ম্যালেরিয়া নিয়ে সচেতনতা

গত ২৫ এপ্রিল পালিত হলো বিশ্ব ম্যালেরিয়া দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আহ্বানে ২০০৭ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণের নিমিত্তে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে বিশ্বব্যাপী।

ম্যালেরিয়া একটি পরজীবী জীবাণুঘটিত মারাত্মক রোগ। প্লাসমোডিয়াম নামক পরজীবী জীবাণু এই রোগের জন্য দায়ী। এর বাহক হিসেবে কাজ করে এক ধরনের অ্যানোফিলিস গোত্রের মশকী। একসময় সারা পৃথিবী জুড়েই এ রোগের প্রাদুর্ভাব থাকলেও এখন বিশ্বের প্রায় ৮৭টি দেশের মধ্যে ম্যালেরিয়া প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়।

তবে আফ্রিকা মহাদেশ আক্রমণের শীর্ষে। ২০২০ সালে ছয় লাখ সাতাশ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল তার শতকরা ৯৫ জন ছিল আফ্রিকার অধিবাসী। বিশ্বে প্রতি দুই মিনিটে একজন করে শিশু মৃত্যুবরণ করে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে যার শতকরা ৯৬ ভাগ আফ্রিকার শিশু। সুতরাং ম্যালেরিয়ার মৃত্যু থেমে নেই; বরঞ্চ এখনো কোনো কোনো স্থানে ম্যালেরিয়া বিভীষিকাময়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবান, বৃহত্তর সিলেট এবং ময়মনসিংহের কিছু এলাকায় ম্যালেরিয়ার প্রভাব লক্ষ করা যায়।

ম্যালেরিয়া রোগে মূলত কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। কোনো কোনো ধরনের ম্যালেরিয়ার আক্রমণে নির্দিষ্ট সময় পর পর জ্বর আসে। ঘাম দিয়ে জ্বর চলে যায়। জ্বরের পাশাপাশি মাথাব্যথা, অরুচি, বমি, গা-হাত-পা ব্যথা, ক্লান্তি অনুভব ইত্যাদি শরীরে দানা বাঁধে। সবচেয়ে ভয়ানক ম্যালেরিয়া হচ্ছে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম দ্বারা সৃষ্ট ম্যালেরিয়া। এতে শরীরে তীব্র রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়। কিডনি, লিভার, ফুসফুস অকার্যকর হয়ে পড়ে। মারাত্মক পর্যায়ে অচেতন হয়ে মৃত্যুর দুয়ারে ঢলে পড়ে রোগী। প্লাসমোডিয়াম ভাইভ্যাক্স দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির বারবার ম্যালেরিয়া হতে পারে। এমনকি ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকা থেকে ফেরত আসার দীর্ঘকাল পরেও তাদের ম্যালেরিয়া হতে পারে।

কারও ম্যালেরিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু করতে হবে। মনে রাখা দরকার, ম্যালেরিয়া চিকিৎসায় বিলম্ব হলে তা হতে পারে ভয়াবহ। ম্যালেরিয়ার এককালের অব্যর্থ ওষুধ কুইনাইন এবং ক্লোরোকুইন পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়ে ভিন্ন ওষুধ অবশ্যই যথাসময়ে নিতে হবে।

ম্যালেরিয়া সহজে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। মশার কামড় থেকে মুক্ত থাকতে হবে নিজেদের। ম্যালেরিয়ার মশা সাধারণত রাতের বেলা কামড়ায়। এরা ঝোপ-জঙ্গলে বাস করে। রাতের বেলায় ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি টাঙিয়ে ঘুমাতে হবে। মশা যাতে কামড়াতে না পারে সেজন্য রাতের বেলায় ফুলহাতা জামা পরিধান করতে হবে। ঘরে মশকনিরোধী স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। নিজের পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে যাতে মশকের আবাস গড়ে না ওঠে। ম্যালেরিয়াপ্রবণ এলাকায় বেড়াতে গেলে অথবা দীর্ঘসময় যাপন করতে হলে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ওষুধ গ্রহণ করতে হবে। সপ্তাহে একটি করে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ ওষুধ খেলে ম্যালেরিয়ার হাত থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ববাসীকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। আসুন আমরা সবাই সচেতন হই। ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ভালো থাকি।