রুশ গ্যাসের বিকল্প কী

রুশ জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম (জিএজেডপি.এমএম) গতকাল বুধবার সকালেই পোল্যান্ড ও বুলগেরিয়ায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। রাশিয়ার এমন পদক্ষেপে নড়েচড়ে বসেছে ইউরোপ। মস্কো চাইছে, তাদের কাছ থেকে গ্যাস-তেল কিনলে তার মূল্য রুবলে পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু ইউরোপ মূল্য রুবলে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ পোল্যান্ডের সঙ্গে রাশিয়ার গ্যাস চুক্তি শেষ হবে। পোল্যান্ড অবশ্য আগেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর রাশিয়ার সঙ্গে নতুন গ্যাস চুক্তি করবে না। কারণ রাশিয়া পোল্যান্ডকে প্রস্তাব দিয়েছিল, গ্যাজপ্রমের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে তার মাধ্যমে রুবলে মূল্য পরিশোধ করতে। রাশিয়ার পার্লামেন্টের স্পিকার সম্প্রতি এক বক্তব্যে বলেন, ইউরোপ রাশিয়ার তেল-গ্যাস কিনবে না, এমন সম্ভাবনা নিয়ে আগে থেকেই ভেবেছে মস্কো এবং এ নিয়ে প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে। স্পিকারের এমন বক্তব্যই বলে দিচ্ছে, রাশিয়া ইউরোপকে পাল্টা আঘাত না দিয়ে ছাড়বে না। ইউরোপের ৪০ শতাংশ গ্যাস যায় রাশিয়া থেকে। এর অধিকাংশই যায় পাইপলাইনের মধ্য দিয়ে। গত বছর ইউরোপে পাইপলাইনের মাধ্যমে রাশিয়া ১৫৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে ৫২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস গেছে ইউক্রেন হয়ে। বেলারুশ-পোল্যান্ড ও জার্মানি হয়ে যায় আরও গ্যাস। এ ছাড়া ব্যাল্টিক সাগর হয়ে নর্ড স্ট্রিম ১ পাইপলাইনের মাধ্যমে জার্মানিতেও যায় রুশ গ্যাস। ২০২১ সালে রুশ গ্যাস সেøাভাকিয়া, অস্ট্রিয়া ও ইতালিতে সরবরাহের জন্য ইউক্রেনকে করিডর হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

রাশিয়ার গ্যাস ছাড়া চলার মতো অবস্থা ইউরোপের নেই। জার্মানি ইতিমধ্যেই নর্ড স্ট্রিম ২ বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে ব্রিটেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে ও নেদারল্যান্ডসে গ্যাস সরবরাহ কষ্টকর হয়ে গেছে। জার্মানির ইউটিলিটি অ্যাসোসিয়েশন বিডিইডব্লিউ ইতিমধ্যেই তাদের সরকারকে বিকল্প জ্বালানি পরিকল্পনা দিয়েছে। নরওয়ের একুইনর জানিয়েছে, তারা নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র থেকে আরও গ্যাস উত্তোলনের কথা চিন্তা করছে। ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চল ট্রান্স আদ্রিয়াটিক পাইপলাইন দিয়ে ইতালির মাধ্যমে আজেরি গ্যাস পেতে পারে। আর ট্রান্স আনাতোলিয়ান ন্যাচারাল গ্যাস পাইপলাইন (টিএএনএপি) দিয়ে তুরস্কের মাধ্যমেও গ্যাস পেতে পারে দক্ষিণ ইউরোপ। যুক্তরাষ্ট্রও চলতি বছরে ইউরোপে ১৫ বিলিয়ন কিউবিক মিটার তরল গ্যাস (এলএনজি) পাঠাবে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবশ্য জানাননি যে এই এলএনজির মধ্যে কত শতাংশ তারা নিজেরা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি প্ল্যান্টগুলো পুরোদমে কাজ করে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় কোনো উৎস থেকে এলএনজি নিয়ে তা ইউরোপকে সরবরাহ করবে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এলএনজি গ্যাস গ্রহণের জন্য যে টার্মিনাল দরকার হয় তা ইউরোপের নেই। এলএনজি টার্মিনালে স্বাবলম্বী হতে ইউরোপের আরও ৫ থেকে ১০ বছর সময় লাগবে। এই সংকটকালীন ইউরোপ কোথা থেকে এত বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ইউরোপের কিছু দেশ গ্যাসনির্ভরতা কমাতে ইলেকট্রিকের দিকে ঝুঁকবে। এ ক্ষেত্রে তারা প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনতে পারে এবং নিজেরাও আরও পরমাণু কেন্দ্র ও হাইড্রোপাওয়ার প্ল্যান্টের দিকে ঝুঁকতে পারে। ইউরোপিয়ান কমিশন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং কাতার এ বছর ৬০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সরবরাহ করবে, যা রাশিয়ার গ্যাসকে প্রতিস্থাপিত করবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপ বায়োমিথেন ও হাইড্রোনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে চাইছে।

ইউরোপ যদি এখন নতুন করে বায়ুচালিত ও সোলার প্রকল্প নেয়, তাহলে ২০ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাসের সমান জ্বালানি অর্জন করতে পারবে। তবে এমনটা করতেও দশ বছর সময় লাগবে।