গত সপ্তাহে ভারতের অন্যতম ধনী নারী কিরণ মজুমদার শাহ দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপির রাজনীতিবিদদের কাছে একটি অস্বাভাবিক আবেদন জানিয়ে টুইটারে একটি পোস্ট দেন।
ভারতের নেতৃস্থানীয় বায়োটেকনোলজি ফার্ম বায়োকন এর প্রধান এই ধনী নারী সাড়ে ছয় কোটি জনসংখ্যার প্রদেশ কর্ণাটকের বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি ‘ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় বিভাজনের সমাধান’ করার আহ্বান জানান। কিরণ মজুমদার শাহ-এর কম্পানি কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত, যাকে ভারতের সিলিকন ভ্যালি বলা হয়।
মন্দিরের মেলায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের স্টল স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার জন্য রাজ্যের উগ্র হিন্দু গোষ্ঠীগুলোর দাবিতে চলমান বিতর্কের মধ্যেই তার এই আহ্বান এসেছে। উগ্র হিন্দু গোষ্ঠীগুলো হিন্দুদেরকে মুসলিম কসাইদের কাছ থেকে মাংস না কেনার জন্যও আহ্বান জানিয়েছে। এবার তারা মসজিদে আজানের সময় লাউডস্পিকার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা এবং মুসলিম আম বিক্রেতাদেরও বয়কটের দাবি করছে।
গত কয়েক মাস ধরেই হিজাবপরা মুসলিম মেয়েদের কলেজে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার সরকারি আদেশের কারণে কর্ণাটকে উত্তেজনা বিরাজ করছে। আদালতও সেই আদেশ বহাল রেখেছে, এবং অনেক শিক্ষার্থী প্রতিবাদে পরীক্ষা এবং ক্লাস এড়িয়ে গেছে।
গত বছর বিজেপি সরকার এমন একটি রাজ্যে গরু বিক্রি এবং জবাই নিষিদ্ধ করেছিল যেখানে প্রায় ১৩% মানুষ মুসলমান। স্কুলের পাঠ্যক্রমে হিন্দুদের পবিত্র গ্রন্থ ভগবদ গীতা অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এবং মহীশূরের ১৮ শতকের মুসলিম শাসক টিপু সুলতানের ইতিহাসের একটি অধ্যায় অপসারণের একটি প্রস্তাবও রয়েছে, কারণ এতে তাকে মহিমান্বিত করা হয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলোর ফলে কর্ণাটকের সমাজে নানা মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকরা এগুলোকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয়তাবাদী সরকার কর্তৃক মুসলমানদের প্রান্তিক করার প্রচেষ্টা হিসাবে দেখছেন। কিন্তু অনেকের ভয় এসব পদক্ষেপ ব্যাকফায়ারও করতে পারে এবং বিশ্ব দরবারে ভারতের তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধ রাজ্যগুলোর একটি কর্ণাটকের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে।
কিরন মজুমদার শাহ তার টুইটে মুখ্যমন্ত্রী বাসভরাজ বোমাইকে ট্যাগ করেছেন এবং বলেছেন কর্ণাটক ‘সর্বদাই অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ করেছে। তথ্য ও জৈবপ্রযুক্তির শহর যদি ‘সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠে’, তাহলে এটি ‘এর বৈশ্বিক নেতৃত্ব হারাবে’।
তার এই উদ্বেগ যৌক্তিক। কর্ণাটকের অর্থনৈতিক সাফল্য বেঙ্গালুরু থেকে প্রবাহিত হয়। প্রায় ১ কোটি মানুষের এই প্রাণবন্ত এবং বিশৃঙ্খল শহর থেকেই কর্ণাটক রাজ্যের রাজস্বের ৬০%-রও বেশি উৎপন্ন হয়। বেঙ্গালুরু শহরে ১৩ হাজারের বেশি প্রযুক্তি স্টার্ট-আপ রয়েছে। ভারতের শতকোটি ডলার মূল্যের কম্পানিগুলোর প্রায় ৪০% কোম্পানিই এই শহরে রয়েছে। এই শহর থেকেই ভারতের তথ্য-প্রযুক্তি রপ্তানির ৪১% উৎপন্ন হয়।
তবুও ব্যাঙ্গালুরু এবং কর্ণাটক সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত এবং অতীতে ধর্মীয় সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছে। শহরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের অর্থনীতির অধ্যাপক নরেন্দ্র পানি বলেছেন, বেঙ্গালুরুর তথ্য-প্রযুক্তি শিল্প এর ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বগুলো’ উপেক্ষা করেই চলেছে। শহরের উপকণ্ঠে নিজস্ব অবকাঠামোতে স্থাপিত হয়েছে। যা শহরটির চেহারাই বদলে দিয়েছে।
এখন কর্নাটককে কেন্দ্র করেই বিজেপি দক্ষিণ ভারতে তার আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছে। দক্ষিণ ভারতের পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে এই একটি মাত্র রাজ্যেই বিজেপি ক্ষমতায় আসতে পেরেছে। নানা জাত-পাত, ভাষাগত গোষ্ঠী এবং ধর্মের এই রাজ্যে বিজেপি পরপর চারটি সাধারণ নির্বাচনে বেশিরভাগ সংসদীয় আসনে জিতেছে।
বছরের পর বছর ধরে রাজ্যটির উপকূলীয় অঞ্চল এবং গ্রামে, যেখানে বিপুল সংখ্যক মুসলমান বাস করে, বিজেপি কঠোর হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি অনুসরণ করেছে। বিজেপির আদর্শিক ফোয়ারা আরএসএস এখানে গভীরভাবে শেকড় গেঁড়ে বসছে। অতীতে হিন্দু গোষ্ঠীগুলো পানশালাগুলোতে যুবক-যুবতী ও নারীদের ওপর আক্রমণ করে নৈতিক পুলিশগিরি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং ‘লাভ জিহাদ’ এর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছে। কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠীগুলো মুসলিম পুরুষদের বিয়ে করার মাধ্যমে হিন্দু নারীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার ঘটনাকে নাম দিয়েছে লাভ জিহাদ।
দীর্ঘদিন ধরে কর্ণাটকের নির্বাচনী রাজনীতি মূলত জাত-পাতের আনুগত্যের মাধ্যমে নির্ধারিত হত। ২০০৮ সালে বিজেপির প্রথম জয়ে নেতৃত্ব দেওয়া বিএস ইয়েদুরাপ্পা লিঙ্গায়তদের এবং এবং অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জাতগুলোর মধ্যে একটি সফল জোট গঠন করেছিলেন। এরা রাজ্যের ভোটারদের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। কিন্তু লিঙ্গায়তদের একটি দল নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে হিন্দুধর্ম থেকে আলাদা বলে গণ্য করতে চায়। এবং সুবিধাবঞ্চিত জাতগুলোও তাদের অনূকুলে নানা পদক্ষেপের দাবি করছে। কর্ণাটক থেকে আসা একমাত্র ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবগৌড়ার জীবনীকার সুগত শ্রীনিবাসরাজু বলেন, ‘এসব ‘চাপের মধ্যে, বিজেপি এখন একটি ভিন্ন রাজনীতি তৈরি করার চেষ্টা করছে। এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে একটি নির্বাচকমণ্ডলী তৈরির চেষ্টা করছে’।
বোমাই নামের একজন স্বল্প পরিচিত ৬১ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ গত বছর ইয়েদুরাপ্পার কাছ থেকে দায়িত্ব নেন। সমালোচকরা বলছেন, তার সরকারের পারফরম্যান্স খারাপ হয়েছে। মহামারীতে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। একট অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, সরকারের অর্ধেক দপ্তর দায়িত্ব পালনে ব্যার্থ হয়েছে।
দুর্নীতিও সেখানকার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। গত নভেম্বরে এক অত্যাশ্চর্য পদক্ষেপে রাজ্যের বেসরকারী ঠিকাদাররা প্রধানমন্ত্রী মোদীকে চিঠি লিখে অভিযোগ করেন যে, তারা মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদের ঘুষ হিসেবে একটি প্রকল্পের ব্যয়ের ৪০% পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয়েছেন। উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অলস পড়ে থাকা, পরিবহন শ্রমিকদের বেতন না দেওয়া এবং সুবিধাবঞ্চিতদের বৃত্তি বিলম্বিত হওয়ার মতো খবরও রয়েছে।
আগামী বছর রাজ্যটিতে নির্বাচন হওয়ার কথা। ব্যাঙ্গালোর-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক চেঞ্জের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক চন্দন গৌড়া বলেন, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদকেই একমাত্র তাস বলে মনে হচ্ছে, যা সরকার আগামী নির্বাচনে খেলতে পারে। বড় অর্জনের মাধ্যমে তাদের দেখানোর মতো কিছু নেই’।
কিরণ মজুমদার শাহ এর ওই মন্তব্যের একদিন পর বোমাই জনগণের প্রতি ‘শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহযোগিতা করার’ আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘কর্নাটক শান্তি এবং অগ্রগতির জন্য পরিচিত, এবং প্রত্যেকের সংযম পালন করা উচিত’।
বোমাইয়ের দলের ভেতর থেকেও কিছু প্রতিবাদ হয়েছে। অন্তত দুইজন বিজেপি বিধায়ক মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এএইচ বিশ্বনাথ নামের একজন বিবিসি হিন্দিকে বলেছেন, ‘হিন্দু মন্দিরের উৎসবে মুসলিম ব্যবসায়ীদের নিষিদ্ধ করা ‘অস্পৃশ্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়... এটি একটি অমানবিক প্রথা’। অনিল বেনাকে নামের আরেকজন বলেন, ‘আমরা মুসলমানদের মন্দিরের উৎসবে ব্যবসা করা বন্ধ করব না’। সংহতি প্রদর্শনে, সাধারণ হিন্দুরাও মাংস কেনার জন্য মুসলিম কসাইয়ের দোকানের বাইরে লাইন ধরেছে।
এই সব ঘটনা আশা জাগানিয়া। কিন্তু আরো অনেক কিছু করা প্রয়োজন। দেবগৌড়ার জীবনীকার সুগত শ্রীনিবাসরাজু বলেন, ‘কর্নাটকের রাজনীতিকে ধর্মীয় মোড়ক দেওয়ার জন্য গত দুই দশক ধরেই নিরন্তরভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে বিরোধী দল, বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী এবং ব্যবসায়ীরা নীরব থেকেছে বা সাবধানে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। কিন্তু এবার তাদেরকে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে মিথ্যা ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা না করে সাহসের সঙ্গে কথা বলতে হবে’।
সূত্রঃ বিবিসি