ঘরমুখো মানুষের বিড়ম্বনা কমবে কি

ঈদ মানেই লাখ লাখ মানুষের ঘরে ফেরা, আর ঘরে ফেরা মানেই বিড়ম্বনা। এর কোনো প্রতিকার নেই, কোনো অন্যথা নেই। এবার রাস্তার বেহাল অবস্থা এক মহাদুর্ভোগের আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। ঘরমুখো মানুষ কীভাবে পৌঁছবে, কয় ঘণ্টা লাগবে, আদৌ সুস্থভাবে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। ঈদযাত্রার ভোগান্তি নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু মানুষজন আশা করে দিন দিন তা কমে আসবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি। অনেক হাঁকডাক হয়, কিন্তু শেষ বেলা ভোগান্তিরই দেখা মেলে। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। ‘সংস্কার’ কাজ চলার কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গত কয়েকমাস ধরেই দেখা দিচ্ছে তীব্র যানজট। রাস্তার বিভিন্ন স্থান আটকে এই সংস্কার কাজ চালানোর কারণে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। যানবাহন চলছে ধীরগতিতে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোকজনকে বসে থাকতে হচ্ছে গাড়িতে। ঈদের আগে শেষ মুহূর্তে এখন হুড়োহুড়ি করে কাজ শেষ করে মোটামুটি যান চলাচলের উপযোগী বানানোর একটা তোড়জোড় চলছে। কিন্তু গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরে লেজেগোবরে হয়ে গেছে।

এবার ঈদে ঘরমুখো মানুষের বাড়তি চাপ রয়েছে। করোনার কারণে গত দুই বছরে অনেকেই ঈদে বাড়ি যাননি। এবার মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসায় এবং ঈদের ছুটি তুলনামূলকভাবে লম্বা হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, আগের দুই বছরের চেয়ে কয়েক গুণ মানুষ এবারের ঈদে গ্রামমুখী হবে। সেই চাপ সামলানোর সক্ষমতা আমাদের যোগাযোগ ও পরিবহনব্যবস্থার নেই। ঈদযাত্রায় এবার বঙ্গবন্ধু সেতুর এপার-ওপার দুই পাড়েই যানজটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী মানুষকে কয়েকদফা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। প্রথমেই আটকা পড়তে হচ্ছে টাঙ্গাইল মির্জাপুরের গোড়ায় হাঁটুভাঙ্গা মোড়ে। সেখানে চলছে চার লেনের সড়কে ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ। দুই পাশ সংকীর্ণ হয়ে গেছে। একটি করে গাড়ি চলছে। এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। সে জট চন্দ্রা অবধি বিস্তৃত হচ্ছে। হাঁটুভাঙ্গা মোড় কোনোভাবে পার হলেও এলেঙ্গায় এসে আরেক বিপদ। দুই লেনের মহাসড়ক ঢুকেছে এলেঙ্গা বাজারে। সেখান থেকে ভূঞাপুর বাইপাস, বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম এবং পূর্ব পাড় পর্যন্ত জট সৃষ্টি হচ্ছে। এরপর বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়ে পশ্চিম পাড়ে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক জোনে ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ চলছে। এখানেও দুই পাশের রাস্তা ছোট হয়ে গেছে। সেতু থেকে যানবাহন নামার পরে এখানেও জট হচ্ছে। এর পর থেকে এই দুই লাইনে গাড়ি আস্তে আস্তে চলা শুরু হলেও কড্ডার মোড়ে গিয়ে আবার আটকে যাচ্ছে। এতসব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এবার উত্তবঙ্গবাসীর ঘরে ফেরা অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ।

এদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের আব্দুল্লাহপুর থেকে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা পর্যন্ত অংশে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে চলছে বিআরটি প্রকল্পের কাজ। এ কাজের কারণে তীব্র দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এই পথের যাত্রী ও চালকদের। ঈদে এই দুর্ভোগ বাড়বে কয়েক গুণ। গাজীপুর মহাসড়কে ২৪ ঘণ্টায় ৬০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। ঈদে তা কয়েকগুণ বাড়বে। অথচ এখানে এখনো ঢিমেতালে নির্মাণকাজ চলছে। ঈদের আগে সড়কের নিচের যে অংশে কার্পেটিং বাকি আছে, সেগুলো শেষ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঈদের আগে সড়কটি পুরোপুরি চলাচলের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হবে না। প্রশ্ন হলো, ঈদ তো আর আকস্মিক আসেনি। তাহলে কাজের গতি আগে কেন বাড়ানো হয়নি? 

আমাদের দেশে কোনো প্রকল্পই সময়মতো শেষ হয় না। সড়কের ক্ষেত্রে তা লাখ লাখ মানুষের নিত্যদিনের ভোগান্তির কারণ হলেও সে ব্যাপারে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (বিআরটি, গাজীপুর-এয়ারপোর্ট)। শুরুতে নির্মাণব্যয় ছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। ধীরগতির কারণে ব্যয় ও মেয়াদ দুই-ই বাড়ানো হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীতে নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬ কোটি টাকা। মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। বর্ধিত মেয়াদের শেষ প্রান্তে চলে এলেও এখন পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে প্রায় ৭৫ ভাগ। প্রশ্ন হলো, কেন এমন হচ্ছে? কেন সময়মতো প্রকল্পের কাজ শেষ হচ্ছে না? জরুরি ভিত্তিতে কেন ব্যস্ত সড়কের নির্মাণকাজ শেষ হয় না? এর জন্য দায়ী কে? দীর্ঘদিন যাবৎ মানুষের ভোগান্তি হলেও তা নিরসনে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না কেন? পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে কি এভাবে লাখ লাখ মানুষকে কষ্ট দিয়ে বছরের পর বছর ধরে ব্যস্ত সড়কের নির্মাণ ও সংস্কারকাজ চলে?   

জলপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো সুসংবাদ নেই। দেশের দুই প্রধান ফেরিঘাট আরিচার পাটুরিয়া ও মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় ফেরি-স্বল্পতা একটা বড় সমস্যা। মাওয়ায় বাস পারাপার বন্ধ থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ঈদে এই দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পর ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলের ১০ জেলার যাত্রীদের ঢাকা ছাড়ার পথ হয়ে উঠেছে মাওয়া ঘাট। পদ্মা সেতু চালু না হওয়ায় এবারের ঈদেও তাই ফেরিই হবে ঘরে ফেরার ভরসা। অথচ ফেরির সংখ্যা বাড়ছে না। অন্য বছর ঈদে ১৭ থেকে ১৮টি ফেরি সচল থাকত। গত বর্ষায় দেড় মাসের ব্যবধানে পাঁচবার পদ্মা সেতুর খুঁটিতে ধাক্কার ঘটনায় সন্ধ্যা ৬টার পর ফ্ল্যাট ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। সেতুর নিচ দিয়ে ফেরি চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। পরে ফেরি চালু হলেও পারাপার করা হচ্ছে মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, পিকআপ। আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস পারাপার। কিন্তু ঈদের চাপ সামাল দিতে একটি অস্থায়ী ঘাট নির্মাণ ছাড়া বাড়তি কোনো পরিকল্পনার কথাও শোনা যাচ্ছে না। অন্যদিকে মাওয়ায় পারাপার বন্ধ থাকায় দক্ষিণের ২১ জেলার বাস চলাচলের পথ আরিচার পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ। সাধারণ সময়েই এই পথে ভোগান্তি হচ্ছে, ঈদে গ্রামমুখী মানুষের ঢলে অবস্থার আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। ঈদের সময় পণ্যবাহী যান নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভোগান্তিই হবে নিয়তি। যদিও ঈদের আগে-পরে তিন দিন করে সাত দিন জরুরি পণ্য ছাড়া অন্যান্য ট্রাক পারাপার বন্ধ থাকবে। প্রতি বছরই এ নিয়ম থাকে। তবে ঘুষের বিনিময়ে কিছু পণ্যবাহী যানবাহন ও ভিআইপি সিরিয়াল ভেঙে আগে পারাপার ব্যবস্থা করায় সংকট হয় প্রতি ঈদেই।

ট্রেনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। টিকিট পরিণত হয়েছে সোনার হরিণে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি পুরো টিকিট ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে। তারা দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে টিকিট বিক্রি করে টু-পাইস কামিয়ে নিচ্ছে। এই চক্রের হাত থেকে রেলের টিকিট উদ্ধার করার কোনো উদ্যোগ নেই। বাড়তি চাহিদার কারণে বাড়তি ট্রেন যোগ করারও কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায় না। আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও শৃঙ্খলার অভাব দেখা যাচ্ছে। ব্যাপক চাহিদার মুখে বিমানের ভাড়া প্রায় তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে। এতে করে বিমানের টিকিটের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সব মিলিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষের জন্য তেমন কোনো আশার সংবাদ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঈদযাত্রার ভোগান্তি কমাতে একমাত্র ভরসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়া। সড়কের পাশে গড়ে ওঠা বাজারগুলো বন্ধ করতে হবে। যেখানে-সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া মহাসড়কে ছোট ছোট যানবাহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, লেগুনা, ইজিবাইক ইত্যাদি চলাচল যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। রাস্তায় পুলিশ যদি ঠিকমতো তৎপর থাকে এবং যথাযথ দায়িত্ব পালন করে তাহলে সড়কের অব্যবস্থাপনা অনেকটাই দূর করা সম্ভব। ব্যাপক সংখ্যক মানুষের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন, নিরাপদ করতে যার যা দায়িত্ব আছে তারা তা সঠিকভাবে পালন করুক, এটাই প্রত্যাশা।