প্রায় এক দশক আগে হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে দেশের আর্থিক খাতের দুর্বলতা নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়ে। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক থেকে লুটে নিয়েছিল প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। যা সোনালী ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক। ২০১০-১২ সালের মধ্যে ঋণের নামে এই পরিমাণ টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয় হলমার্ক। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় এখন কারাগারে আছেন হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ। ২০১২ সালের ৪ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১টি মামলা করে দুদক। জেসমিন ও তানভীরসহ আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মুদ্রাপাচারের অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু এক দশক হতে চললেও আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি বহুল আলোচিত এসব মামলার বিচারকাজ। শেষ হয়নি সাক্ষ্যগ্রহণ। কেবল একটি মামলায় তিন জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, হলমার্কের লুণ্ঠনকৃত অর্থ আদায়ে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হলমার্কের সব সম্পত্তি বিক্রি করেও এ অর্থ আদায় সম্ভব হবে না। এদিকে, হলমার্ক গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কারখানার হাজার কোটি টাকার সম্পদ বেদখল ও লুট হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হলমার্ক গ্রুপের প্রায় সবগুলো কারখানাই সাভার এলাকায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ৪০টির মতো কারখানা এখন বন্ধ। কারখানার ভঙ্গুর অবকাঠামো ছাড়া এখন আর তেমন কিছুই নেই। এ সব কারখানাসহ হলমার্কের স্থাবর সম্পদ ক্রোক না করায় তা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাভারের তেঁতুলঝোড়া ও ভরারী এলাকায় হলমার্ক গ্রুপের বন্ধ থাকা বিভিন্ন কারখানার জমিসহ অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি লুট হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে হলমার্কের এসব কারখানার অনেক দামি দামি যন্ত্রপাতি, ছাউনি, দরজা, জানালা এমনকি মূল ফটক পর্যন্ত লুট হয়ে গেছে। মালামাল লুটের পর বর্তমানে কারখানাগুলোর ভবন ভেঙে জমি দখলের মাধ্যমে সেগুলো প্লট আকারে বিক্রির চেষ্টা শুরু করেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। আর এসব কাজ স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের চোখের সামনে ঘটলেও বাধা দেওয়ার কেউ নেই। কোনো প্রকার বাধা না আসায় অনেকটা নির্বিঘেœই চলছে বেদখল কার্যক্রম। সাভার উপজেলা প্রশাসন বলছে, হলমার্ক গ্রুপের এসব স্থাবর সম্পদ দেখভালের বিষয়ে তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নে হলমার্ক গ্রুপের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা গেছে প্রায় প্রতিটি কারখানার স্থাপনা ধসে পড়ছে। কোনো কোনো স্থাপনা স্থানীয় প্রভাবশালীরা ভোগদখল করে খাচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, সম্প্রতি তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের নগরচর এলাকায় হলমার্কের তারকাঁটা কারখানা নামে পরিচিত ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু করেছে শাহাদাত হোসেন নামে এক ব্যক্তি। জমিটিতে মিসেস নিলুফা হক ওরফে রুনুর নামে একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। ১৫-২০ শ্রমিক লাগিয়ে কয়েক দিন আগে ভবনটি ভাঙার কাজ শুরু হয়। এখন ভবনটি ভেঙে প্লট আকারে জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে হলমার্ক গ্রুপের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ভবনটির মালিকানা দাবি করে এটি ভাঙার কাজ শুরু করার বিষয়টি স্থানীয় পুলিশকে জানানো হয়েছে। ফাঁড়ির ইনচার্জ জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, হলমার্ক গ্রুপের অভিযোগের ভিত্তিতে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। কাগজপত্র দেখে মালিকানা নিশ্চিত হওয়ার পরই সেখানে কাজ করতে পারবে প্রকৃত মালিক।
খেয়াল করা দরকার, দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম জুয়েল সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, যখন মামলা হয়েছে (২০১২) তখন দুদক ক্রোক প্রক্রিয়া শুরু করেনি। সে কারণে স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়নি। তবে অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ব্যাংক হিসাবসহ এ সংক্রান্ত কাগজপত্র ও দলিলাদি জব্দ করা হয়েছে। আর দুদকের লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন পরিচালক আবুল হাসনাত মো. আবদুল ওয়াদুদ এ বিষয়ে জানিয়েছেন, ২০১২ সালে হয়ত ক্রোক প্রক্রিয়া ছিল অন্যভাবে। তখন রিসিভার (ক্রোক কর্র্তৃপক্ষ) ছিল পুলিশ। তখনকার আইনে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া ছিল। মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলায় অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার মতোই স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার সুযোগ রয়েছে। দুদক কর্মকর্তাদের ভাষ্যে মনে হচ্ছে ২০১২ সালেই আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে পুলিশকে হলমার্কের স্থাবর সম্পত্তি দেখভালের জন্য ‘ইন্সট্যান্ট রিসিভার’ বা ‘তাৎক্ষণিক তদারককারী’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। প্রশ্ন হলো, দায়িত্ব পুলিশকে দেওয়া থাকলে হলমার্কের কারখানাগুলো বা স্থাবর সম্পত্তি লুটপাট হয় কী করে? একইসঙ্গে এই প্রশ্নও যৌক্তিক যে, হলমার্কের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো কবে নিষ্পত্তি হবে এবং এসব কারখানাসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির ভবিষ্যৎই বা কী হবে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবশ্যই এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।