বুকার পুরস্কার বিজয়ী লেখক অরুন্ধতী রায় ‘বর্তমান ভারত’কে বিপরীত দিকে চলা একটি বিমানের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং দাবি করেছেন যে এটি ‘একটি দুর্ঘটনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’।
কারাগারে বন্দী মানবাধিকার কর্মী জিএন সাইবাবার কবিতা ও চিঠির সংকলন ‘আমার পথকে তুমি কেন এত ভয় করো?’ শিরোনামের বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি গতকাল বুধবার একথা বলেন।
অরুন্ধতী রায় বলেন যে, ১৯৬০ এর দশকের সম্পদ এবং জমির পুনর্বন্টনের জন্য ‘সত্যিকার বিপ্লবী আন্দোলন’ থেকে সরে এসে দেশের নেতারা এখন ভোট চাইছেন এবং ‘৫ কেজি চাল ও ১ কেজি লবণ’ বিতরণ করেই নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন।
অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘সম্প্রতি, আমি আমার এক পাইলট বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি কি পেছন দিকে প্লেন চালাতে পারো?’ তিনি উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। আমি বললাম, ‘ভারতে এখন ঠিক এটাই হচ্ছে’।
বিশ্বব্যাপী বহুল বিক্রিত উপন্যাস ‘দ্য গড অফ স্মল থিংস’ এবং ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’ এর এই লেখক বলেন, ‘এই দেশের নেতারা বিমানটিকে উল্টো করে উড়াচ্ছে, সবকিছু পড়ে যাচ্ছে, এবং আমরা একটি দুর্ঘটনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি’।
৬২ বছর বয়সী এই লেখক ভারতকে এমন একটি ‘অত্যাধুনিক আইনশাস্ত্রের’ দেশ হিসেবে কটাক্ষ করেন, যেখানে আইনগুলো ‘জাত, শ্রেণী, লিঙ্গ এবং জাতিগত পরিচয়ের’ উপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা এখানে কি করছি? আমরা এমন একজন অধ্যাপকের কথা বলার জন্য মিলিত হয়েছি যিনি ৯০ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং সাত বছর ধরে জেলে আছেন। আমরা এটাই করছি। এটাই যথেষ্ট। আমাদের আর কথা বলতে হবে না। আমরা কোন দেশে বাস করছি তা বলার জন্য এটাই যথেষ্ট। কী লজ্জার একটা ব্যাপার’।
৯০ শতাংশেরও বেশি শারীরিক প্রতিবন্ধী জিএন সাইবাবা হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। অথচ মাওবাদীদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার এবং ‘দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর’ মতো কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১৭ সালে মহারাষ্ট্রের গদচিরোলি জেলার একটি দায়রা আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।
আদালত জিএন সাইবাবা এবং অন্যদের কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইনের অধীনে দোষী সাব্যস্ত করে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাম লাল আনন্দ কলেজে সহকারী অধ্যাপক পদ থেকেও তাকে গত বছরের ৩১ মার্চ বহিষ্কার করা হয়।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা জওহর ভবনে বইটি প্রকাশ করার সময় জিএন সাইবাবার অবিলম্বে মুক্তির জন্য তার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
ডি রাজা বলেন, বর্তমান সরকার যদি মনে করে একজন কমিউনিস্টকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বা তাকে কারাগারের আড়ালে রেখে তাকে পরাজিত করতে পারবে তাহলে খুব ভুল করছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার হয়তো মনে করছে কিছু লোককে ‘শহুরে মাওবাদী’, ‘শহুরে নকশালবাদী’, ‘দেশবিরোধী’, ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে বা কারাগারে রেখে বা কারাগারে নির্যাতন করে তারা সফল হতে পারবে। কিন্তু আমি তাদের সতর্ক করে দিচ্ছি যে তারা কখনই সফল হতে পারবে না। একজন কমিউনিস্টকে হত্যা করা যেতে পারে, কিন্তু একজন কমিউনিস্টকে কখনোই পরাজিত করা যায় না’।
বইটির উন্মোচন অনুষ্ঠানে জিএন সাইবাবার স্ত্রী বসন্তও উপস্থিত ছিলেন। তিনি তার স্বামী কীভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের অমালাপুরম শহরে দারিদ্র্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তার শারীরিক অক্ষমতা নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষে উঠেছিলেন এবং একজন উচ্চ সম্মানিত অধ্যাপক হয়েছিলেন, সে গল্প বলেছেন।
এদিন তিনি নাগপুর সেন্ট্রাল জেলের নির্জন কারাবাসে জিএন সাইবাবার ওপর অমানবিক আচরণ, তার হৃদরোগের খারাপ অবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী ও গুরুতর মেরুদণ্ডের ব্যথা সহ তার দুর্বল স্বাস্থ্য এবং তার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগদানের জন্য কয়েক দিনের জন্য একাধিক প্যারোল আবেদন প্রত্যাখ্যানের বিষয়েও কথা বলেছেন।
বইটি প্রকাশ করেছে স্পিকিং টাইগার এবং অফলাইন ও অনলাইন স্টোরগুলো থেকে কেনা যাবে।