খাদ্যের দাম বাড়ার দায় ও দায়িত্বহীনতা

মানুষের সহ্য ক্ষমতা মাপার কোনো পদ্ধতি কি আছে? আছে কি দায়িত্ববোধ মাপার কোনো মাপকাঠি? যদি থাকত তাহলে নির্দ্বিধায় বলা যেত যে এসব পদ্ধতি বা মাপকাঠি বাংলাদেশে অকার্যকর। বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীতে মনে হয় খুব কম দেশই আছে যে দেশের ক্ষমতাসীনরা কথায় কথায় স্বাধীন দেশের গর্ব আর স্বাধীনতার চেতনা সমুন্নত রাখার কথা বলেন। এবং বাজারে গেলে বোঝা যায় স্বাধীনতার বহুমুখী ব্যবহার কতভাবে চলছে দেশে। বাজারে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়াচ্ছেন স্বাধীনভাবে। তাদের স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে তৎপর সব মহল। কেউ সহায়তা করছেন যুক্তি দিয়ে। যেমন : কী করবেন, সারা পৃথিবীতেই দাম বেড়েছে, অথবা মানুষের চাহিদা বেড়েছে বহু গুণ, কিংবা মানুষের আয় বেড়ে গেছে তো তাই; আর সবচেয়ে কার্যকর যুক্তি, আগের সরকারের সময়ে দাম বাড়েনি? তখন কোথায় ছিলেন? অন্যদিকে মানুষের সহ্য ক্ষমতার কথাও ক্ষমতাসীনরা বলেন হেসে হেসে, কই দ্রব্যমূল্য নিয়ে সাধারণ মানুষের তো কোনো অসন্তোষ নেই! মানুষ ভালো আছে। এসব কথায় মানুষের গা জ্বলে যাওয়ার কথা থাকলেও মানুষ যেন নির্বিকার ভঙ্গিতে তা শুনছেন। এর অর্থ কি এই যে, মানুষের সহ্য ক্ষমতা বেড়েছে অর্থাৎ সহ্য করার স্বাধীনতা বেড়েছে? 

গত কয়েক দিন আগে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল। তাতে অংশ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রতিনিধি বলেন, ‘সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকলেও খুচরাপর্যায়ে দাম বাড়ার অন্যতম কারণ চাঁদাবাজি। এতে প্রতিটি পণ্যের দামের একটি অংশ যায় চাঁদার পেছনে। এসব যদি সামাল দেওয়া না যায়, ভোক্তাপর্যায়ে নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।’ প্রথম সারির বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে এই সংবাদ যে, ক্যাব প্রতিনিধি যখন সড়কে ও বাজারে চাঁদাবাজির কথা বলছিলেন, তখন সভায় উপস্থিত অধিকাংশ ব্যবসায়ী হাততালি দিয়ে তাকে সমর্থন জানিয়েছেন। এমনকি গুপ্ত চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে বলে কেউ কেউ স্লোগান পর্যন্ত দিয়েছেন সেই সভায়। গুপ্ত চাঁদাবাজিতে কারা যুক্ত সেটা অবশ্য গুপ্ত থাকেনি। সবাই বুঝে নিয়েছেন সেটা। আর অনেকের মনের কথা যখন কোনো একজনের বক্তৃতায় উঠে আসে তখন উপস্থিত শ্রোতারা সমর্থন সূচক হাততালি দেন। সেটা শুধু সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ নয়, ক্ষোভেরও প্রকাশ। 

এটা হলো সমস্যার একটা দিক। অন্যদিকে দেশের বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীন বেড়ে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীরা কম দায়ী তা বলার কোনো উপায় নেই। দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তাদের অজুহাতের অন্ত নেই। আজ রোদ উঠেছে, কাল বৃষ্টি নেমেছে, পরশু কুয়াশা পড়েছে, খরা, বৃষ্টি, বন্যা, প্রচণ্ড শীত, ভীষণ গরম, সেতুর টোল, রাস্তার যানজট এহেন কোনো বিষয় নেই যা অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো যায় না। সবকিছুর পেছনেই যুক্তি আছে কিন্তু এসবের কারণে কত দাম বাড়তে পারে তার কোনো জবাবদিহি নেই। ফলে এ রকম যেকোনো অজুহাতে আমদানিকারক, পাইকারি বিক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা থেকে শুরু করে পাড়ার গলির মুখের খুচরা সাময়িক বাজার, সবখানেই দাম বেড়ে যায় অদৃশ্য যোগাযোগে। অর্থনীতিবিদরা বলেন, এ নাকি বাজারের অদৃশ্য হাত আর সাধারণ মানুষ দেখে এ হলো ব্যবসায়ীদের কাছে মুনাফার হাতছানি। কার ইশারায় এই অপূর্ব শৃঙ্খলায় মূল্যবৃদ্ধি ঘটে, কারা থাকেন নেপথ্যে তা খুঁজে পাওয়া না গেলেও মানুষ বহু দুঃখে জেনেছে এর নাম সিন্ডিকেট। এরা থাকে ক্ষমতার বলয়ের চারপাশে। 

দেশের সব ক্ষেত্রেই সিন্ডিকেটের দাপট এবং চোখরাঙানি চলছে। এটা অনুভব করা যাবে কিন্তু বলা যাবে না। বললেই পাল্টা প্রশ্ন আসবে, কোথায় সিন্ডিকেট? কিংবা আগে কি দাম বাড়েনি? আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ী এবং মন্ত্রীদের পছন্দের অজুহাত হলো বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, তাই দেশের বাজারে দাম বেড়েছে। কিন্তু একটু তথ্য নিলেই দেখা যাবে বিশ্ববাজারে যে হারে দাম বাড়ছে, দেশের বাজারে দাম তার তুলনায় অনেক বেশি। খোঁজখবর করলেই দেখা যায় যে, আমদানিনির্ভর সব পণ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতে গোনা ব্যবসায়ীদের হাতে। আবার পাইকারি বাজারের নিয়ন্ত্রণও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কয়েকজনের হাতে। ফলে মজুদ, কারসাজি, বাজারে অস্থিরতা কারা করতে পারেন তা বের করার জন্য খুব বড় গোয়েন্দা বা অর্থনীতিবিদ হতে হবে না। এসব বিশাল ব্যবসায়ীর বাইরেও বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী রয়েছেন, তাদের ভূমিকাও কম নয়। অন্যদিকে সরকারি টোল বৃদ্ধির মতো ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজিও যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তাতে ব্যবসায়ীরাও কিছুটা দুর্ভোগ পোহান এবং সবশেষে সব বোঝা চাপিয়ে দেন সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম না হয় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তুলনা করবেন কিন্তু সবজি, মাছ, মাংসসহ যেসব খাদ্যপণ্য দেশেই পর্যাপ্ত উৎপাদন করা হয়, সেসবও ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারেন না কেন? কৃষক বা উৎপাদকরা যে দামে বিক্রি করেন, তার চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে হয় ভোক্তাদের। একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে ‘গ্রামের কৃষকের ২৫ টাকার বেগুন শহরে এসে ৮০’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন। তাতে দেখা যাচ্ছে, বগুড়ার প্রসিদ্ধ পাইকারি বাজার মহাস্থান হাটে ক্ষেত থেকে তুলে আনা বেগুন কৃষক বিক্রি করেছেন ২৫ টাকা কেজি দরে। আর ঢাকায় এলে তার দাম হয়ে যাচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। শুধু বেগুন নয়, লেবু, করলা, শসা, পটোলসহ অনেক সবজিই এখন গ্রাম থেকে শহরে এলে কিংবা পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে দামের তারতম্য হয়ে যাচ্ছে তিন থেকে চার গুণ। কেন এবং কীভাবে এসব সম্ভব হয়, কে দেখবে আর কে বা করবে প্রতিকার? খাওয়া কমানোর পরামর্শ দিয়ে কি সমস্যার সমাধান করা যাবে?

সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন তৃতীয়। দেশে সবজির উৎপাদন গত ১২ বছরে বেড়েছে ৭ গুণ। ১২ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে ৪০ শতাংশ আর সবজি উৎপাদন বেড়েছে ৭০০ শতাংশ। বর্তমানে ১ কোটি ৯৭ লাখ টন সবজি উৎপাদিত হয়। খাওয়া কমানোর পরামর্শ দিয়ে সমালোচিত কৃষিমন্ত্রী পর্যাপ্ত উৎপাদন বাড়ার পরও ন্যায্যমূল্যে সবজি ক্রেতাদের কাছে না পৌঁছানোর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন বিপণনব্যবস্থাকে। তার মতে, ‘সবজির বিপণনে কিছুটা সমস্যা রয়েছে পরিবহনে চাঁদাবাজি, মধ্যস্বত্বভোগীসহ অনেক সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান করতে পারলে সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে।’ সমস্যা সমাধান করতে পারলে তো আর সমস্যা থাকে না, এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি বোকাসোকা মানুষদেরও আছে। প্রশ্ন হলো সমাধান করবে কে?

বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের এই লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির জন্য চারটি বিষয় দায়ী। তা হলো : আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের বহুস্তরের সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগী, পরিবহনে চাঁদাবাজি এবং উৎসে কর সংগ্রহের এনবিআরের সহজ পথ। খোলা চোখেই দেখা যায় যে এ চারটি বিষয়ই বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

গত কয়েক দিনে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক মহাবিপর্যয়ের কথা সবখানেই আলোচিত হচ্ছে। উন্নয়নের চমক দেখানো, জনমতকে উপেক্ষা করা, ভুল অর্থনৈতিক নীতি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ও পারিবারিক গোষ্ঠীতন্ত্রের স্বার্থরক্ষায় অন্ধ হলে তা যে দেশের জন্য কতটা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে, তার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত শ্রীলঙ্কা। এ আলোচনা অন্যত্র করা যাবে কিন্তু লক্ষণীয় যে, এত বড় বিপর্যয়ের পরও সেখানকার কিছু নিত্যপণ্যের দাম কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে কম বা কাছাকাছি। ইন্ডিয়া টুডের ৩ এপ্রিলের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, শ্রীলঙ্কার বাজারে এখন এক কেজি চালের দাম ২২০, গম ১৯০, চিনি ২৪০, গুঁড়ো দুধ ১ হাজার ৯০০ শ্রীলঙ্কান রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ডিমের দাম ৩০ রুপি। বাংলাদেশি এক টাকা সমান এখন শ্রীলঙ্কান রুপিতে ৩ টাকা ৪২ পয়সা। সে হিসেবে বাংলাদেশের টাকায় শ্রীলঙ্কায় এখন চাল কেজিতে ৬৪, আটা ৫৫, চিনি ৭০, গুঁড়ো দুধ ৫৫১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি ডিমের দাম ৮ টাকা ৭৫ পয়সা। শ্রীলঙ্কায় ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ২৫ শতাংশ। শ্রীলঙ্কার তুলনায় আমরা তাহলে কেমন ব্যবস্থাপনা করছি? 

চাঁদাবাজির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ‘গুপ্ত চাঁদাবাজির অভিযোগ না করে ব্যবসায়ীরা যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেন, তাহলে আমরা জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। দু-একজন যে এ ধরনের অপরাধে জড়িত নয়, সেটা আমরা বলব না। তবে গড়পড়তা অভিযোগ সঠিক নয়।’ কেমন দাঁড়াল তাহলে ব্যাপারটা? অভিযোগ তদন্ত করার দায়িত্ব কার বা কোন প্রতিষ্ঠানের? দু-একজন জড়িত থাকতে পারে বলে যে সন্দেহ তিনি করেছেন তাদের কাউকে আইনের আওতায় আনার দৃষ্টান্ত কি আছে তেমন? বরং অভিযুক্তরা শাস্তি না পেয়ে অভিযোগকারীদের হয়রানির দৃষ্টান্ত আছে। আবার বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের অনুরোধ করে বলেছেন, ‘আপনাদের কাছে বিশেষ অনুরোধ, কোন কোন পয়েন্টে চাঁদাবাজি হয়, কারা করে, আমাকে জানান। আমি বিষয়টা হোম মিনিস্টারকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) জানাব।’ 

তাহলে সেই প্রশ্ন তো আবার তুলতে হবে, চাঁদাবাজি কারা করে, পৃষ্ঠপোষকতা পায় কোথা থেকে, সামনে কাদেরকে দেখা যায় আর পেছনে থেকে কলকাঠি নাড়ে কারা সেই তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব কি ব্যবসায়ী আর সাংবাদিকদের? দাম বাড়ানোর কাজের সুফলভোগী যে ব্যবসায়ীরা তারা তৈরি করবে তালিকা? আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর সরকারের তাহলে কাজ কী? সারা দেশের মানুষের কাছে যা দৃশ্যমান সত্য, এমনকি পুলিশের মুখপাত্রও যখন অভিযোগের আংশিক সত্যতা স্বীকার করেন, তাহলে দায়ী সদস্যদের খুঁজে বের করার জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কেন প্রয়োজন হবে? দাম বেড়ে যাওয়ার দায় কার ওপর চাপাবেন তা নিয়ে বিতর্ক চলতে থাকবে কিন্তু দাম বৃদ্ধির বোঝা তো জনগণকেই বহন করতে হয়। যাদের দায়িত্ব পালন করার কথা তারা কি দায় এড়িয়ে যেতেই থাকবেন?