২৫ ব্যবসায়ীর টাকা এক আ.লীগ নেতার পকেটে

জেলা পরিষদ মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ধকোটি টাকা তুলে তা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে মেহেরপুর জেলা পরিষদের সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কুতুবউদ্দিন মল্লিকের বিরুদ্ধে। তিনি জেলার মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ বাজারে জেলা পরিষদ মার্কেটে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার নামে দোকানপ্রতি তিন-চার লাখ টাকা করে আদায় করেছেন বলে জানিয়েছেন ওই মার্কেটের দোকানগুলোতে ব্যবসা শুরু করা ব্যবসায়ীরা।

তাদের অভিযোগ, জেলা পরিষদের নামে প্রায় ২৫ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে টাকা আদায় করেন মুজিবনগরের বাগোয়ান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কুতুবউদ্দিন মল্লিক। সম্প্রতি দোকান বরাদ্দের জন্য জেলা পরিষদ ব্যবসায়ীদের কাছে টাকা চাইলে তার টাকা আত্মসাতের বিষয়টি জানাজানি হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চার বছর আগে মুজিবনগরের কেদারগঞ্জ বাজারে সরস্বতী খাল সংলগ্ন জেলা পরিষদের জমিতে ২৮টি দোকান নির্মাণ করে পরিষদ। দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট ও প্রস্থে ১৪ ফুট আয়তনের এই দোকানগুলো বরাদ্দ নিতে তখন লিখিত আবেদনসহ বরাদ্দের টাকা জমা দেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীদের নোটিস দেয় জেলা পরিষদ। এই সুযোগে কেদারগঞ্জ বাজার সমিতির সভাপতি কুতুবউদ্দিন মল্লিক জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কথা বলে দোকান নিতে আগ্রহীদের টাকা জমার রসিদ দিয়ে দোকানপ্রতি তিন-চার লাখ টাকা করে তুলে নেন। যে টাকা জেলা পরিষদের তহবিলে জমা হয়নি। সম্প্রতি মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা পরিষদ বিলুপ্ত করে পরিষদে প্রশাসক বসানো হয়। আর এর পরই দোকান মালিকরা জেলা পরিষদ থেকে বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য নোটিস পান। এমন পরিস্থিতিতে তারা আত্মসাৎ করা টাকা ফেরত চেয়ে দফায় দফায় কুতুব মল্লিকের কাছে ধরনা দিয়েও কোনো ফল পাচ্ছেন না।

কুতুব মল্লিকের কাছে প্রতারণার শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে ওই মার্কেটের ইত্যাদি হার্ডওয়্যার নামে একটি দোকানের মালিক শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের দুইটি দোকানঘর বরাদ্দের জন্য প্রথম ধাপে দুই লাখ এবং দ্বিতীয় ধাপে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা কুতুব মল্লিকের কাছে দিই। জেলা পরিষদের দোকান বরাদ্দ বাবদ টাকা নেওয়া হলো মর্মে লিখিতও দেয় কুতুব মল্লিক। কিন্তু সেই টাকা জেলা পরিষদের কোষাগারে জমা হয়নি। পরে দোকান হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে পুনরায় জেলা পরিষদকে দুটি দোকান বাবদ ৮ লাখ টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি।’

দোকান বরাদ্দের জন্য আওয়ামী লীগ নেতা কুতুব মল্লিককে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন আরেক ব্যবসায়ী আর্শাদ মল্লিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৯০ হাজার টাকা আমি জেলা পরিষদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দোকানঘর বরাদ্দ বাবদ জমা দিই। পরে জেলা পরিষদের সদ্য বিদায় নেওয়া চেয়ারম্যানের কথামতো ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা কুতুব মল্লিকের কাছে দিই। পরে জানতে পারি সেই টাকা জেলা পরিষদে জমা হয়নি। এখন জেলা পরিষদ পুনরায় আমার কাছে টাকা দাবি করছে। তা না হলে দোকান অন্য কাউকে দিয়ে দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।’ এই ব্যবসায়ীর দাবি, মার্কেটটির ২৪-২৫টি দোকান বরাদ্দের টাকা কুতুব মল্লিকর কাছে দেওয়া হয়েছিল।

প্রায় একই ধরনের তথ্য জানিয়ে মার্কেটের আরেক দোকান মালিক তন্নি কম্পিউটারের হারুন অর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের গোপনীয় শাখার সাবেক সহকারী (বর্তমানে রাজবাড়ী জেলা পরিষদে কর্মরত) শাহ জাহান দোকান তৈরি করার সময় আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়। পরে ৩০ হাজার টাকা জেলা পরিষদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে দিয়েছি। পরে আরও ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিই আওয়ামী লীগ নেতা কুতুব মল্লিককে। কিন্তু সেই টাকা কুতুব মল্লিক জেলা পরিষদের তহবিলে জমা দেয়নি। এখন জেলা পরিষদ নতুন করে টাকা দাবি করছে। অন্যথায় আমার দোকান অন্য কাউকে বরাদ্দ দেওয়া হবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। এভাবে ২৪-২৫ জন দোকান মালিক কুতুব মল্লিককে টাকা দিয়ে হয়রানির শিকার হচ্ছে।’

তবে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অস্বীকার করে কুতুবউদ্দিন মল্লিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের দোকানঘর বরাদ্দের কোনো টাকা আমি নিইনি। টাকা দেওয়ার রসিদের সই আমার না। এটা জেলা পরিষদের বিষয়। আমি জেলা পরিষদের কেউ না, জেলা পরিষদ বা কোনো দোকান মালিক আমার কাছে কোনো টাকা পায় না।’

তবে কুতুবউদ্দিন মল্লিকের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন মেহেরপুর জেলা পরিষদের সদ্যবিদায়ী চেয়ারম্যান গোলাম রসুল। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের দোকান বরাদ্দের জন্য ৯ জন টাকা দিয়েছে। বাকি ১৯টি দোকানের টাকা কুতুব মল্লিকের কাছে আছে শুনেছি। আমরা কুতুবকে বারবার জেলা পরিষদে ডেকে নিয়ে টাকা দিয়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েও কোনো লাভ হয়নি।’

তবে জেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী না হয়েও কুতুব মল্লিক কীভাবে জেলা পরিষদের টাকা তোলার সুযোগ পেলেন তার সদুত্তর দিতে পারেননি গোলাম রসুল।