‘মেয়েটা ঠিকই এলো কিন্তু লাশ হয়ে’

রাজধানীর মিরপুর ভাষানটেক এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় গত মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুর ১৪ নম্বরে নেভি মার্কেটের সামনে সাবিনা ইয়াছমিন (৩১) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। এ সময় আহত হয়েছে তার ছোট দুই মেয়ে। সাবিনা তার সন্তানদের নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিলেন।

নিহত সাবিনার ভাই মো. মামুন জানান, সাবিনা স্বামী রফিকুল ইসলাম ও দুই মেয়েকে (হুমায়রা ও রাহি) নিয়ে ভাষানটেক বিআরপি কলোনিতে থাকতেন। বড় মেয়ে হুমায়রা নৌবাহিনীর একটি স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়েন। হুমায়রার স্কুলে পরীক্ষা থাকায় দুপুরে দুই মেয়েকে নিয়ে রিকশায় স্কুলে যাচ্ছিলেন তিনি। ওই মার্কেটের সামনে আসলে পেছন থেকে ট্রাস্টের একটি বাস রিকশায় ধাক্কা মারে। এতে রিকশা থেকে ছিটকে আহত হন তারা। পরে পথচারীরা তাদের প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে আসলে সাবিনাকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

গতকাল বুধবার দুপুর একটার দিকে নিহত সাবিনা ইয়াসমিনকে বহনকারী লাশবাহী গাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলা সদরের পশ্চিম ভরণশাহী গ্রামে তার বাবার বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

নিহত সাবিনাকে শেষবারের মতো দেখতে এসে তার কফিনের পাশে থাকা ছোট্ট দুই মেয়ের দিকে তাকানোর সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারছিলেন না গ্রামবাসী। দুই শিশুকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনো ভাষাই তাদের কারো কাছে ছিল না।

নিহত সাবিনার বাবা সাবিনার বাবা সাইফুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মেয়ে-জামাই ও দুই নাতনি প্রতি বছরই ঈদের আমার বাড়ি আসতো। এবারও তাদের আসার কথা ছিল। দুদিন আগে আমি তাবলিগে যাওয়ার আগে মেয়েকে ফোন করেছিলাম। তখন ঈদের ছুটিতে আসার কথা জানিয়েছিল। আমার মেয়েটা এলো ঠিকই। কিন্তু লাশ হয়ে। দুই নাতনির দিকে তাকাতেও পারছি না। সেই শক্তি-সাহস কোনোটাই আমার নেই।’

সাবিনা ইয়াসমিনের ছোট ভাই পারভেজ আলম জানান, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার সাউটতলা গ্রামের বাসিন্দা নৌবাহিনীর সদস্য রফিকুল ইসলামের সঙ্গে প্রায় পনেরো বছর আগে তার বোনের বিয়ে হয়। দুই বছর আগে রফিকুল ইসলাম নৌবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বেসরকারি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন।

সাবিনার ভাই বলেন, ‘আমার বোন তার দুই মেয়েকে বড় অফিসার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন। এ জন্য তাদের নিয়ে ঢাকার ভাসানটেক এলাকায় বসবাস করতেন। সেখানে নৌবাহিনীর স্কুলে দুই মেয়েকে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাস্ট পরিবহনের বাস আমার বোনকে হত্যা করে তার স্বপ্নকেও ধূলিসাৎ করে দিল।’

বুধবার যোহরের নামাজের পর জানাজা শেষে সাবিনা দাফন সম্পন্ন হয়। প্রিয়তমা স্ত্রীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করে দুই মেয়েকে আগলে বাড়ির আঙিনায় বসেছিলেন রফিকুল ইসলাম। স্ত্রী হারানো রফিকুলকে বারবার সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তার স্বজনরা।

স্বজনদের সকল সান্ত্বনাই ব্যর্থ হচ্ছিল স্ত্রী হারানো রফিকুলের শোকের কাছে। চাপা কণ্ঠে বারবার তিনি বলে উঠছিলেন, ‘আমার সকল স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। ঘাতক বাস আমার সুখের সংসারটাকে তছনছ করে দিল। এখন অবুঝ এই দুই সন্তানকে নিয়ে কি করবো? কোথায় গিয়ে দাঁড়াব? কে নেবে মা হারা ছোট্ট দুই সন্তানদের দায়িত্ব?’