প্রথম স্নায়ু যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বে কমিউনিজম এবং পুঁজিবাদের লড়াইয়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায় বিশ্ব। তখন মাত্র ‘গণতন্ত্র’ বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছিল। তখন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন দেশগুলো যখন একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছিল তখনই আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয় ইন্টারনেট। এই ইন্টারনেটই স্বাধীনতা, সাম্যতা, ব্যক্তিস্বতন্ত্রতা, বহুত্ববাদ ও মানবাধিকারের বিষয়টি বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যায়। চূড়ান্ত রূপ পেতে শুরু করে বিশ্বায়ন।
এ বিশ্বায়ন শুধু প্রযুক্তি ও মানবিক পর্যায়ে থেমে থাকেনি। রাজনীতিতে বিশ্বায়নের ফলে বৈশ্বিক সামাজিক সম্পর্ক পাল্টে যেতে থাকে। পণ্য, বুদ্ধিবৃত্তি ও সংস্কৃতি একে অপরের সঙ্গে দ্বান্দ্বিক অবস্থায় আসে। এমন একটি ধারণা মাথাচাড়া দিতে থাকে যে, দেশগুলো উন্নত হলেই বুঝি পশ্চিমা দেশগুলোর মতো হতে পারবে। আধুনিকায়নের নামে এ ধারণাকে বদ্ধমূল করার প্রক্রিয়া চলতে থাকে সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে মনোজগতের সব স্তরে। পশ্চিমা গণতন্ত্রই পারে বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে স্বাধীন করতে, এমন একটা ধারণা জেঁকে বসতে শুরু করে। সব দেশই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু দেশের মতো ‘সেক্যুলার’ হবে এমন ধারণা যত বাড়তে থাকে, ততই সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতি লড়াই অবধারিত হয়ে ওঠে। ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযান এ লড়াইয়ের একটি অংশ। ইউক্রেনের মানুষ পশ্চিমা ধারণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের দেশে সংস্কার চাইছে। তারা আন্দোলনের মাধ্যমে কর্র্তৃত্ববাদী সরকারকে উৎখাতও করেছে। এসব যখন ঘটে বিশ্বের কোনো দেশ থেকেই নিন্দা বা প্রতিবাদ জানানো হয়নি। একই ঘটনা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ আফ্রিকার বহু দেশে। ইরাকে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র। এক ভুলের কারণে গোটা অঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ মুখ খেলেনি কেউ। আজ যখন রাশিয়া তার আঞ্চলিক সংস্কৃতি রক্ষায় পশ্চিমা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছে, তখন সবচেয়ে বেশি সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে পশ্চিমা দেশগুলোই। বিশ্বের বাকি দেশগুলো কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে শামিল হচ্ছে না। ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপি পাঁচ পয়েন্ট কমেছে। এ পয়েন্ট কমার পেছনে অন্যতম কারণ নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যে বাধার মতো পদক্ষেপ। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিমাণ আগের তুলনায় অর্ধেক হয়ে যায়। এসব কারণে অর্থনৈতিক উল্লম্ফন ঘটে চীনের মতো দেশের। পেইচিং ইতিমধ্যেই তার কার্যক্রম দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে, তারা বিশ্বায়নবিরোধী পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। এবং চীন ছাড়াও আরও দেশে তা শুরু হয়েছে, যার প্রমাণ; ব্রেক্সিট, জেনোফোবিক জাতীয়তাবাদ, ট্রাম্পিয়ান পপুলিস্ট ও বিশ্বায়নবিরোধী বামেদের উত্থান।
বিশ্ব এখন ‘ওয়েস্টার্ন জোন বনাম চায়না জোনে’ বিভক্ত। পাঁচ বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হতো। কিন্তু এখন তা মাত্র ৫ বিলিয়নে গিয়ে ঠেকেছে। ব্লুমবার্গে এক প্রতিবেদনে বিশ্লেষক জন মিকেলথোয়াইত এবং আদ্রিয়ান উল্ডরিগ লেখেন, ‘ভূরাজনীতি নিশ্চিতভাবে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে চলছে, দুটি বা তিনটি বড় বাণিজ্যিক ব্লকের দিকে এগোচ্ছে বিশ্ব। গত ৪০ বছরে বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ব রাজনীতি যে পথে এগোবে, এ নিয়ে যত ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।’