আত্মীয়দের ভুলে থাকার ক্ষতি

ঈদের আনন্দ-উৎসব উপভোগের জন্য প্রিয়জনের সান্নিধ্য সবার কাম্য। গ্রামপ্রধান বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরে থাকেন। তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজন গ্রামে বসবাস করেন। ঈদ ও অন্যান্য উৎসবে তারা নাড়ির টানে গ্রামে ফেরেন। বাড়ি না ফিরলে তাদের অধিকাংশ পরিবারের ঈদ উদযাপন সেভাবে হয় না। এছাড়া অপেক্ষাকৃত একটু বেশি ছুটি থাকায় অনেকে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ পান ঈদের সময়। ঈদের সময় যাত্রাপথের নানাবিধ দুর্ভোগ আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের বেশিরভাগ মানুষ যখন গ্রামে ছুটে যান নাড়ির টানে তখন বিত্তবান কিছুসংখ্যক লোক ঈদের আনন্দ করতে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া, নেপাল ও ভুটানসহ বিভিন্ন দেশে। ধনী-দরিদ্রের এ বৈষম্য ঈদ উৎসবের ঐক্য-ভ্রাতৃত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঈদের উৎসব উদযাপনের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উৎসবভাতা পেলেও দিনমজুর, কৃষক, রিকশাচালকসহ নিম্নআয়ের অনেক মানুষ এসব ভাতা-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অধিকন্তু অন্যান্য পেশার লোকজন কয়েক দিন ঈদের ছুটি ভোগ করতে পারলেও কৃষক-শ্রমিক- দোকানি-দিনমজুরদের কাজ করতে হয় উৎসবের দিনগুলোতেও।

ঈদ উৎসব নিয়ে এমনসব নানা জটিলতা থাকলেও করোনা মহামারী পেরিয়ে দুই বছর পর এবারের ঈদুল ফিতর বেশ উচ্ছ্বাসময় পরিবেশে পালিত হয়েছে। ইসলামের বিধানে মুসলিম সমাজের সবাইকে ঈদের আনন্দে অংশীদার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই ভেদাভেদ ভুলে এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে বুকে টেনে নেয় জাতীয় এ উৎসবের দিনে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও দেখা গেছে, ঈদের আয়োজন, আন্ষ্ঠুানিকতা ও উদযাপনের ক্ষেত্রে মানুষের আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব। বিষয়টি বেশ দৃষ্টিকটুভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থাৎ ঈদের আয়োজন শুধু নিজ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

শহর তো নয়ই গ্রামেও এখন আর বড় পরিবারের দেখা খুব একটা মেলে না। তার পরও আগে ঈদ ও বিভিন্ন আয়োজনে দেখা যেত, আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ-খবর নিচ্ছে, বিপদ-আপদে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, উপহার নিয়ে তাদের বাড়িতে যাচ্ছে, শুভেচ্ছা বিনিময় করছে। কিন্তু করোনা পরবর্তী এই ঈদে এমন দৃশ্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম দেখা গেছে। এক্ষেত্রে ‘হাতে সময় কম’ এমন অজুহাত দাঁড় করানো হলেও আত্মীয়দের পাশে না দাঁড়ানো, তাদের খোঁজখবর না নেওয়া যেন অভ্যাসে পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা আবশ্যক।

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বলতে বুঝায় মা ও বাবার দিক থেকে রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের। সুতরাং পিতা-মাতা, ভাই-বোন, চাচা, ফুফু, মামা, খালা এবং তাদের ঊর্ধ্বতন ও নিম্নতম ব্যক্তিবর্গ ও সন্তানরা রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অন্তর্ভুক্ত। তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘এবং তারা (রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়) আল্লাহর বিধান মতে তারা পরস্পর বেশি হকদার।’ -সুরা আহজাব : ৬

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং তা ছিন্ন করা থেকে সাবধান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ মাখলুকাত (দুনিয়ার সব কিছু) সৃষ্টি শেষ করলে, রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়তার বন্ধন উঠে দাঁড়াল এবং আল্লাহর দরবারে আরজ করে বলল, হে আল্লাহ! আপনার কাছে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করা থেকে আশ্রয় চাই। আল্লাহ বললেন, ঠিক আছে; যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে সম্পর্ক মিলিত রাখবে আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব। আর যে ব্যক্তি তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব। এতে কি তুমি সন্তুষ্ট নও? জবাবে আত্মীয়তার বন্ধন বলল, হ্যাঁ, আমি সন্তুষ্ট।’ -সহিহ মুসলিম

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীর বাস্তবতা এখন আমাদের চোখের সামনে। আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ায় মানুষে মানুষে ভালোবাসা ও মায়া-মমতা কমে যাচ্ছে। বাবা-মাকে সন্তানরা বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসছে, কিংবা পরিস্থিতির কারণে তাদের সেখানে যেতে হচ্ছে। অনেকে আবার বাবা-মার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেও মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে যায়, অথচ অন্য আত্মীয় বিশেষ করে ভাই-বোন, খালা-ফুফু তাদের কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। অথচ তারা সবাই রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই গ্রাম কিংবা শহরে বসবাস করা সত্ত্বেও একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত করে না। বিশেষ করে ধনীরা তাদের অসহায় আত্মীয়দের পরিচয় পর্যন্ত ভুলে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে চিনেও না চেনার ভান করে।

মুসলিম হিসেবে অন্যদের যেসব অধিকার রয়েছে আত্মীয়রা তাতে অগ্রাধিকার লাভ করবে। শায়খ আবদুর রহমান বিন আয়িদ এমন ১৪টি অধিকার বর্ণনা করেছেন। যার মধ্যে আছে সালাম আদান-প্রদান, স্নেহ ও সম্মান করা, আনন্দ-বেদনার অংশীদার হওয়া, দাওয়াত কবুল করা, জানাজায় অংশ নেওয়া, পরস্পর হিতাকাক্সক্ষী হওয়া, বিবাদ হলে মিটিয়ে দেওয়া, অনুপস্থিতিতে দোয়া করা ইত্যাদি। আগেই বলা হয়েছে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনে পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনদের প্রতি অবহেলা দিন দিন বাড়ছে। ফলে আমাদের মধ্য থেকে শ্রদ্ধা, স্নেহ, মায়া-মমতা, ভালোবাসা ইত্যাদি লোপ পাচ্ছে এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন নষ্ট হচ্ছে। অথচ পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করা একজন মুমিনের জান্নাত লাভের অন্যতম মাধ্যম। বিষয়টি অনুধাবন করা সবার জন্য একান্ত জরুরি।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক লেখক