বিএনপিকে চারে নামানোর ছক

বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক দলটিকে দেশের ৪ নম্বর দলে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে আটঘাট বাঁধছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া বিএনপি যেন মাঠের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে না পারে, সে জন্যও কিছু কৌশল অবলম্বন করতে যাচ্ছে সরকারি দল।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি আবার নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে সোচ্চার। বিভিন্ন ইস্যুতে দলটি মাঠেও নামছে। এরই মধ্যে নির্বাচনোত্তর জাতীয় সরকারের ধারণা সামনে এনেছে দলটি। এ নিয়ে মিত্রদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করছে তারা। বিএনপি নির্বাচনোত্তর জাতীয় সরকারের রূপরেখা তৈরি করছে, যার ভিত্তিতে দলটি সরকারবিরোধী বড় জোট গঠন করতে চায়।

রাজপথের প্রধান বিরোধী দলটির এসব প্রচেষ্টা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে আওয়ামী লীগ। দলটি তার প্রধান প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেলতে মাঠে নামতে যাচ্ছে। সেই লক্ষ্যে দলকে শক্তিশালী করার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে আওয়ামী লীগ।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপিকে দুর্বল করার কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটি যাতে মাঠে সংগঠিত হতে না পারে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে না পারে, সে জন্য আওয়ামী লীগ মাঠে থাকবে। পাশাপাশি সরকারের হাতে থাকা সুবিধাগুলো কাজে লাগাবে দলটি। বিএনপিকে দুর্বল করে রাখার কৌশল নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

বিএনপি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সর্বশেষ ক্ষমতায় আসে ২০০১ সালে। ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩০ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসে। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি ও তার নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। ২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে অংশ নিলেও দলটি মাত্র ৫টি আসনে জয়লাভ করে তৃতীয় হয়। ২২ আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসে জাতীয় পার্টি। এরপর থেকে বিএনপি বলে আসছে তারা শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মন্তব্য করেছিলেন যে বিএনপির অবস্থা হবে মুসলিম লীগের মতো। একসময়ের প্রভাবশালী মুসলিম লীগকে জনপ্রিয়তা হারিয়ে রাজনীতির মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ের কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির অবস্থা ছিল শোচনীয়।

এ অবস্থায় আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনীতি কোন পথে এগোবে সেই হিসাব-নিকাশ থেকে আওয়ামী লীগ নানা ছক করে রাখছে। এর মধ্যে বিএনপির মিত্রদের আসনছাড়া অন্যতম। বিএনপি অংশ না নিলে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য দেখাতে আওয়ামী লীগ সরকার নিবন্ধিত বেশির ভাগ দলকেই নির্বাচনে আনার পরিকল্পনা করেছে। সে ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ নিজেরা ২০০ আসন নিশ্চিত করে বাকি ১০০ আসন অন্যান্য দলকে ছেড়ে দেবে। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে বিএনপির মিত্রদের নির্বাচনে আনতে। তারা এলে বিএনপি একা হয়ে যাবে। শক্তি হারাবে দলটি। বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে তাহলে তৃতীয় একটি জোটকে পৃষ্ঠপোষকতা করবে। নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী বিরোধী দল কে হবে, সেটা ঠিক করা হবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের ওই নেতারা বলছেন, বিএনপির নির্বাচন ঠেকানোর কোনো শক্তিই নেই। সেই সুযোগই দেবে না ক্ষমতাসীনরা। বিএনপি যেভাবে দুর্বল ও অসংগঠিত হয়ে আছে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত সে অবস্থায় তাদের রেখে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

সরাসরি কিছু না বললেও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপি যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, দলটির সাংগঠনিক পরিস্থিতি যা, সব মিলিয়ে তাদের ওপর জনগণের ভরসা নেই।’ বিএনপি এখন দেশে কোনো ‘ম্যাটার’ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে,  সরকারবিরোধী অবস্থান ও নির্বাচন ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপি মাঠে নামলেই দলটির নেতাদের নামে যেসব পুরনো মামলা রয়েছে, সেগুলো সক্রিয় করা হবে। সারা দেশের তাদের নেতাকর্মীদের ভেতর গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এর জন্য ‘পুলিশি অ্যাকশনের’ প্রয়োজন পড়লে সেটিও জোরালো করা হবে। যাতে আন্দোলন করার ও নির্বাচন ঠেকানোর মতো কোনো পরিস্থিতিই সৃষ্টি করতে না পারে বিএনপি।

ওই নেতারা মনে করছেন, বিএনপির নেতারা মাঠে নামার সুযোগ না পেলে কর্মীরা মাঠে নামবে না।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির ব্যাপারে আমাদের অত মাথাব্যথা নেই। দেশের মানুষও বিএনপিকে নিয়ে ভাবে তা মনে হয় না।’ তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে আসবে কি আসবে না, সেটা বিএনপির সিদ্ধান্ত।’

ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতারা আরও বলেন, আর্থিক সহযোগিতা দিয়ে দলের যেসব নেতা ও ব্যবসায়ী এখনো বিএনপিকে জিইয়ে রেখেছেন প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান নিতে পিছপা হবে না। যাতে বিএনপি আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। তা ছাড়া বিএনপির প্রভাবশালী কিছু নেতার সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার মতো অপকর্মের প্রমাণ রয়েছে সরকারের কাছে। তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখতে সেগুলোও ব্যবহার করা হবে। ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করেন, এই সব কৌশলে বিএনপিকে ধরাশায়ী করতে সক্ষম হবে আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কেউই বিশ্বাস করেন না যে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না। তারা দাবি করেন, যদি বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেয়, সে ক্ষেত্রে সরকারবিরোধী অন্যতম শক্তি এ দলটিকে দেশের ৪ নম্বর দলে পরিণত করতে তেমন বেগ পেতে হবে না।

আওয়ামী লীগের ওই নেতারা আরও বলেন, নির্বাচনে না এসে বিএনপি নিশ্চয়ই দেশের ৪ নম্বর দল হতে চাইবে না। তারা মনে করেন, বিএনপি নিজেদের স্বার্থেই নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে পারবে না। নির্বাচনে না আসার ঘোষণা মূলত আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দর-কষাকষির কৌশল। সেদিকে যাবেই না আওয়ামী লীগ।

সাম্প্রতিক সময় বিএনপির মিত্র কয়েকটি দল নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকারের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে। তারা চায় সরকারকে হটিয়ে জাতীয় সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কার করে নির্বাচনে যেতে। এ অবস্থায় গত মার্চের শেষের দিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সরকারের নতুন ধারণা তুলে ধরেন। এখন দলটি এর রূপরেখা তৈরির কাজ করছে। বিএনপি বলছে, এই রূপরেখার ভিত্তিতে সরকারবিরোধী বৃহত্তর জোট গড়ে তুলবে, যে জোট নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে মাঠে নামবে। বিএনপির জাতীয় সরকারের ধারণা অনুযায়ী নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সবাইকে নিয়ে সরকার গঠন করবে। 

বিএনপির এই জাতীয় সরকার নিয়েও আওয়ামী লীগ নানা সময় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দলটি এখনো মনে করছে, এই ইস্যুতে বিএনপির তোড়জোড় থাকলেও সেটাতেও সুবিধা করতে পারবে না। কারণ, এরই মধ্যে বিএনপির মিত্রদের ভেতরে জাতীয় সরকার ইস্যুতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান রয়েছে। দিন যত যাবে, তাদের মধ্যে দূরত্ব বাড়বে।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির মিত্র শক্তিরাও অনেকেই খাদের কিনারায় চলে যাওয়া ওই দলটিকে তুলে আনতে চায় না। মিত্রশক্তির অনেকেই নিজের দলের স্বার্থ কতটুকু অক্ষুন্ন থাকবে সে হিসাবই করছে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, তাদের রাজনৈতিক কৌশলের খেলা তো এখনো শুরুই হয়নি। তা ছাড়া বিএনপির মিত্র দলগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কথা চালাচালি চলছে বলেও তারা দাবি করেন।

ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিমধ্যে জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে কাকে রাখা হবে এমন একটি প্রশ্ন তুলে দেওয়া হয়েছে। এটা কত দূর গিয়ে ঠেকে তা গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে আওয়ামী লীগ। সময়মতো জাতীয় সরকার সাংবিধানিক কি না, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসা হবে বলে জানান ওই সব নেতা। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা ভাঙতে পারবেন না, সেটাও প্রচারে আনা হবে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় সরকার নিয়ে বিএনপি ভাঁওতাবাজি করছে। জাতীয় সরকারের ভিত্তি কী, প্রধান কে, সেটাই তো জানে না দলটি।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি নিজেরাও জানে জাতীয় সরকার নিয়ে তারা কতটুকু যেতে পারবে।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক একাধিক নেতা বলেন, আগামী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত জনগণের দুর্ভোগ দূর করতে সবচেয়ে যতœশীল থাকবে সরকার। জনগণের পাশে থাকতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া আছে। তারা আরও বলেন, জনগণের ভেতরে স্বস্তি ও শান্তি থাকলে বিএনপির সঙ্গে জনগণ যাবে না। আর জনগণ না থাকলে বিএনপির কোনো পরিকল্পনাই সফল হওয়ার সুযোগ নেই। তারা মনে করেন, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ছে। ফলে জনগণ বিএনপির ডাকে সাড়া দেবে না।

এদিকে দেশের অন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলের এক হয়ে যে ফ্রন্ট করার আলোচনা সামনে এসেছে, সেটাকেও তেমন আমলে নেওয়া হচ্ছে না আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে; বরং দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার দাবি, বিকল্প কোনো ফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটলে মাথাব্যথার কারণ নেই। রাজনৈতিক প্রয়োজনে কয়েকটি দলের ঐক্য হলে আওয়ামী লীগের সহযোগিতাও পেতে পারে। সবকিছুই দেশের রাজনৈতিক প্রয়োজনে হতে পারে।