পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ (পিটিআই) বেপথু হয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের নাম। কেন এই অবস্থা হলো? কারণগুলো নিচে তুলে ধরছি।
১. ‘প্রভাবশালী মহলের’ বিষয়টির অব্যবস্থাপনা : এ সম্পর্কটি লালন করাই ছিল সবচেয়ে সহজ কাজ। কারণ এটির সঙ্গে পিটিআই-এর যোগসূত্র প্রায় জন্মসূত্রে। ২০১১ সালের দিকে কোনো এক সময়ে তাদের ছায়ায়ই পিটিআই-এর পুনর্জন্ম, পুনর্গঠন ও চাঙ্গাকরণ হয়েছিল। বিশেষ কোনো রাখঢাকের ধার না ধেরেই পিটিআই-এর ক্ষমতায় যাওয়ার পথটি লাল গালিচায় মুড়ে দিয়েছিল ‘প্রভাবশালী মহল’। ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্বপালন শুরু করেছিলেন সেই মহলের একশভাগ সমর্থন নিয়ে। পাকিস্তানে তার আগে খুব কম নেতাই এরকম সুযোগ পেয়েছেন। তবুও একের পর এক ঘটনা, ইস্যুর পর ইস্যু এবং নীতির পর নীতির মধ্য দিয়ে পিটিআই নেতৃত্ব প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে এমন সব বিরক্তি তৈরি করতে শুরু করে যা সম্পূর্ণভাবে এড়ানো সম্ভব ছিল না। শেষ পর্যন্ত আইএসআই-এর মহাপরিচালক নিয়োগের বিতর্কের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হলো চাপা উত্তেজনার আগ্নেয়গিরি। পিটিআই-এর সবাই জানতেন দলটিকে ক্ষমতায় আনার জন্য যদি একটিমাত্র সম্পর্ক ভূমিকা রেখে থাকে তবে তা হলো ওই মহল। আবার যদি একটিমাত্র সম্পর্ক থাকে যা ২০২৩ সাল পর্যন্ত এবং তার পরেও পিটিআইকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে তা-ও সেই বিশেষ মহল। অথচ এরপরও পিটিআই নেতৃত্ব এই সম্পর্ককে উড়িয়ে দিয়েছে। দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের হাতে এখন এই সম্পর্ক নষ্ট করা খারাপ সিদ্ধান্তগুলো পর্যালোচনা করার প্রচুর সময় থাকবে। কারা এই ভুলগুলো করেছে এবং কেন করেছে তা খুঁজে বের করা দরকার তাদের জন্য।
২. বিরোধীদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক গড়ে না তোলা : নিজেদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পিটিআই-এর মজ্জাগত বিভক্তি তারা বিরোধী দলে থাকার সময় ভালোভাবেই কাজ করেছে। দুই চরম বিপরীত প্রান্তকে সাদামাটা রঙে আঁকা হলে তা সহজই দেখায়। তবে কিনা সরকারে গিয়ে দলটির উচিত ছিল গিয়ার পরিবর্তন করা। বিরোধীদের সঙ্গে অন্তত একটি ন্যূনতম পর্যায়ের কাজের সম্পর্ক রাজনৈতিক তাপমাত্রাকে সহনীয় রাখত। তাতে রাষ্ট্রের কার্যাবলি অধিকতর মসৃণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো। এটি সরকারকে তার প্রধান এজেন্ডা হিসেবে প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে আরও বেশি মনোযোগ দিতেও সহায়তা করত। অথচ পিটিআই সুশাসনের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে ভুল লক্ষ্যে চলতে শুরু করল। দলটি আর কখনই এই ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। আর সেজন্যই সুশাসন বা কথাবার্তার ক্ষেত্রেও তেমন গুছিয়ে উঠতে পারেনি তারা। পিটিআই যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সেগুলো পূরণের জন্য যাদের বেছে নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ব্যবধান ছিল কল্পনাতীত।
৩. বুজদার গোলমাল : শুরুতে পছন্দটা বেশ ‘আকর্ষণীয়’ মনে হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু উসমান বুজদার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে খুব কাজের হবেন না তা স্পষ্ট হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তবুও প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জেদের কারণেই মারাত্মক ভুলটি সংশোধন করার পরিবর্তে বরং দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভুলটি একাধিক সংকটের জন্ম দিতে শুরু করে : (ক) এটি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সরকারের সংঘাতের প্রথম উৎস হয়ে ওঠে। এবং পরের বছরগুলোতে অবস্থা ক্রমে আরও খারাপ হতে থাকে। (খ) প্রদেশটির শাসনের অবস্থা শাহবাজ শরীফের সময়ের তুলনায় খুবই খারাপ হতে থাকে। এতে দলের জন্য অযোগ্যতার ধারণাটি পোক্ত হতে শুরু করে। (গ) বুজদারের ঘটনায় দলের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্যদের মধ্যকার রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনাও দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে দলাদলি, মাথাচাড়া দেয়। দলের দুর্বল নেতৃত্ব সমস্যাগুলোর সমাধান না করায় অনেক বিরক্ত সদস্য শেষ পর্যন্ত দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। বুজদার সংক্রান্ত ভুলটি অনিবার্য ছিল না। কিন্তু সময় মতো না এড়ানোয় তা পিটিআই-এর ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বাঁচার জন্য শেষ মুহূর্তে বুজদারকে ঘাড়ধাক্কা দিলেন। তাতে আগের ভুলটিই আরও খারাপভাবে ফুটে উঠেছে।
৪. নেতা বাছাই : পিটিআই যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সেগুলো পূরণের জন্য যেসব লোককে বেছে নিয়েছে তার মধ্যে ব্যবধানটি কল্পনারও অতীত। পিটিআই-এর মন্ত্রিপরিষদ সম্ভবত স্মরণকালের মধ্যে পাকিস্তানের সবচেয়ে দুর্বল। এ থেকেই বোঝা যায় কেন প্রধানমন্ত্রীকে এত ঘন ঘন মন্ত্রিসভায় রদবদল আনতে হয়েছিল। সানিয়া নিশতার এবং ফয়সাল সুলতানের মতো কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, কিন্তু সিংহভাগই এই কাজের জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। বিষয়টিকে আরও খারাপ করে তুলেছিল যা তা হলো নিজের মন্ত্রণালয়ের বদলে বিরোধীদের সঙ্গে লড়াই করার দিকেই তাদের মনোযোগ ছিল বেশি।
কাজেই টিম ম্যানেজমেন্ট এবং বাছাই প্রথম থেকেই পিটিআই সরকারের ব্যর্থতা অনিবার্য করে তুলেছিল। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণা ছাড়া সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় দূরকল্প ছিল না। এ কারণে নিজেদের কাজ দেখাতে মন্ত্রীরা আমলাদের সহায়তায় নানা অদ্ভুত প্রকল্প তৈরি করেন। অর্থ, জ্বালানি এবং তথ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে ক্রমাগত মন্ত্রী পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে এই দপ্তরগুলোতে অস্থিরতা থেকে গেছে। বিমান চলাচল, মানবাধিকার, জবাবদিহির মতো মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের বিপর্যয়কর পারফরমেন্সের প্রায় কোনোই পরিবর্তন দেখা যায়নি। এর ফলে শাসনতান্ত্রিক সংকট আরও জোরদার হয়েছে। জনমানুষের ধারণাগত ক্ষতির মাত্রা আরও বেড়েছে একগাদা মুখপাত্রের নেতিবাচক কথাবার্তায়। এরা সরকারের ভাবমূর্তি ঠিক করার চেয়ে বিরোধী দলকে ধ্বংস করার চেষ্টায় বেশি ব্যস্ত ছিলেন।
৫. অতি অহংকার ও গোঁয়ার্তুমি : নিজেদের ক্ষমতা ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি পিটিআই-এর ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ। অন্য সবার প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব (বক্তব্য-বিবৃতিতে উপহাস এবং বিদ্রƒপের মধ্য দিয়ে যা প্রায়ই প্রকাশ পেয়েছে) দলটির মধ্যে ঢুকিয়েছে বিদ্বেষের বিষ। যখন কিনা পিটিআই-এর দরকার ছিল আশা, অন্তর্ভুক্তি আর অনুপ্রেরণার বোধ জাগানো।
পিটিআই-এর কি তার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে সংশোধন করার সামর্থ্য আছে? দলটি কি আত্মম্ভরিতা ভুলে একটিবারের জন্য সারা দুনিয়াকে দোষ দেওয়া বন্ধ করে বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে ঘরের দিকে তাকাবে? একথা তো অস্বীকার করা যাবে না, তেহরিক ই ইনসাফ পার্টি একটি বাস্তবতা। কেবল মøান হয়েছে এই যা। দলটি নিজের ওপর যে অবমাননা বয়ে এনেছে তা থেকে পুনরুজ্জীবিত হতে পারবে। তবে আত্মঅনুসন্ধান করে নিজের ভুল বুঝতে সচেষ্ট হলেই কেবল তা সম্ভব হবে।
লেখক : পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। ডন অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ