দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এক রাজনৈতিক চমকের দেশ হচ্ছে পাকিস্তান। প্রতিনিয়ত এখানে চমক দেখা যায়। এই চমকে কখনো সামনে চলে আসে সেনাবাহিনী, কখনো মৌলবাদী গোষ্ঠী, কখনো-বা কোনো রাজনৈতিক দল, আবার কখনো-বা সুপ্রিম কোর্ট। আমেরিকার মিত্র এই দেশটিতে অনেক কিছু থাকলেও নেই শান্তি-স্থিতি-গণতন্ত্র। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো ইমরান খান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। সাড়ে তিন বছরের মাথায় সংসদে এবং সেনাবাহিনীর কাছে সমর্থন হারিয়ে তিনি নিজেই এখন চমকে পরিণত হয়েছেন।
প্রায় এক মাস ধরে চলা নানা নাটকীয় ঘটনার পর পার্লামেন্টে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিরোধী দলগুলো পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেছে। এ ক্ষেত্রে নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। এরপরে পাকিস্তানে আবার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইমরান খানকে অনেক প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হবে। ৬৯ বছর বয়স্ক এই সাবেক ক্রিকেট তারকা আইনি ঝামেলায় পড়তে পারেন। কারণ, বিরোধীরা এরইমধ্যে তার বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে। এর ফলে এমন পরিস্থিতিও হতে পারে যে, ইমরান খান আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অযোগ্য ঘোষণা হতে পারেন। ২০১২ ও ২০১৭ সালে পাকিস্তানে এমন নজির দেখা গেছে।
একথা ঠিক যে, ইমরান খান পাকিস্তানের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। জিনিসপত্রের দাম প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক দ্রুত বেড়েছে। ইমরান খানের নীতির কারণে অনেক মানুষই হয়তো তার ওপর ক্ষুব্ধ, তবে হঠাৎ করে তার বিরুদ্ধে গণ-অসন্তোষ তৈরি হওয়ার কারণেই যে তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের চেষ্টা হয়েছে, ব্যাপারটা সে-রকম নয়। এর পেছনে আছে পাকিস্তানের ক্ষমতা-প্রত্যাশী সুবিধাভোগী শ্রেণির নানা রকম খেলা। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর একটা বড় ভূমিকা আছে। আছে আন্তর্জাতিক মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারসাজি।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ইমরান খান সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন। তখন ইমরানকে সমর্থন করতে সামরিক নিরাপত্তা গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দলের এমপিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের ‘সন্ধি’ টেকেনি। নানা ইস্যুতে সেনাবাহিনী ইমরানের সরকারের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করে। বিশেষ করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে খুবই প্রভাবশালী সামরিক নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান নির্বাচন নিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরানের প্রত্যক্ষ বিরোধ সৃষ্টি হয়। ইমরান খান নতুন গোয়েন্দা প্রধানের নিয়োগপত্রে সই করতে অস্বীকৃতি জানান। বিশ্লেষকদের মতে, সেখান থেকেই তার পতনের বীজ রোপিত হয়।
ইমরান খানের রাজনৈতিক বিরোধীরা এরই সুযোগ নেন। ক্ষমতাসীন জোটের কিছু শরিককে তারা ভাগিয়ে বিরোধী শিবিরে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এর ফলে পার্লামেন্টে ইমরান খান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান, একই সঙ্গে তার মিত্রও কমতে থাকে। তবে ইমরান খানও ক্ষমতায় টিকে থাকতে সম্ভাব্য সব কৌশলই প্রয়োগ করেন। তিনি সংবিধানকে ‘হাইকোর্ট’ দেখান। যদিও উচ্চ আদালত আবার ইমরানকে ‘সংবিধান’ দেখান।
রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী ইমরান খান রাজনীতিতে হেরে যেতে আসেননি। তিনি জয়ী হতে চেয়েছেন। এ জন্য আলাদারকম ‘গেম প্ল্যান’ও বানিয়েছিলেন। যদিও তা ঠিকঠাক মতো কাজ করেনি। শেষ দিকে এসে ইমরান খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ আনেন। এ ব্যাপারে নথিপত্রও উপস্থাপন করেন। অথচ গত ৬০ বছরের ন্যারেটিভ, পাকিস্তানের মিত্র আমেরিকা। সে-কারণে আমেরিকা একসময় পাকিস্তানকে ঢালাও অস্ত্র সাহায্য করেছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর পরিকল্পনা করেছে। মস্কোর মিত্র ভারতকে ঠেকাতে পাকিস্তানকে এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান দিয়েছে। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসনের সময় পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা ‘সিআইএ’ আফগান মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে এতদিন পাকিস্তানকে আমেরিকার ঘুঁটি হিসেবেই ধরা হতো। তাহলে সমীকরণ কেন বদলাল?
আসলে ইমরান খান শুরু থেকেই চেয়েছেন, রাজনীতিতে আলাদা একটা অবস্থান তৈরি করার। তিনি শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা শুরু করেন। তার আমলেই একসময় মার্কিন অস্ত্রের শীর্ষ খদ্দের পাকিস্তান অস্ত্রের জন্য চীনের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীল হতে শুরু করে। আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতা গ্রহণের পর যখন ইমরান বলেন যে, ‘তালেবানরা দাসত্বের শেকল ভেঙে দিয়েছে’ তখনই তার সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে যায়। গত বছর বাইডেন সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং ইমরানকে ডিসেম্বরে তার গণতন্ত্র সম্মেলনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান খান বাইডেনের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন, যা পাকিস্তানে ২৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের প্রকল্পে অর্থায়নকারী চীনের কাছে প্রশংসিত হয়। ইমরান রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করেছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম শীর্ষ-স্তরের বৈঠক করেছেন তিনি, যা যুক্তরাষ্ট্র মোটেই ভালোভাবে নেয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বিরোধ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর কাছেও সমর্থন পায়নি।
তবে ইমরান যা করেছেন, তা ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থেই করেছেন। কোনো মহৎ উদ্দেশ্য থেকে তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি। যিনি অক্সফোর্ডে পড়েছেন, জেমাইমা গোল্ডস্মিথের মতো লন্ডনপ্রবাসী ধনকুবের কন্যাকে বিয়ে করেছেন, তিনি কী করে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এতটা মৌলবাদের আইকন হয়ে উঠতে পারেন, সেটা অবশ্য ইমরান খানকে না দেখলে বিশ্বাস করা যেত না! ইমরান খান সম্ভবত পাকিস্তানের জনক মুহম্মদ আলি জিন্নাহর সার্থক রাজনৈতিক উত্তরসূরি। জিন্নার ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক জীবন যেমন ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে দাঁড়িয়ে, ইমরান খানেরও ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনৈতিক জীবন সম্পূর্ণভাবে আলাদা। তা না হলে পশ্চিমি শিক্ষায় শিক্ষিত ইমরান খানের মতো কোনো রাজনীতিক তালেবানের নারীকে অন্তঃপুরে রেখে দেওয়ার রাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করতে পারেন?
যাহোক, এটাই হয়তো রাজনীতিবিদদের বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তানে কোনো বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী কখনো পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরো শেষ করতে পারেননি। কখনো তারা সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কখনো সেনাবাহিনীর দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। সেই অর্থে ইমরান খান কিছুটা ব্যতিক্রমী। তিনি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যোগ্য ও দক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলো আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে সংকীর্ণ দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থ নিয়ে নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করে। যেই দলই ক্ষমতায় গেছে, তারা নিজেদের আখের গোছানো ছাড়া অন্য কোনো কাজে মনোযোগ দেয়নি। নীতি-নৈতিকতাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্বকে তাই কখনো সেনাবাহিনী, কখনো বা আদালত ঠ্যালাধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতাকে প্রভাবিত ও হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছে। আসলে নৈতিক শক্তি ছাড়া রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে না। এটা শুধু পাকিস্তান নয়, যে কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্যই তা প্রযোজ্য। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী আর উচ্চ আদালত এতটাই সক্রিয় ও শক্তিশালী যে, রাজনীতিবিদরা এখানে খুব একটা কল্কে পান না।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এখন আত্মোপলব্ধিতে পৌঁছাতে হবে। নিজেদের শুধরাতে হবে। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এই দেশটির নেতারা নিজেদের দেশকে বলতেন ‘এশীয় বাঘ’। কিন্তু স্বাধীনতার পর সাতটা দশক কাটিয়ে এসে গোটা বিশ্বের কাছে পাকিস্তানের পরিচিতিটা কিন্তু অন্য রকম। বিশ্ব অর্থনীতির বিশ্লেষক যারা, তাদের অনেকেই বলেন, পাকিস্তান ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’। কেউ কেউ বলেন, পাকিস্তান একটি ‘দুর্বৃত্ত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র’। আর পাকিস্তান যে সন্ত্রাসবাদের কারখানা হয়ে উঠেছে, তা তাদের বহু পুরনো মিত্র আমেরিকাও এখন বারবার বলছে।
প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কখনই ভালোভাবে দেশ চালাতে পারেননি। সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের মধ্যে প্রায়ই নানা ইস্যুতে মতানৈক্য হতো। অবশ্য পাকিস্তানে কোনো সরকারই ঠিকঠাক মতো দেশ পরিচালনা করতে পারেনি। তারা ব্যর্থ হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নতি সাধনে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি করতে। কোনো সরকারই পারেনি মৌলবাদ দমনে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে। দূর করতে পারেনি মিলিটারি-সিভিল বিরোধ। আর এভাবে যদি চলতে থাকে তবে নিশ্চিতভাবেই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে পাকিস্তান নামের দেশটি।
মানুষ নাকি দুর্যোগ ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই পরিস্থিতি থেকে কী শিক্ষা নেন এখন সেটাই দেখার বিষয়।