সাহিত্য পুরস্কারের বেলায় তো এমনই মনে হয়। নইলে, দুই বছর আগে এই পুরস্কার নিয়ে প্রায় ফাজলামির পর আবার কেন এমন হবে! কোনো একজন সরকারি কর্মকর্তাকে সেবার পুরস্কারটা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, পরে নিয়েও নেওয়া হয়। এক বেদনাবিধুর সাক্ষাৎকারে সেই মানুষটির আর্তি কানে বাজে আজও, ‘কেনই বা দিল, কেনই বা নিল।’
মরহুম আমীর হামজার ক্ষেত্রে সুবিধার ব্যাপার হলো, তার এমন আর্তি জানানোর সুযোগ নেই। মারা গিয়ে মানুষ কিছু ঝামেলা থেকে রক্ষা পান। অবশ্য বেঁচে থাকলে তিনি ক্ষোভটা কার প্রতি জানাতেন! অপকর্ম তো তার পুত্রের করা, যিনি সরকারি ক্ষমতায় বিস্ময়কর অপচর্চা করে নিজের বাবাকে পুরস্কার দেওয়ার এই যাচ্ছেতাই বন্দোবস্ত করেছেন। তিনি আবার এমন বড় কোনো কর্তা নন। রাষ্ট্রের মাঝারি শ্রেণির একজন কর্তা যদি পুরো ব্যবস্থার চোখে ধুলো দিয়ে এমন কা- করে ফেলতে পারেন তাহলে মানতেই হয় এই ব্যবস্থাটারই একটা পোস্টমর্টেম হওয়া দরকার। আর যিনি স্বাধীনতা পুরস্কার, সাহিত্য পুরস্কারের মতো জিনিসকে পারিবারিক উপহারের বিষয় মনে করেন তেমন বোধসম্পন্ন মানুষরা কী করে মানুষের ভাগ্য নির্ণয়ের জায়গায় বসে থাকতে পারেন।
যাই হোক, পুরস্কারের দুয়েকটা অভিজ্ঞতার গল্প বলি। একবার একটা পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে কিন্তু সপ্তাহ যায়, মাস যায় পুরস্কারের আর খবর নেই। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, এই তালিকার সবচেয়ে সম্মানিত যে পুরস্কারপ্রাপ্ত তার সময় হচ্ছে না। তিনি সময় দিলেই পুরস্কার বিতরণের তারিখ চূড়ান্ত হবে। একসময় তার সময় হলো। নির্দিষ্ট দিনে পুরস্কার নিতে গিয়ে দেখি প্রধান অতিথি-বিশেষ অতিথি কেউ নন, যাবতীয় আয়োজন সেই পুরস্কার প্রাপককে ঘিরেই। ঘোষকও বারবার বলছেন, আজ পুরস্কার পাচ্ছেন অমুক...। তিনি জনপ্রিয় মানুষ। দর্শকরাও তার নাম শুনে খুব হাততালি দিচ্ছে। ঘোষক হাততালির লোভে তার নাম আরও জোরে উচ্চারণ করেন। আরও হাততালি পড়ে। তিনি এলেন। পুরস্কার বিতরণী শুরু হলো। পুরস্কার দেখে প্রায় সবার মাথায় হাত। চমৎকার কারুকাজখচিত পুরস্কার যদিও, কিন্তু বিশাল আকারের কারণে এটা বহন করে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চিন্তায় সবাই অস্থির। পুরস্কার হাতে নিয়ে অবস্থা এমন হলো যে এক-আধবার মনে হলো ফেলে দিয়ে ভেগে যাই। সম্ভব না। প্রথম জীবনের পুরস্কার। খুবই মূল্যবান জিনিস।
পুরস্কার বিতরণীর প্রধান আকর্ষণ, মানে তারকা লেখকের সেই সমস্যা নেই। তার বোঝাটা সাগ্রহে অন্য কেউ একজন হাতে নিয়ে পেছন পেছন ঘুরছে। সমস্যা দেখা দিল তখন যখন সেই পেছনের ছেলেটি নিখোঁজ হয়ে গেল। তার গাড়ি এসে গেছে, ছেলেটাকে পাওয়াই যাচ্ছে না। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল এই পুরস্কারে তার কোনো আগ্রহ নেই কিন্তু এখন দেখা গেল মুখ কালো হয়ে গেছে। চোখ পড়ল আমার দিকে। ভঙ্গিটা কেমন যেন। মনে হলো, হঠাৎ যদি তিনি বলে বসেন, ‘এটাই মনে হয় আমারটা... দেখো তো একটু।’ তাহলে আয়োজকরা নিশ্চিত আমারটা নিয়ে তাকে দিয়ে দেবেন। আমি অজানা আতঙ্কে পুরস্কারটা শক্ত করে চেপে ধরে রইলাম। কিছুক্ষণ পর ছেলেটিকে পাওয়া গেল। সে বাথরুমে গিয়েছিল। আয়োজকরা রক্ষা পেলেন। আমিও বাঁচলাম।
কিছু পুরস্কারের কায়দাটা আবার অন্যরকম। প্রথমে পুরস্কৃত হিসেবে আপনার নাম ঘোষণা করে দেবে, এরপর একদিন হাজির হবে। শিল্প-সাহিত্যে অবদানের কথা বলে ফেনা তুলে ফেলবে। তখন আপনি একটু নরম হলেন। হয়তো এর মধ্যে দু-চারজনকে বলেও ফেলেছেন পুরস্কার পাওয়ার কথা। এসময় হঠাৎ শুনবেন, ওদের যে মূল পৃষ্ঠপোষক তিনি একটু সমস্যায় পড়ে গেছেন। তাই সামান্য টাকা যদি... না না ধার হিসেবে। ধার দিয়ে মান বাঁচালেন। কিন্তু আসলে বিপদকে ডাকলেন। আপনাকে পুরস্কার দিলে মূল্য পাওয়া যায় শুনলে একে একে আসতে থাকবে একরাশ পুরস্কার প্রদানকারী।
আমার পরিচিত এক লেখক লেখালেখিতে নেমেই পুরস্কারে ভাসতে থাকল। আমরা চমকিত, ওর সাহিত্য প্রতিভা এত দ্রুত এত দিকে ছড়িয়ে পড়ল কীভাবে? ফরিদপুর, রাঙ্গামাটি, লালমনিরহাট সারা দেশে ওর সাহিত্য কীর্তির স্বীকৃতি। কিছুদিন পর পুরস্কার নিয়ে আলোচনা উঠলে দেখি মুখ ভার করে থাকে। শেষে এক দুর্বল মুহূর্তে স্বীকার করে ফেলল, ‘কী যে ঝামেলায় পড়লাম। স্বীকৃতি পেতে প্রথম দুয়েকবার কিছু টাকা দিলাম। এখন প্রতিদিন পুরস্কার দিতে আর টাকা নিতে লোক আসে।’ পুরস্কারের ফাঁদে পড়ে বেচারার বিপন্নতায় মায়া হয়েছিল। আবার রাগও হলো, কেন পুরস্কার কেনাবেচায় যাবে মানুষ?
জাতীয় পর্যায়ে অবস্থা নিশ্চয়ই অত খারাপ নয়। টাকা-পয়সার লেনদেনের ব্যাপার এভাবে ঘটে না। ঘটলে এত অন্যভাবে যে আমাদের সাধারণের মাথার ওপর দিয়ে সেসব যাবে। সেগুলো থাক, যেগুলো আমাদের মাথার আশপাশে আছে, সেগুলোতেই বরং থাকি। এটা বুঝতে পারি না, কেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাছে এসব পুরস্কারের জন্য তালিকা চাইতে হবে। মন্ত্রণালয় এবং সরকারি দপ্তরের আমলাতান্ত্রিকতার হাতে শিল্প-সাহিত্য ছাড়লে কী হয় এটার বহু প্রমাণ দেখার পরও আমাদের শিক্ষা হয় না কেন?
পুরস্কারের জন্য আবার আবেদনও করতে হয়। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগে অবাক হয়েছি এই জেনে যে, এটার জন্য আবেদন করতে হয়। ভাবুন, সাকিব আল হাসান বা মাশরাফীকে আবেদন করতে হবে। সেখানে লিখতে হবে, আমি বাংলাদেশ দলের জন্য এই এই করেছি, কাজেই আমাকে পুরস্কার দিতে মহোদয়ের মর্জি হয়। বড় খেলোয়াড়দের অনেকেই আবেদন করেন না। সাধারণরা সুযোগটা নেয়। নয়-ছয় হয় বিস্তর। আরেকটা সমস্যা, মরণোত্তর পুরস্কার। মৃত্যুর পর স্বীকৃতিতে আসলে তেমন কিছু যায় আসে না। দিলে জীবিত থাকতেই দেওয়া উচিত। নইলে বাদ।
ঢাকার বাইরে থেকে আসা এক তরুণের সঙ্গে আলাপ একবার, ওদের একটা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যেতে খুব অনুরোধ করল। কারা পুরস্কার পাচ্ছেন, এরকম কয়েকজনের নামও বলল। গিয়ে দেখি এলাহি কাণ্ড। শত শত মানুষ। এবং শত শত ক্রেস্ট। অতিথিদের একজন হিসেবে ক্রেস্ট বিতরণ আমারও দায়িত্ব। দাঁড়ালাম, ক্রেস্ট দিতে থাকলাম কিন্তু শেষ আর হয় না। বাকি যে তিনজন অতিথি, তারা বয়স্ক মানুষ, কিছুক্ষণ দিয়ে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে একে একে সটকে গেলেন। আমার বয়স বা শরীরের দোহাই দেওয়ার সুযোগ নেই। অতএব চলল। চলতেই থাকল। কিন্তু সেটা মূল গল্প নয়। গল্পটা অন্য। পুরস্কার দেওয়ার যজ্ঞ শেষে মাথা ঘুরছিল বলে বাইরে গিয়ে একটু নিঃশ্বাস নিচ্ছি। শুনতে পেলাম পুরস্কারপ্রাপ্ত দুজনের ক্ষোভের কথা। শুনে বুঝলাম, ওরা প্রত্যেকে ভেবেছিলেন শুধু তাকেই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
কৌতূহলে ঐ তরুণের কর্মকাণ্ড অনুসরণ করলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, প্রত্যেককেই ফোন করে এমনভাবে বলা হয় যে তিনি একাই পুরস্কারটা পাচ্ছেন। তার জন্যই এই আয়োজন। তিনি সেজেগুজে এসে দেখেন পুরো বাজার। মনঃক্ষুণœ হন কিন্তু আবার বলাও যায় না যে সবাইকে বাদ দিয়ে শুধু আমাকে দাও। পুরস্কার নিতে হয়। হাসিমুখে পোজও দিতে হয়। আর এভাবে পুরস্কার দিয়ে দিয়ে ছেলেটি শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে বেশ প্রতিষ্ঠিত।
এ-সবই সাধারণ ব্যক্তিগত ক্ষেত্রের স্বার্থান্বেষী অঙ্ক। রাষ্ট্রের তো আর পুরস্কার দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দরকার নেই। ও, হ্যাঁ, ছোট হওয়ার সুযোগ আছে। ঐ যে, বিদেশি অতিথিদের পুরস্কারের সোনায় খাদ মিশিয়ে দেওয়া হলো! এখন, যাকে-তাকে দিয়ে ছোট হওয়ার মিশন।
হায়রে হায়। দেশের মর্যাদার একটা আয়োজনকে ছোট করার কাজে যারা মেতে আছে তারা আবার দেশের বড় মানুষ বলে গণ্য!
লেখক সাংবাদিক ও লেখক
mustafa.mamun@gmail.com