মোমেন-ব্লিঙ্কেন বৈঠক

নিষেধাজ্ঞা উঠাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে হবে

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেছেন, ‘দায়িত্ব পালনকালে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় র‌্যাবের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু প্রসেস আছে। সেটা আমাদের কমপ্লিট করতে হবে। র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সুইচ অন-অফের মতো নয়।’ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে গত সোমবার ওয়াশিংটনে ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে মোমেনের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও ৫০ বছর উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে চেয়েছে বাংলাদেশ। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে এসব কথা জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন।

ড. মোমেন তার ব্যক্তিজীবনে সহযোগিতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে তিনি বলেন, ‘সসময় আপনাদের কাছে আমার কিছু ঋণ আছে। কারণ আমি যখন গৃহহীন, বেকার এবং রাষ্ট্রহীন ছিলামতখন যুক্তরাষ্ট্রই আমাকে একটি বাড়ি এবং একটি চাকরি দিয়েছে। আমি এর জন্য কৃতজ্ঞ।’

এদিকে, ওয়াশিংটনে আজ বুধবার বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ হবে। সংলাপে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রবিষয়ক গোপন তথ্য বিনিময় ও সুরক্ষার চুক্তি (জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট-জিসোমিয়া) নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে। এ ছাড়া অস্ত্র কেনাকাটাবিষয়ক চুক্তি (একুইজিশন অ্যান্ড ক্রসসার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট-আকসা) নিয়েও আলোচনা হবে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক এ দুটি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এর আগেই পরিষ্কার করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আকসা চুক্তি সই করে যুক্তরাষ্ট্র। একই বছর ভারতের সঙ্গে জিসোমিয়া চুক্তি সই করে দেশটি। এবার দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে এই দুটি চুক্তিই সইয়ে আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, আকসা ও জিসোমিয়া নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে। খুব দ্রুতই যে চূড়ান্ত কিছু হতে যাচ্ছে বিষয়টি এমনও নয়। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংলাপে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত সংলাপ হবে, সেটি বলা যায় না। এজন্য আরও সময়ের প্রয়োজন হবে।

জানা গেছে, সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় ওয়াশিংটন ডিসিতে উভয় দেশের মধ্যে শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এ বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন।

বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের উন্নতি এবং সম্ভাবনা তুলে ধরে বলেন, আমরা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটা বড় অর্থনীতির দেশ হবো। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও জোরদারে শেখ হাসিনার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৈঠককে ফলপ্রসূ হিসেবে অভিহিত করে ড. মোমেন বলেছেন, ‘আগামী ৫০ বছরে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়ে আমরা আশাব্যঞ্জক আলোচনা করেছি।’ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সুযোগগুলো গ্রহণ করে যাতে আরও বেশি করে তাদের বিনিয়োগ করে সেই খাতগুলোও তুলে ধরেন তিনি।

বর্তমানে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের ৯০ ভাগ এনার্জি অ্যান্ড ইলেকট্রনিক সেক্টরে। বাংলাদেশ চায় ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি খাতসহ আরও অন্যান্য খাতে এগিয়ে আসুক দেশটি। তৈরি পোশাক খাতে ট্যারিফ তুলে নিতেও বৈঠকে অনুরোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারিত্ব সম্পর্ক আরও এগিয়ে নিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

ড. মোমেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের উন্নতিতেও কাজ করবে এবং সাত কর্মকর্তাসহ বাহিনীটির ওপর দেওয়া নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে দেশটির এ সংক্রান্ত কমিটির সঙ্গে কাজ করে সন্তুষ্ট রাখতে হবে বাংলাদেশকে।

ড. মোমেন বলেন, ‘র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনকে বলেছি, র‌্যাব একটি ভালো প্রতিষ্ঠান, তাদের কারণে দেশে সন্ত্রাস কমেছে এবং র‌্যাবের জবাবদিহিতা আছে, তোমরা তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে আমরা খুশি হব। ব্লিঙ্কেন আমাকে বললেন, এটার একটা প্রসেস আছে। আমি বললাম যে, গত চার মাসে কেউ মারা যায়নি। উনি বললেন, এটা আমি জানি। এই বিষয়ে উন্নতি করতে আমরা একসঙ্গে কাজ করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘র‌্যাবের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে একটু সময় লাগবে। কেননা এটা যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। এই সংক্রান্ত কমিটির সঙ্গে কাজ করে তাদের খুশি করতে হবে, কমিটির চেয়ারম্যান-মেম্বার সবাইকে খুশি করতে হবে।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শ্রম অধিকার বিষয়ে বাংলাদেশে যেসব উন্নতি করেছে সেসব বিষয় সম্পর্কে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছি। তাদের বলেছি, আমরা আইএলও এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে পরামর্শ করে শ্রম অধিকার খাতের উন্নয়ন করছি। শ্রমিক অধিকারসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয়ে যে দুর্বলতা আছে তা কমপ্লিট রোডম্যাপ করে ঢাকা-ওয়াশিংটন সংলাপের মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার কথা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি।’

বৈঠক সম্পর্কে গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থনদানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গের ভূমিকা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী প্রতিনিধি জর্জ বুশ কর্র্তৃক বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রদানসংক্রান্ত রেজল্যুশনের পক্ষে ১৬ বারের মধ্যে ১৫ বারই সমর্থন দেওয়ার বিষয়ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

ড. মোমেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে দু’দেশের অংশীদারিত্বের কথা উল্লেখ করে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৬ কোটি ডোজেরও বেশি টিকা দিয়ে সহযোগিতা প্রদানের কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় এককভাবে বৃহত্তম সহায়তা প্রদানের কথা তুলে ধরেন।

ড. মোমেন বৈঠকে বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নয়ন ও অগ্রগতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, নারীর ক্ষমতায়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় পাশে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

বৈঠক নিয়ে ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের দেওয়া বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেন বলেন, ‘এটা খুব আনন্দের বিষয় যে আজ এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেনকে পেয়েছি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব আরও জোরদারের লক্ষ্যে আমরা একসাথে কাজ করতে পারব। আমরা আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছরপূর্তি উদ্যাপন করছি। আমাদের ৫০ বছরের এই পথচলার কথা ভাবলে, আমরা আমাদের অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করতে আগামী ৫০ বছর একসাথে কাজ করার প্রত্যাশা করি, যেমনটা আমি বলছিলাম। বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অন্য দেশগুলোকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে।’