আপনি যে জীবিত তার প্রমাণ কী

২০০০ সালের জুন মাসের কোনো এক দিন। ঘটনাটি কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায়। সেখানকার গণপূর্ত বিভাগের একজন সাবেক কর্মচারী আর্তুরো সুস্পে। শরীর জীর্ণ ও দুর্বল, বয়সও কম নয়, ৮৭ বছর। তিনি বাড়ি থেকে এসে পেশাদার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। মাসের টাকাটা তুলবেন। তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে শুনলেন নতুন ফরমান অনুযায়ী পেনশনের টাকা ছাড় করা হচ্ছে। তিনি সত্যিই যে বেঁচে আছেন তা প্রমাণের জন্য তাকে ‘সারভাইভাল সার্টিফিকেট’ দাখিল করতে হবে।

আজীবন পেনশন। মৃত্যুর পর পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে মৃতদের কারও কারও নাম ভাঙিয়ে একটি প্রতারক চক্র টাকা তুলে আত্মসাৎ করছে এটা সরকারের নজরে এসেছে। সরকারি তহবিলের তছরুপ ঠেকাতে সবচেয়ে যোগ্য পরামর্শদাতা আমলারই। এসব তাদেরই কাজ। পরামর্শ এলো পেনশন তোলার আগে সারভাইভাল সার্টিফিকেট জমা দিতে হবে। সার্টিফিকেট দেখে ব্যাংক কর্মকর্তারা বুঝে নেবেন মানুষটি মৃত নন, জীবিত। তাহলেই কেবল তার পাওনা পেনশনের টাকাটা দেওয়া যায়।

বোগোটার স্থানীয় সরকার কার্যালয় সারভাইভাল সার্টিফিকেট দেবে। আর্তুরো সুস্পে যে বেঁচে আছেন সেই সার্টিফিকেট জোগাড় করতে লম্বা লাইনে দাঁড়ালেন। লাইনে দাঁড়িয়েছেন প্রায় ৭০০০ বুড়ো। তারা যে বেঁচে আছেন সেই সনদ চাই।

ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত আর্তুরো সুস্পে একসময় মাথা ঘুরে পড়ে তার শ্বাস উঠল। একসময় ডাক্তার বলে দিলেন বুড়ো আর্তুরো আর বেঁচে নেই। পেনশন তোলার জন্য তার সার্টিফিকেট আর তোলা হলো না। গভর্নর আদ্রে গঞ্জালেস আর্তুরোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করলেন। সারভাইভাল সার্টিফিকেট দাখিলের প্রথা যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল। আর্তুরো সুস্পে মরে প্রমাণ করলেন মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি জীবিতই ছিলেন। তিনি প্রায় ১৩৩ ডলার পেনশন পেতেন, জীবন ধারণ করতেন এই টাকায়। মৃত্যু তাকে টাকার প্রয়োজন থেকে মুক্তি দিয়েছে। একই সঙ্গে তাকে পেনশনের লাইনে দাঁড়ানোর যাতনা থেকেও মুক্তি দিয়েছে। মৃত্যুর চেয়ে ভালো মুক্তিদাতা আর কে আছে!

এটি দেশ-নির্দিষ্ট উদাহরণ হলেও নৈর্ব্যক্তিক আমলাতন্ত্রের একটি বৈশি^কচিত্র এবং জনভোগান্তি এই অ্যাপিসোডে উঠে এসেছে। আপনি যে মৃত নন তার প্রমাণ কী? এই অ্যাপিসোডের সংবাদ ভারতের বিভিন্ন ইংরেজি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, আমি অনুসৃতির জন্য বিবিসি.কম অনুসরণ করেছি। ১৯ আগস্ট ২০১১-এর বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন : পাদেসার যাদব জীবিত আছেন এবং সুস্থ আছেন, তিনি এটা আবিষ্কার করে বিস্মিত হলেন, বাস্তবে তিনি যে হালেই থাকুন না কেন কাগজে-কলমে তিনি মৃত। তার বয়স সত্তরের কোঠার শেষের দিকে। তার কন্যা এবং জামাতার অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পর তাদের দু-সন্তানের ভার বুড়োর ওপর এসে যায়। যে গ্রামে তার জন্ম সেখানে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু জমি কন্যার সন্তানদের লালনপালন ও শিক্ষাব্যয় মেটাতে বিক্রি করলেন। কমাস পর তিনি একটি অদ্ভুত ফোন পেলেন। তিনি যার কাছে জমি বিক্রি করলেন তিনি জানালেন যে, ‘আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। আমার ভাস্তে রিপোর্ট করেছে যে একজন প্রতারক এই জমি বিক্রি করেছে, কারণ প্রকৃত যাদব অনেক আগেই মারা গেছেন।’

যাদব ফোন পেয়েই কলকাতা থেকে তার পিতৃভূমি উত্তর প্রদেশের আজমগড় এসে হাজির হলেন। তাকে দেখে সবাই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। তারা বলল, তুমি তো মৃত। আমরা তোমার শ্রাদ্ধও করে ফেলেছি। যাদব শুরুতে নিজেও থ। তিনি যে চলাফেরা করছেন, কথা বলছেন, প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন কোনোটাতেই মানুষ বিশ^াস করতে রাজি নয় যে, এই মানুষটি পাদেসার যাদব। যাদব এবং তার ভাস্তে দুজনেরই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ভাস্তে চাচার শহরের ভাড়াবাড়িতে অনেকবার এসেছে। যাদব যখন জমি বেচার পরিকল্পনা করছিলেন ভাস্তে তার বাড়িতে আসা বন্ধ করে দেয়। চাচা যাদব যেহেতু মৃত, সম্পত্তি তার সন্তানদের হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একমাত্র কন্যার মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশ বর্তেছে ভাইয়ের উত্তরাধিকারীদের ওপর। এবার ভাস্তের মুখোমুখি হলেন যাদব। ভাস্তে বলে দিল, ‘এই মানুষটিকে আমি জীবনে কখনো দেখিনি। আমার চাচা তো মৃত।’ যাদব যে জীবন্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এটা ভাস্তে স্বীকার করল না। অস্বীকৃতি জানাল আরও কেউ কেউ। যাদব দিনের পর দিন কাঁদতে কাঁদতে একসময় কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য লিভিং ডেড অব ইন্ডিয়া’র সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

এই সংস্থাটি চালান লাল বিহারী মৃতক নামের ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি, তিনি নিজেও মৃত ঘোষিত হয়েছিলেন, এখন মরণোত্তর জীবনযাপন করছেন। বিহারী হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছে। তিনি লিখতে-পড়তে শেখেননি, সাত বছর বয়সেই শাড়ির কারখানার শ্রমিক হিসেবে তিনি যোগ দেন। বয়স যখন কুড়ির কোঠায় তিনি নিজেই তার তাঁতকল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন। এজন্য ঋণ প্রয়োজন ছিল। তিনি ব্যাংকে গেলে ব্যাংক তার কাছে জামানত চাইল। তিনি তার পিতৃভূমি আজমগড়ের খলিলাবাদে স্থানীয় সরকার অফিসে গেলেন, জেলা অফিসেও ঢুঁ মারলেন, বাবার কাছ থেকে যে সামান্য জমি উত্তরাধিকার সূত্রে পাবেন তার দলিলপত্র বের করলেন। গ্রামের একজন অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করলেন। সবই ঠিক আছে, কিন্তু এর মধ্যে একটি ডেথ সার্টিফিকেট পেলেন যাতে দেখা যাচ্ছে লাল বিহারী আসলে মৃত। লাল বিহারী প্রতিবাদ করলেন, বললেন আমি তো আপনাদের সামনে দাঁড়িয়েই কথা বলছি, আমি জীবন্ত মানুষ। বিহারীকে বলা হলো তুমি যাই বলো তা শুনে কাজ নেই, তুমি কাগজে-কলমে মৃত।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অফিসে মৃত হিসেবে যখন অবিবাহিত ও সন্তানহীন বিহারীর নাম নিবন্ধনকৃত হয়ে গেল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ভাগের সম্পত্তি চলে গেল চাচার পরিবারে। এখনো লাল বিহারীর কাছে এটা স্পষ্ট নয়, এটা কি কোনো করণিক ভ্রান্তি, নাকি চাচার কোনো ষড়যন্ত্রের ফাঁদ। যাই ঘটুক বিহারী সর্বস্বান্ত হয়ে গেলেন। তার কারখানা বন্ধ হয়ে গেল, পরিবার পড়ল বিপন্ন অবস্থায়। বিহারী লড়াই ছাড়া এটা মেনে নিতে রাজি নন যে তিনি মৃত। একসময় তিনি বুঝতে পারলেন কাগজে ঘোষিত মৃত ব্যক্তি তিনি কেবল একা নন আরও বহু মানুষ স্বজনদের এমনই প্রতারণার শিকার। সম্পত্তি করায়ত্ত করার জন্য আত্মীয়রাই মৃত ঘোষণার সমুদয় কাজ করিয়েছে। বিহারী এ ধরনের জীবন্মৃতদের সংঘবদ্ধ করার কাজ শুরু করলেন। অনুমান করা গেল কেবল ভারতের উত্তর প্রদেশেই এমন কাগুজে মৃত মানুষের সংখ্যা ৪০,০০০।

লাল বিহারী নিজের নামের শেষে যোগ করলেন মৃতক, মানে মৃত। তিনি গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে পড়লেন। কিন্তু এতে কিছুসংখ্যক মানুষ অবহিত হলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হলো না। নিজের নাম সরকারি খাতায় আনার জন্য তিনি জাতীয় নির্বাচনে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তার মৃত নামে ভোটার হলেন, কিন্তু তাও যথেষ্ট নয়, তিনি তিনবার অনশন করে প্রায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেলেন। তিনি নিজেই আইন ভেঙে চাচার ছেলেকে অপহরণ করলেন। তিনি ধরে নিয়েছিলেন, এরপর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করবে, পুলিশের কাগজে জীবিত হিসেবে তার নাম লিখিত হবে। কারণ মরা মানুষকে তো আর পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারে না।

১৮ বছর জীবন্মৃত অবস্থায় থাকার পর আজমগড়ে সদ্য যোগদান করা একজন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট তার বিষয়টির প্রতি ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী হয়ে অনুসন্ধান করলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে জীবিত ঘোষণা করলেন। লাল বিহারী মৃতক তার সমিতির মাধ্যমে বহু ঘোষিত মৃতের পাশে দাঁড়িয়ে সারা ভারতের ভিকটিমদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে যাচ্ছেন। বিহারী জানালেন, সবাই তার মতো ভাগ্যবান নন, লড়াই করতে করতে কেউ মরেছেন, কেউ আত্মহত্যা করেছেন, কেউ শুরুতেই রণে ভঙ্গ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে জীবন শেষ করেছেন। অবস্থার তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। ব্যক্তি যে মৃত নন আদালত ঘুরে এর প্রমাণ আনতে ছ-সাত বছর লেগে যায়, তারপর এর বিরুদ্ধে আপিল হয়। পঁচিশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও নিজ জমিতে প্রবেশ করতে পারেননি কেউ কেউ। লাল বিহারীর আন্দোলনের মাধ্যমে কোনো কাগুজে মৃত জীবিত ঘোষিত হলে তিনি একটি ‘পুনর্জন্ম কেক’ কাটেন। চারদিকে কেকের আইমিং থাকলেও আসলে এটা ফাঁপা বাক্স বিহারী মনে করেন ভারতীয় আমলাতন্ত্রের ভেতরে বহু সদস্য এমনই ফাঁপা, সংকটগুলো তাদেরই সৃষ্টি। জীবিতকে মৃত ঘোষণার পেছনের কারিগর তারা, আবার বেঁচে আছেন স্বীকৃতি পাওয়া মানুষের অব্যাহত ভোগান্তির কারণও তারা।

যুক্তরাষ্ট্রও ব্যতিক্রম নয় : ইথেল ফ্রাঙ্ক-এর কথা ভাবুন। তার বয়স ৮৪ বছর। জীবনের কোনো পর্যায়েই তিনি জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট গ্রহণ করেননি। তিনি কখনো গাড়ি চালাননি, কাজেই তার ড্রাইভিং লাইসেন্সের প্রয়োজন হয়নি। তার কখনো অন্য দেশে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি। সুতরাং তার কোনো পাসপোর্ট নেই। তিনি কখনো এমন কিছুর জন্য আবেদন করেননি যেখানে তার জন্মনিবন্ধন সার্টিফিকেট বা সরকারি আইডির প্রয়োজন হয়। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে সাহায্যও প্রার্থনা করেননি। তবে একটি কাগজ তার ছিল। খ্রিস্টীয় যাজক যে তাকে ব্যাপটাইজড করেন সেটিই সেই ‘ব্যাপটিজমান সার্টিফিকেট’। কিন্তু এটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি আগে কখনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেননি, ঋণের জন্য আবেদন করেননি। এমনকি ভোটও দেননি। এখন এগুলো আরও অসম্ভব হয়েছে। ইথেল ফ্রাঙ্ক জীবিত না মৃত এ প্রশ্নটি অবান্তর হয়ে পড়েছে। সরকারের কোনো খাতায় তার নাম নেই। তিনি যদি মৃত্যুবরণ করেন তাকে সমাহিত করতে সমস্যা হবে তিনি কে? সরকারি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া তাকে সমাহিত করা ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি ক্লিয়ারেন্সের জন্য সরকারি পরিচয় জানা লাগবে। এটি অদ্ভুত এক ক্যাচ ২২ পরিস্থিতি  (জোসেফ হেলারের ‘ক্যাচ ২২’ পড়তে পারেন) আপনার যদি সরকারি আইডি না থাকে তাহলে সরকারি আইডি পাবেন না। এত দিনে ইথেল মৃত্যুবরণ করেছেন কি না জানা নেই। তবে এটা জানা আছে উত্তর আমেরিকায় ইথেলের মতো অন্তত এক মিলিয়ন অধিবাসী রয়েছে, যাদের জন্য অপেক্ষা করছে ক্যাচ ২২ পরিস্থিতি। মাত্র কদিন আগে ২২ মার্চ ২০২২ আসামের শিলচরের মৃত শ্যামাচরণ দাস সরকারের জরুরি চিঠি পেয়েছেন, আপনি আদৌ ভারতীয় নাগরিক কি না তার প্রমাণপত্রসহ অবিলম্বে হাজির হন।

৬ মে ২০১৬ যে মানুষটি মৃত্যুবরণ করেছেন চার বছর পর ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’ (ভৌতিক চলচ্চিত্রটি দেখুন) করে আদেশদাতার সামনে হাজির হলে তিনি স্থির থাকতে পারবেন তো? শ্যামাচরণ পুনরায় মৃত্যুবরণ করার একটি দুর্লভ সুযোগ পেয়ে গেলেন। তার পরিস্থিতি অন্যদের ঠিক উল্টো। তাকে মৃত প্রমাণ করার জন্য তার স্বজনরা সরকারি অফিসে ধরনা দিচ্ছে।

কাদম্বিনীর কথা মনে পড়ে? যাকে মরে প্রমাণ করতে হয়েছে যে তিনি মরেননি।

লেখক সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট

momen98765@gmail.com