তেলে আবার তুঘলকি

ভোজ্য তেলের দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ৩৮ টাকা বাড়িয়ে প্রায় ডাবল সেঞ্চুরি অর্থাৎ ১৯৮ টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি ৪০ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স ও বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশে তেলের মূল্য সমন্বয় করা হলো।

প্রসঙ্গত, গত ৪ মাসে এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো ভোজ্য তেলের দাম বাড়াল সরকার।

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে দফায় দফায় ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভোক্তা ও বাজার বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, ‘ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে অধিক মুনাফার পথ নিয়েছেন। সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, ‘অতিরিক্ত এই দাম তাদের জীবনযাপনের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।’

নতুন দর অনুযায়ী খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০ টাকা, যা এতদিন ১৪০ টাকা ছিল। লিটারপ্রতি বাড়ল ৪০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করা হয়েছে , লিটারপ্রতি  বাড়ল ৩২ টাকা ৫ লিটারের বোতলের নতুন দর হবে ৯৮৫ টাকা। যেটি বর্তমানে ৭৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ লিটারে বাড়ল ২২৫। পাম তেল ১ লিটার বিক্রি হবে ১৭২ টাকায়, আগে ছিল পাম তেল ১৩০ টাকা। লিটারপ্রতি বাড়ল ৪২ টাকা।

এর আগে গেল ২০ মার্চ খুচরা পর্যায়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৮ টাকা কমিয়ে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। সেই সঙ্গে ৫ লিটারের বোতলে দাম ৩৫ টাকা কমে ৭৬০ টাকা করা হয়। এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেলে দাম ৪ টাকা কমিয়ে ১৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

গত বছরের এই সময় অর্থাৎ এক বছর আগে ১ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছিল  ১৩৪ টাকা করে। এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ করেই আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে এর দাম নির্ধারণ করা হয় ১৬৮ টাকায়। এরপর মার্চ মাস থেকেই ব্যবসায়ীরা ভোজ্য তেলের দাম ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৮০ টাকা করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সরকার রাজি না হলে সেদিন থেকে বাজারে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়।

সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ওই সময়  সরকার ভোজ্য তেল উৎপাদন ও বিক্রির ওপর থেকে ভ্যাট পুরোপুরি আর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেখে বাকি সব ভ্যাট প্রত্যাহার করে নেয়। পরে গত ২০ মার্চ লিটারে ৮ টাকা কমিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ঠিক করা হয় ১৬০ টাকায়। আর ৫ লিটারে ৭৯৫ টাকা থেকে কমিয়ে ৭৬০ টাকা এবং খোলা সয়াবিনের দাম ১৪৩ টাকা থেকে কমিয়ে ১৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবনার যৌক্তিকতা তুলে ধরে বাণিজ্য সচিব (সিনিয়র) তপন কান্তি ঘোষ বলেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম অত্যধিক মাত্রায় বেড়েছে।  দাম সমন্বয় না করলে ব্যবসায়ীরা আমদানি করতে পারত না। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতেই ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘অ্যাসোসিয়েশন একটি দাম প্রস্তাব করেছে। নিয়মানুযায়ী সেটি দেখে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব নিয়মনীতি অনুসরণ করেই ভোজ্য তেলের নতুন দাম সমন্বয় করা হয়েছে।’

জানা গেছে, ২৫ রমজানের পর থেকেই বাজারে সয়াবিন তেলের সরবরাহ সংকট দেখা দেয়।  তেল কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের খালি হাতে ফিরতে দেখা যায়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে তেল না পেয়ে পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা ক্রেতাদের রোষানলে পড়েন। অবশ্য ২৭ রমজানের পর থেকেই গতকাল পর্যন্ত সরকার নির্ধারণ করা দাম থেকে বেশি দামে ক্রেতাদের সয়াবিন তেল কিনতে দেখা গেছে। যদিও সরকার টিসিবির (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) মাধ্যমে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করে কিছুটা সামাল দেয়। তখন থেকেই তেলের দাম নিয়ে সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দেনদরবার চলে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ঈদের আগে ভোজ্য তেল আমদানিকারক, শোধনাগার ও পাইকারি বিক্রেতারা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। ঈদের পরপরই দাম সমন্বয় করতে সরকার উদ্যোগ নেবে এই প্রতিশ্রুতি দেয়। সয়াবিন তেলের বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের বিষয়ে গতকাল বেলা ৩টায় বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। বৈঠকে তেল পরিশোধনকারী কোম্পানির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর বিকেলে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

গেল ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য লেনদেনের বাজার কমোডিটি মার্কেট শিকাগো বোর্ড অব ট্রেডে (সিবিওটি) প্রতিটন সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৯৩৫ ডলারে।