ভয়ংকর সেপ্টেম্বর

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৩৩ এএম

দেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসের মৃতের সংখ্যা সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনেই ছাড়িয়ে গেছে। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু হয়েছিল ৯৭ জনের। কিন্তু সেপ্টেম্বরের মাত্র ২৩ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ১০৪ জনের। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট মৃত্যুর ৫২ শতাংশের বেশি ঘটেছে শুধু সেপ্টেম্বরেই।

মঙ্গলবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম প্রকাশিত দৈনিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ৮৬৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান বলছে, সংক্রমণের চিত্র উদ্বেগজনক। সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩১ হাজার ৫২১ জন ডেঙ্গু রোগী। এটি বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৪৭ শতাংশ। আগস্ট মাসে আক্রান্ত ছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, জুলাইয়ে ৯ হাজার ২০৬ জন, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন এবং মে মাসে মাত্র ৭১৪ জন। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের সংক্রমণ আগস্টের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার বেশি এবং জুলাইয়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি।

আগস্টের পরই পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে : বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু-সংক্রমণ তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে ছিল। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার ১০৪ জন। কিন্তু জুলাই থেকে ঘন ঘন বৃষ্টি হওয়ায় সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে ৯ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হওয়ার পর আগস্টে তা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ২০ হাজার ছাড়ায়। সেপ্টেম্বর এসে সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারা আরও তীব্র হয়েছে। একইভাবে মৃত্যুও আগস্টে ৪৩ জন থেকে সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনেই ১০৪ জনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরেই আগস্টের তুলনায় দুই গুণের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে আগস্ট ছিল টার্নিং পয়েন্ট, আর সেপ্টেম্বর হয়ে উঠেছে সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস। মাস শেষ হতে এখনো এক সপ্তাহের বেশি সময় বাকি থাকলেও সেপ্টেম্বর ইতিমধ্যে বছরের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর মাস হিসেবে রেকর্ড গড়েছে।

মৃত্যুর কেন্দ্রও রাজধানী, তবে ঝুঁকি বাড়ছে জেলাগুলোতে : চলতি বছরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬১ জনের। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৪ জন, খুলনায় ৩৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ১০ জন, ময়মনসিংহে ১৯ জন। এতে বোঝা যাচ্ছে, ঢাকার পাশাপাশি বিভাগীয় শহর ও জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রভাব বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডেঙ্গু শুধু ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নয়। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগের বাইরে ৪০৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৩১৭ জন, খুলনায় ২৮০ জন, বরিশালে ১৭৮ জন, রাজশাহীতে ১৫৬ জন, ময়মনসিংহে ১১৩ জন, রংপুরে ৫৯ জন এবং সিলেটে আটজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বছরের মোট হিসাবেও রাজধানীর বাইরের বিভাগগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ৬০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ হাজার ৭৫৩ জন, বরিশাল বিভাগে ৯ হাজার ২১১ জন এবং ঢাকা বিভাগের (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১১ হাজার ৪৫৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

তরুণদের আক্রান্তের হার বেশি : বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১-২৫ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত। এ বয়সে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৭৪৯ জন। এরপর ২৬-৩০ বছর বয়সে ৯ হাজার ৬৩২ জন এবং ১৬-২০ বছর বয়সে ৯ হাজার ১৬৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। অন্যদিকে, মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ২৬-৪০ বছর বয়সীদের সংখ্যা বেশি, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

হাসপাতালে ৫ হাজারের বেশি রোগী : গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৫৭ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৬২ হাজার ১১৭ জন। তবে এখনো দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বরজুড়ে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শয্যার ওপর চাপও বেড়েছে।

ঢাকায় ৯০ শতাংশই ডেন-৩ ধরনের ডেঙ্গু আক্রান্ত

সম্প্রতি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ১৩ বছরে এক কিশোর। তার জ্বর ছিল তিন দিন। প্রথম দিন ১০১, দ্বিতীয় দিন ১০২ এবং তৃতীয় দিন ১০৩ ওঠার পর জ¦র কমে যায়।  জ¦র আসা-যাওয়া করত। প্লাটিলেট বৃদ্ধি শুরুর পর দেখা দেয় অন্য জটিলতা। ডাক্তার জানান, তার পেটে পানি জমেছে। শুরু হয় অ্যান্টিবায়োটিক। চলে সাত দিন। এরপর সুস্থ হয়ে ওঠে ওই কিশোর। ছেলেটির বাবা জানান, ছেলেকে যে চিকিৎসক দেখেছেন, তার কাছে আসা আরও কয়েকজন রোগীরও ডেঙ্গুর কারণে পেটে পানি জমে। যদিও সবাই ওষুধে সুস্থ হয়ে যায়।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুর ডেন-৩ ধরনে বেশি আক্রান্ত হয়েছে। ঢাকা ও এর আশপাশের ১৭ জেলায় জরিপ চালিয়ে ৯০ শতাংশই ডেন-৩ পেয়েছে আইইডিসিআর। অন্য যেসব জায়গায় জরিপ চালিয়েছে সেখানে ডেন-২ এবং ডেন-৩ সমান সমান।

চলতি বছরে আইইডিসিআর দেশের চারটি জেলায় জরিপ চালিয়ে কয়েকটি দিক দেখার চেষ্টা করে। জেলাগুলো হলো বান্দরবান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরগুনা ও পিরোজপুর।

আইইডিসিআর পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘চার জেলায় আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। আমরা দেখি লোকাল ট্রান্সমিশন কেমন ছিল। স্থানভেদে ডেঙ্গু সংক্রমণ হওয়ার কারণটা কী? ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কেমন? ভেক্টরগুলো কোথায় হয়? চার জেলায় চার ধরনের পেয়েছি। এসব জায়গায় মশার উৎপত্তিস্থল ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন। বান্দরবানে যেমন দেখেছি বাসার নিচে আর্টিফিশিয়াল ওয়াটার পটগুলো থাকে, সেগুলোতে বেশি। বরগুনা বা দক্ষিণাঞ্চলে হলো সুপারি বাগান যেগুলো আছে, এসব জায়গায় বেশি। মশা বেশি হয় সুপারি ক্ষেত্রের গোড়ায় জমা পানিতে। উত্তরবঙ্গে ডমেস্টিক ওয়েস্টে বেশি, যেমন নারিকেলে খোসায় জমা পানিতে। এসব জায়গায় মশা নিয়ন্ত্রণে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে আমার সেগুলো দেখিয়ে দিয়েছি। ডেঙ্গু মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় মশা নিয়ন্ত্রণ করা। মশা নিয়ন্ত্রণে থাকলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে থাকবে।’

ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, পার্বত্য অঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলে ডেন ২-এর প্রাদুর্ভাব একটু বেশি। ঢাকা শহরের ভেতরে এবং পিরোজপুরে কিছু এলাকায় ডেন ৩-এর প্রাদুর্ভাব বেশি। এই মুহূর্তে দেশে ডেন-২ এবং ডেন-৩ দুটি চলমান আছে। তবে ডেন-৩ এবার বেশি। শহরাঞ্চলে অর্থাৎ ঢাকা এবং ঢাকা আশপাশে ১৭ জেলায় ৯০ শতাংশের বেশি ডেন ৩-তে আক্রান্ত। অন্য জায়গায় ডেন-২ এবং ডেন-৩ সমান সমান।

কাদের জন্য ডেঙ্গু বেশি ঝুঁকির জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি আগে অন্য কোনো শ্রেণিতে আক্রান্ত হয়ে থাকে, এবার যদি পার্থক্য থাকে যেমন আগে ডেন-৩ হয়ে থাকলে, এবার ডেন-২ হলে বা আগে ডেন-২ হলে এবার ডেন-৩ হলে তাদের সিভিয়ার হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। কেউ আগে ডেন-২ বা ডেন ১-এ আক্রান্ত হলে পরে যদি তিনি অন্য ডেনে আক্রান্ত হন, তাহলে তার জন্য ডেঙ্গু শক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এই সময়ে জ্বর হলে অনেকেই অবহেলা করে পরীক্ষা করাতে যান না। ডেঙ্গু নিয়ে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেকে আবার মনে করেন জ¦র কমে গেলেই বুঝি আর সমস্যা নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো মানুষের ভুল ধারণা। এখন নানা ধরনের জ্বর হতে পারে। সেজন্য পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে পারলে, চিকিৎসাও সেইভাবে নিতে পারলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি কমে যায়।

ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ‘যাদের জ্বর হবে তারা যেন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ডেঙ্গু টেস্ট করান। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করবেন। কোনো টোটকা চিকিৎসা বা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, ঘরে বসে অপ্রচলিত চিকিৎসা নেওয়া যাবে না। ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে ডেঙ্গু-পরবর্তী জটিলতা কমে যাবে, মৃত্যুর ঝুঁকি কমে যাবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, এ বছর আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যুহার কম। আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি। সব হাসপাতালেই গাইডলাইন অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত