দেশ রূপান্তর : টিপ পরায় শিক্ষক লতা সমাদ্দারকে হেনস্তা করেছেন একজন পুলিশ সদস্য। তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একজন পুলিশ সদস্য এই রকম একটি ঘটনা ঘটিয়েছেন। আবার এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হয়েছে, এটাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
শাহরিয়ার কবির : এটা হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘকাল ধরে ধারাবাহিকভাবে এই ঘটনা চলে আসছে। আমরা পাকিস্তান আমলে দেখেছি। কপালে টিপ পরা, শহীদ মিনারে আল্পনা আঁকা, ছবি আঁকা এসব হারাম বলে নিষেধ করা হতো। টিপ পরা নিয়ে পাকিস্তান আমলে হুলস্থুল কান্ড হয়েছিল। পারফরমাররা টিপ পরতে পারবে না। কিন্তু পাকিস্তান আমলেও সাহস হয়নি কোনো পুলিশের, এভাবে অপমান করা। বরং সেখানে নারীরা যখন প্রতিবাদ করেছে, শিল্পীরা যখন প্রতিবাদ করেছে কর্র্তৃপক্ষকে সেটা মেনে নিতে হয়েছে। প্রতিবাদে ফেরদৌসী রহমান বিরাট একটা টিপ পরে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেছে। পাকিস্তান আমলেও তাদের সেটা মেনে নিতে হয়েছে। সেই পাকিস্তানকে কবর দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। ধর্মের নামে পাকিস্তানিদের অত্যাচার, সন্ত্রাস এগুলো আমরা সহ্য করব না বলেই তো যুদ্ধ করেছি। এসব সাম্প্রদায়িকতাকে কবর দিতেই তো বাংলাদেশ হলো। এখন আমরা কেন এই সাম্প্রদায়িক বিষয় সহ্য করব।
দেশ রূপান্তর : আপনি বলছেন ধারাবাহিকভাবেই চলছে। আবার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে। তাহলে এটা থামছে না কেন?
শাহরিয়ার কবির: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত এসেছে স্বাধীনতার আড়াই বছর পরই। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনীতি বন্ধ করা হলো। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ধর্ম পবিত্র বিষয়। কিন্তু সেটা ব্যক্তি পর্যায়ে থাকবে। রাষ্ট্র এবং রাজনীতি থেকে ধর্ম পৃথক থাকবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যেটা শুরু হলো বাংলাদেশের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতিসহ সবকিছু মৌলবাদীকরণ, সাম্প্রদায়িকীকরণ, পাকিস্তানিকরণ করা হয়েছে। এটা পঁচাত্তরের পর শুরু হয়েছে এবং সেই ধারাটা এখনো চলছে।
দেশ রূপান্তর : লতা সমাদ্দারের ঘটনার মধ্যেই মুন্সীগঞ্জের গণিত শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের ঘটনা ঘটেছে। এভাবে বাড়তে শুরু করলে কীভাবে প্রতিকার হবে?
শাহরিয়ার কবির: আজকের সব ঘটনাই আগের ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের যে নিষ্ক্রিয়তা এবং আমি বলব সরকারের যে প্রচ্ছন্ন সমর্থন এটা হচ্ছে আমাদের বড় ক্ষোভের কারণ। সরকার এদের শাস্তি দিচ্ছে না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রসরাজ থেকে শুরু করে যারা ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে, তাদের সবাইকে উল্টো আসামি করে মামলা করা হয়েছে। কিন্তু এরা ভিকটিম। এখানে ভিকটিমদের কোথায় সরকার রক্ষা করবে, উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দেখুন, হৃদয় মন্ডলকে আসামি বানানো হয়েছে। অথচ হৃদয় মজুমদার হলো ভিকটিম। পরিকল্পিতভাবে একটা ঘটনা ঘটিয়ে তাকে জেলে নেওয়া হলো। এখানে ভিকটিমদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। আর অপরাধীরা মামলা করে পার পেয়ে যাচ্ছে। রসরাজের মামলা কিন্তু এখনো আমরা লড়ছি। সাত বছর আগের ঘটনা। সে একেবারেই নিরীহ একজন মানুষ। এখনো সে মামলার ঘানি টানছে। অথচ রসরাজ বলেছে, তার ফেইসবুকে এরকম কোনো কথা বলেনি। ৫ বছর আগে গোয়েন্দা সংস্থা এই রিপোর্ট দিয়েছে। পুলিশ তারপরও মামলা দিয়ে দিয়েছে।
দেশ রূপান্তর: এসব ঘটনা বন্ধ করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যায়। ধারাবাহিকভাবে এসব ঘটনা চলতে থাকলে কী ধরনের পরিস্থিতি হবে?
শাহরিয়ার কবির: সবার আগে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের মধ্যে, পুলিশের মধ্যে রন্ধ্রে, রন্ধ্রে জামায়াত, মৌলবাদী, পাকিস্তানপন্থিরা বসে আছে। শাস্তি না পেলে এদের স্পর্ধা বাড়বে। লতা সমাদ্দারের ঘটনায় যে পুলিশকে সাময়িক বহিষ্কার করা হলো তার পক্ষে পুলিশের আরেক পরিদর্শক অবস্থান নিয়েছে। কই তার বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি? এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি অনেক পুলিশ সদস্য অবস্থান নিয়েছে। পুলিশের পক্ষে প্রচুর মন্তব্য এসেছে। তাদের কি শাস্তি দিয়েছেন? তাদের বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শাস্তি না দিলে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। সাম্প্রদায়িক দুষ্কৃতকারীদের যদি শাস্তির আওতায় না আনা হয়, তাহলে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস বাড়বে। এটা খুব স্বাভাবিক।
দেশ রূপান্তর: এই পরিস্থিতিতে আপনার পরামর্শ কী? সরকারের কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
শাহরিয়ার কবির: এসব নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। দেশটাকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সরকার এগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না এবং এগুলো বাড়ছে। সমাজের মধ্যে একটা বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। ভিন্ন ধর্মের প্রতি এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা ও একটা বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে সমাজে। ধর্ম অবমাননার বিরুদ্ধে একশ রকম আইন করে রাখা হয়েছে আর এসব বৈষম্য-ঘৃণা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। তথাকথিত ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে গণিত শিক্ষককে আদালতে পাঠানো হয়েছে। হৃদয় মন্ডল ধর্মের অন্তঃসার শূন্যতার কথা বলেছেন। ধর্মের যুক্তিহীনতার কথা বলেছেন। সরকার যদি এদের নিযন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান হয়ে যাবে। বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ থাকবে না। তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে সংবিধান লেখা হয়েছে সে সংবিধান, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ কিছুই থাকবে না। এভাবে চললে এককটা মৌলবাদী দেশ হয়ে যাবে। মৌলবাদীরা সেদিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং সরকার বসে বসে তামাশা দেখছে। আবার কখনো তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। এটা হতে পারে না। এটা মেনে নেওয়া যাবে না।
আমরা বলেছি শিক্ষার কারিকুলাম থেকে শুরু করে সব কিছুতেই পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ কারিকুলামের মধ্যেই এসব ঘৃণা-বিদ্বেষ শেখানো হচ্ছে। ৭ বছর-১০ বছরের ফ্রক পরা মেয়েকে যখন আপনি হিজাব পরিয়ে দিচ্ছেন জোর করে, তখন তো বোঝা যাচ্ছে যারা ফ্রক পরছে তারা খারাপ। এভাবে সমাজকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। হিজাবকে মহিমান্বিত বানানো হচ্ছে। বাংলাদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতিতে কোথায় হিজাব ছিল। এদের টার্গেট শুধু নারী নয়। এদের প্রধানতম টার্গেট হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ ও তার চেতনার ওপর। ১৯৭১-এর অর্জনের ওপর আঘাত করা হচ্ছে। টিপ পরা বাংলা সংস্কৃতির অংশ। হিন্দু-মুসলমান সব ধর্মের মেয়েরা টিপ পরে। তাদের সুন্দর দেখায়।
এখন এদের শাস্তির জন্য শক্ত আইন করতে হবে। আমরা অনেক আগেই সুপারিশ করেছি ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার অপরাধ আইন।’ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার বিরুদ্ধে যারা কথা বলবে এবং কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এটা ইউরোপে আছে এবং অন্যান্য দেশেও আছে। সেরকম কঠিন আইন করতে হবে। এ আইনের খসড়া আমরা সরকারকে এবং আইন কমিশনকে দিয়েছি। কমিশন সেটা আইন মন্ত্রণালয়ে দিয়েছে। এখানে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। কারণ এসব সাম্প্রদায়িক উসকানির সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদ হয়নি, সোনার বাংলা জাতীয় সংগীত করা ঠিক হয়নি। এগুলো তো গুরুতর রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ। এখন পরিস্থিতি যা হয়েছে, তাতে আমরা বলব সরকার যেন এই আইনটা দ্রুত পাস করে। সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন পাস করতে হবে। সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, তারা কোনো বিচার পাচ্ছে না। এটা তো ২০১৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। তারা বলেছিল, তারা সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন করবে। জাতীয় কমিশন গঠন করবে। এখন পর্যন্ত তো হলো না সেটা। শিক্ষানীতির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নিয়ে আসতে হবে। মাদ্রাসায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বাধ্যতামূলক করতে হবে। মাদ্রাসার বাচ্চারা তো আমাদেরই দেশের সন্তান। তারা গরিব কৃষকের সন্তান এবং এতিমদের সন্তান। তাদের প্রতি কি রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব নেই। তাদের মৌলবাদীদের হাতে জিম্মি করে দেওয়া হচ্ছে। আর সর্বোপরি আমাদের অবশ্যই ’৭২-এর সংবিধানে ফিরে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু কেন ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছেন সেটা আমাদের বুঝতে হবে।