ভারতে কেমন আছে তামিল শরণার্থীরা

শ্রীলঙ্কার সাম্প্রতিক বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়ছে অনেকে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে যাচ্ছেন তামিলরা। শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু এই সম্প্রদায় এই প্রথম ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে, তা নয়। ষাট ও সত্তরের দশকে তামিলনাড়ু রাজ্যে আশ্রয় নেয় লাখো তামিল। ভারতে শরণার্থীশিবিরে কেমন আছেন তারা? লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া 

ক্ষুধায় দেশত্যাগ

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে খাদ্য, ওষুধসহ প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করতে পারছে না দেশটির সরকার। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সরকারের ভুলনীতি, লুটপাট, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থপাচার মূলত শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে চরম সংকটে ফেলেছে। মেগা প্রকল্পসহ অন্যান্য উন্নয়ন খাতে কোটি কোটি ডলার ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করতে পারছে না দক্ষিণ এশিয়ার দেশটি। শ্রীলঙ্কা সরকারের অদক্ষতা ও নীতিবিবর্জিত শাসনের খেসারত দিতে হচ্ছে দেশটির নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। তারা আজ সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে। প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ও তার ভাই প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেকে দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কাকে দেউলিয়া পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওই দুই ভাইকে পদত্যাগ করতে বললেও তাদের মধ্যে গদি ছাড়ার তেমন একটা ইচ্ছা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। খাবারের তীব্র সংকট ও দাম অনেক বেড়ে যাওয়ায় কয়েক মাস ধরে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কার জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে। ক্ষুধার তাড়নায় এদের মধ্যে কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পাশের দেশ ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বলা বাহুল্য, ভারতে যাওয়া শ্রীলঙ্কানরা সব তামিল সম্প্রদায়ের। অবশ্য শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে এই প্রথম তামিলরা আশ্রয় নিচ্ছেন, তা নয়। যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন সময়ে দেশ ছেড়ে পালান তারা। অতীতে রাজনৈতিক কারণে দেশ ছাড়লেও এবার তামিলদের দেশ ছাড়ার কারণ মূলত অর্থনৈতিক। গত মাসের শেষের দিকে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম উপকূলে ১৬ জন শ্রীলঙ্কান তামিল এসে পৌঁছান। অর্থনৈতিক সংকট থেকে পরিত্রাণ পেতে শরণার্থীদের এই নতুন ঢেউ এখনই থামবে না বলে মনে করছেন ভারতীয় গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইএমডি) সিনিয়র ফেলো ড. সি ভালাথিশ্বরন। তিনি মনে করেন, আগামী কয়েক মাসে শ্রীলঙ্কা থেকে আরও তামিল ভারতে আসবেন।

ইতিহাস

ভারতের তামিলনাড়ু, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুডুচেরি ও শ্রীলঙ্কায় প্রধানত তামিল সম্প্রদায়ের বাস। শ্রীলঙ্কার ১৫ শতাংশ, ভারতের ৫.৯ শতাংশ, মরিশাসের ৬ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ৭ শতাংশ ও সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মানুষ তামিল। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইএমডি) পরিচালক ইরুদায়া রাজন জানান, ভারতের তামিলনাড়ু উপকূল থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরে শ্রীলঙ্কার অবস্থান। ভারত ও শ্রীলঙ্কায় বসবাসরত তামিলদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন বেশ শক্তিশালী। এ কারণে তামিল শরণার্থীদের বরাবরই তামিলনাড়ু রাজ্যে স্বাগত জানানো হয়। ইতিহাসে বিভিন্ন সময় তামিলরা ভারতে এলেও মূলত ১৯৬৪, ১৯৮৩ ও ২০০৯ সালে তাদের বড় ধরনের আগমন ঘটে।

১৯৬৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আর শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী পদে ছিলেন শ্রীমাভো বন্দরনায়েকে। সে সময় এই দুই প্রধানমন্ত্রী একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তাতে বলা হয়, ভারত বা শ্রীলঙ্কার নাগরিক নন, এমন আট লাখ মানুষ তাদের পছন্দ অনুযায়ী এই দুদেশের নাগরিক হতে পারবেন। সে সময় ওই আট লাখের মধ্যে পাঁচ লাখ মানুষ ভারতে থাকতে চেয়েছিল। এর প্রধান কারণ এই ব্যক্তিরা বা তাদের পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীলঙ্কায় যান, তার আগে তারা ভারতের তামিলনাড়ুতে থাকতেন। ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফলোআপ চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও দেশটিতে আসা শ্রীলঙ্কান তামিলদের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি। ১৯৮২ সালের মধ্যে ওই পাঁচ লাখের মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৮০ হাজার তামিলকে নাগরিকত্ব দেয় ভারত সরকার। আইআইএমডির সিনিয়র ফেলো ড. সি ভালাথিশ্বরনের ভাষ্য, শ্রীলঙ্কায় ফিরতে বা ভারতের নাগরিকত্ব পেতে হলে যে কাগজপত্রের দরকার, তা বেশির ভাগ শরণার্থী হারিয়ে ফেলেছেন।

শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সক্রিয় তামিল সশস্ত্র সংগঠন লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম (এলটিটিই) দীর্ঘদিন ধরে ওই অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করে আসছে। এলটিটিইর যোদ্ধারা ১৯৮৩ সালে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীর ১৩ সেনাকে হত্যা করে। ফলে এলটিটিই ও সেনাবাহিনীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের সূচনা হয়। গৃহযুদ্ধ চলাকালে হাজার হাজার তামিল পালিয়ে ভারতে যান। তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার তখন তামিলদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় তামিলরা যে স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে লড়াই করছিলেন, তার প্রতি ভারতীয়দের সমর্থনও বাড়তে থাকে। তবে ১৯৯১ সালে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। সে বছর এলটিটিইর এক সদস্যের হাতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হন। দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অভিজিৎ দাশগুপ্ত জানান, রাজীব গান্ধী নিহত হওয়ার পর শ্রীলঙ্কার শরণার্থীদের ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে দেখা শুরু হয়। এলটিটিইর হাতে প্রধানমন্ত্রী নিহতের ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভারতে বাস করা তামিল শরণার্থীদের ওপর। এ ছাড়া যেসব শ্রীলঙ্কান তামিলদের ভারতে আসার কথা ছিল, তাদেরও শত্রু হিসেবে দেখা হয়। ১৯৮৩ সালে শুরু হওয়া শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ চলে ২০০৯ পর্যন্ত। দেশটির সেনাবাহিনীর সহিংসতা ও নির্যাতনের আশঙ্কায় ২০০৯ সালে ফের হাজার হাজার তামিল ভারতে পালিয়ে যায়। এই তামিলদের অবশ্য শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করতে রাজি হয়নি ভারত সরকার। তাদের সরকারিভাবে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে দেখা হয়। ২০০৯ সালের আগে যে কারণে শ্রীলঙ্কান তামিলরা ভারতে আশ্রয় নেন, সেই একই কারণে ওই বছর তারা ভারতে এলেও তাদের শরণার্থীর মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়।

ভারতে বসবাসরত শ্রীলঙ্কান তামিলদের দুই ভাগে ভাগ করা যায়। তাদের একটি অংশ শরণার্থীশিবিরে বাস করে, আরেক অংশ শিবিরের বাইরে থাকে। অধ্যাপক অভিজিৎ দাশগুপ্ত জানান, ভারতে আসা তামিলদের অর্থনৈতিক অবস্থা মূলত এই বৈষম্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। শিক্ষিত ও অর্থবান তামিলদের বড় অংশ তামিলনাড়ু রাজ্যের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের মধ্যে তারা দ্রুত মিশে যান। এই অংশের তামিলদের সংখ্যা ৩৪ হাজার। দরিদ্র ও অশিক্ষিত তামিলদের জোর করে শরণার্থীশিবিরে রাখা হয়। অধ্যাপক অভিজিতের মতে, দরিদ্র তামিলদের স্থানীয়দের কাছ থেকে আলাদা করা হয়। শিবিরে থাকা তামিলদের স্থানীয়দের সঙ্গে থাকা বা কাজ করার অনুমতি নেই।

শিবিরের অবস্থা

ক্যাম্প লাইফ অব শ্রীলঙ্কান রিফিউজিস ইন ইন্ডিয়া বইতে লেখক আরোকিয়াম কুলানদাই বলেন, ২০০৮ সাল থেকে শরণার্থীশিবিরের অবস্থা উন্নত হয়েছে। তবে আবাসন, স্যানিটেশনসহ অন্য আরও প্রয়োজনীয় বিষয়ে নজর দেওয়া প্রয়োজন। গবেষক অ্যান্থনি গোরিউ পনসিয়াড শ্রীলঙ্কান তামিলদের জন্য নির্মিত শরণার্থীশিবিরগুলো নিয়ে ব্যাপক আকারে গবেষণা করেন। তার ভাষ্য, তামিল শরণার্থীরা সেখানে আর্থিক সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়া খাবার পাচ্ছেন। তবে তামিলনাড়ু রাজ্য সরকার শরণার্থীদের যে নগদ অর্থ দিচ্ছে, তা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার জন্য পর্যাপ্ত নয়। লেখক আরোকিয়াম কুলানদাই ও গবেষক অ্যান্থনি গোরিউ পনসিয়াড উভয়ই জোর দিয়ে বলেন, শরণার্থীরা শিবিরে পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে দক্ষতাহীন কাজের বাইরে অন্য কাজ পেতে তাদের প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কান তামিল নারীদের চাকরি পাওয়া বেশ কঠিন বিষয়। শরণার্থীদের প্রয়োজন শিবির ছাড়ার অনুমতি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন আধার কার্ড পেলেও বেশির ভাগেরই কাছে শুধু শরণার্থী আইডি কার্ড রয়েছে। এ কারণে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের বৈষম্য প্রকট। শরণার্থীশিবির থেকে বের হওয়ার অনুমতি না থাকায় শ্রীলঙ্কান তামিলদের দারিদ্র্য পিছু ছাড়ে না। দারিদ্র্যের মধ্যে জন্ম নিয়ে কেউ কেউ এভাবেই মৃত্যুবরণ করেন। তাদের পুরো জীবন অর্থনৈতিক সংকট থেকে বের হওয়ার লড়াইয়েই কেটে যায়। নাগরিকত্ব তাদের দেওয়া হয় না। মূল সমাজের সঙ্গে একীভূত হওয়াও তাদের হয়ে ওঠে না। অবশ্য এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও গবেষক অ্যান্থনি পনসিয়াড মনে করেন, তিব্বতিদের মতো শ্রীলঙ্কান তামিল শরণার্থীরাও ভালো রয়েছেন। লেখক কুলানদাইও মনে করেন, সংঘর্ষের সময় ছাড়া তামিল শরণার্থীদের জন্য ভালো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রেখেছে ভারত সরকার। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র ফেলো ড. ভালাথিশ্বরন জানান, বেশির ভাগ শরণার্থী শ্রীলঙ্কান প্রবাসীদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স পান। এ কারণে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অনিশ্চিত হলেও একেবারে অসহনীয় নয়। ভালাথিশ্বরন মনে করেন, শ্রীলঙ্কান তামিলদের হয় দেশে ফেরাতে হবে নয়তো মূলধারার সঙ্গে তাদের একীভূত করতে হবে। এভাবে আজীবন তারা শরণার্থী হয়ে থাকতে পারেন না।

 প্রত্যাবাসন ও একত্রীকরণ

অধ্যাপক অভিজিৎ দাশগুপ্ত জানান, শ্রীলঙ্কান তামিলদের দেশে ফেরানোর তিনবার উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত সরকার। তবে দুদেশের সরকার পরিস্থিতি যথার্থভাবে সামাল দিতে না পারায় ওইসব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। ভারত বা শ্রীলঙ্কা কেউই শরণার্থীদের চায় না। জাতিসংঘের একটি সংস্থা তামিলদের শ্রীলঙ্কায় ফেরানোর লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালে তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইয়ে একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। শরণার্থীকেন্দ্রিক দুদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে তারাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক এনি-সোফি বেনজ জানান, চেন্নাইয়ে জাতিসংঘের ওই সংস্থার কার্যালয় এখনো রয়েছে। তবে শ্রীলঙ্কায় ফেরার মতো প্রার্থী এখন খুব বেশি নেই। এর কারণ দুটি। বেশির ভাগ শরণার্থীর জন্ম শিবিরেই। আবার অনেকে তাদের জীবনের বড় অংশ শিবিরেই কাটিয়েছেন। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাস্তবিক অর্থে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। দেশটিতে ফিরলে তাদের স্বাগত জানানোর মতো কেউ নেই। দ্বিতীয় কারণটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই তামিল শরণার্থীদের সঙ্গে বরাবরই অন্যায় আচরণ করেছে শ্রীলঙ্কা সরকার। তাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধ ও সংখ্যালঘু তামিলদের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপক। বেনজ আরও জানান, ভারতে বসবাসরত তামিল শরণার্থীদের অন্য দেশ যেমন উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ বা অস্ট্রেলিয়ায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে। তবে কাগজপত্র ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে পুনর্বাসনের সুযোগ তেমন একটা নেই। আবার তামিল শরণার্থীদের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে একীভূত করাও বেশ কঠিন। এ বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তা ছাড়া ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে দোদুল্যমান অবস্থানে রয়েছে তামিল শরণার্থীরা। কারণ নাগরিকত্ব গ্রহণের অর্থ তামিলনাড়ু সরকারের কাছ থেকে পেয়ে আসা আর্থিক সহায়তা প্রত্যাখ্যান করা।

শিবিরে থাকা শরণার্থীরা ভারতের নাগরিকদের মতো একই মৌলিক সহায়তা পেয়ে থাকে। পাশাপাশি শরণার্থী হিসেবে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যেমন বিদ্যুৎ, পানি, কম্পিউটার বিনামূল্যে পায় তারা। এ ছাড়া উচ্চশিক্ষায় তাদের জন্য আসনও সংরক্ষিত রয়েছে। বেনজ বলেন, ‘তামিলরা নাগরিকত্ব ও শরণার্থীর মর্যাদা পাওয়ার এই দুই দাবি একসঙ্গে করলে বিষয়টি পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়। একটি দাবি, সমান নাগরিক হিসেবে গণ্য করার অধিকার আর অন্যটি শরণার্থী হিসেবে বিশেষভাবে দেখার অধিকার। ষাট ও সত্তরের দশকের শেষে ভারতে আসা তামিলদের সংখ্যালঘু সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। সার্টিফিকেটে তাদের তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ভারতের এসব জাতি-উপজাতি বা শ্রেণির জন্য দেশটির সরকার যেসব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, সেসব সুবিধা তামিল শরণার্থীরাও পায়। এ ছাড়া ১৯৬৪ সালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ও ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী শ্রীলঙ্কা সরকারের সঙ্গে যে দুটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, সে অনুযায়ী তামিলদের অনেকে এরই মধ্যে ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে গেছেন। অবশ্য ষাট ও সত্তরের পর যারা ভারতে আসেন, সেই তামিলরা ভারতীয় সমাজ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্নই রয়ে গেছেন।

রাজ্য ও কেন্দ্রের অবস্থান

আইআইএমডির ফেলো ড. ভালাথিশ্বরনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বাস করা তামিল শরণার্থীদের ১০ শতাংশ দেশটির নাগরিকত্ব চান। এজন্য তাদের ব্যাপক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অস্পষ্টতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির সম্মুখীন হতে হয়।  তামিলনাড়– সরকার তাদের দুর্দশা বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ সহায়তা করার চেষ্টা করে। তবে দুরবস্থার পুরোপুরি লাঘব এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে উঠছে না। ভালাথিশ্বরনের ভাষ্য, তামিল শরণার্থীদের বিষয়ে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনতে চায় না ক্ষমতাসীন দল। বিরোধী দল অবশ্য এ বিষয়ে সোচ্চার থাকে। আবার বিরোধী দল ক্ষমতায় গেলে তারা তখন শরণার্থীদের বিষয় ভুলে যায়। তামিল শরণার্থীদের নাগরিকত্বের বিষয়ে রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সংকল্প জোরালো হলেও এ বিষয়ে তাদের বেশি কিছু করার নেই। রাজ্য সরকার বড়জোর কেন্দ্রের কাছে আবেদন করতে পারে। আর শরণার্থীশিবিরের অবস্থা উন্নত করার দিকে জোর দিতে পারে। নাগরিকত্ব দেওয়া বা না দেওয়া কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের ওপরই মূলত নির্ভর করে।  

কেবল শ্রীলঙ্কা নয়, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভুটান থেকেও অনেক শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেন। প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা শরণার্থীদের বিষয়ে ভারতের নির্দিষ্ট কোনো আইনি কাঠামো নেই। এ ছাড়া ১৯৫১ সালের রিফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষর করেনি ভারত। এ কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক আইন মানতেও বাধ্য নয়। ভারতের আইন অনুযায়ী, ভিসা ছাড়া দেশটিতে প্রবেশ করা সবাই ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে বিবেচিত হবে। শরণার্থী বা রাজনৈতিক আশ্রয়প্রত্যাশীদের জন্য বিশেষ কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেই দেশটিতে। প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক বেনজ বলেন, ‘শ্রীলঙ্কান তামিলরা ভারতের নাগরিক বা বৈধ শরণার্থী কোনোটিই নয়। ভারতীয় সমাজে তাদের পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত করা যাচ্ছে না আবার বেরও করে দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতি তাদের শরণার্থী ও নাগরিক এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে ঝুলিয়ে রেখেছে।’