হাইড্রোকার্বনে ভরসা ইইউর

ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ অভিযানের পর দেশটির ওপর বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এসব নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটি হচ্ছে রাশিয়া থেকে তেল-গ্যাস আমদানি বন্ধ করা। তার বদলে আফ্রিকান হাইড্রোকার্বন দিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে চাচ্ছে ইইউ। ইউরোপের পরিকল্পনা হচ্ছে এ বছরের মধ্যে মস্কোর গ্যাসের ওপর থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ নির্ভরশীলতা কমানো। তার জন্য পশ্চিম ও উত্তর আফ্রিকান দেশগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে ইউরেপীয় ইউনিয়নের নেতারা।

আন্তর্জাতিক তেল বিশেষজ্ঞ ও ইএসসিপি ইউরোপ বিজনেস স্কুল ইন লন্ডনের অধ্যাপক ড. মামদুহ জি. সালামে বলেন, ‘গ্যাসের চাহিদা পূরণে ভিন্ন উৎস খোঁজার ইউরোপের এ চেষ্টা সফল হতে বেশ কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।’ রাশিয়ার বিকল্প হিসেবে আফ্রিকার দিকে নজর দেওয়াটা অবশ্য অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ আফ্রিকা অঞ্চলে প্রচুর প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, নাইজেরিয়ার কাছে প্রায় ২০৬.৫৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ আছে। আফ্রিকার দ্বিতীয় গ্যাস-মজুদ আলজেরিয়ার কাছে। দেশটির মজুদের পরিমাণ প্রায় ১৫৯.১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। সেনেগালের আছে ১২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। তবে মজুদ থাকা এ গ্যাস উত্তোলনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা আফ্রিকার অনুন্নত অবকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য অ্যানালাইসিস অব গ্লোবাল সিকিউরিটির সহপরিচালক ড. গ্যাল লুফট বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস তথা এলএনজির সক্ষমতা বাড়ানো একটি ব্যয়সাধ্য কাজ, এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থের বিনিয়োগ। একইসাথে এটি একটি সময়সাপেক্ষ কাজও। তিনি বলেন, ‘গ্যাস পরিবহনে আমার কাছে এলএনজির চেয়ে সিএনজি (কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস) বেশি বাস্তবসম্মত সমাধান মনে হয়। তবে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করার আরেকটি বাধা রয়েছে। সেটি হলো গ্যাসকে সিএনজিতে রূপান্তর করা গেলেও সেগুলো পরিবহন করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ট্যাংকার তৈরি করতে হবে। এর জন্য অনেক সময়ের দরকার। আর উত্তর আফ্রিকার পক্ষে খুব দ্রুত গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব কিনা সেটাও এখনো পরিষ্কার নয়।’ আরও একটি বিষয় আছেÑআফ্রিকায় চীনের আধিপত্য। চীনকে এড়িয়ে আফ্রিকা থেকে তেল-গ্যাস নেওয়া খুব একটা সহজ হবে না ইউরোপীয়দের জন্য।

২০২২ সালে নাইজার, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়া ট্রান্স-সাহারান গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্পটি এনআইজিএএল পাইপলাইন বা ট্রান্স-আফ্রিকান গ্যাস পাইপলাইন নামেও পরিচিত। প্রকল্প অনুযায়ী, পাইপলাইনটি প্রায় ৪১২৮ কিলোমিটার (২৫৬৫ মাইল) দীর্ঘ হবে। নাইজেরিয়ার ওয়ারি থেকে আলজেরিয়ার হাসি আর’মেল পর্যন্ত যাবে লাইনটি। আলজেরিয়ার কৌশলগত ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল দিয়ে এ পাইপলাইনের সাহায্যে বছরে ৩০ বিলিয়ন ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস ইউরোপের বাজারে সরবরাহ করা হবে। অন্যদিকে একই সময়ে রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম ও নর্ড স্ট্রিম ২ পাইপলাইন দুটি ইউরোপে ১১০ বিলিয়ন ঘন মিটার গ্যাস সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে।

আফ্রিকার যে দুটি দেশ মোটামুটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি করে, সেগুলো হচ্ছে আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়া। আলজেরিয়া বর্তমানে ২৯.৩ মিলিয়ন টন ও নাইজেরিয়া ২২.২ মিলিয়ন টন গ্যাস রপ্তানি করে। আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর গ্যাস উৎপাদন ও রপ্তানি ক্ষমতা সীমিত এবং এ দেশগুলোর কোনো এলএনজি প্ল্যান্ট বা পাইপলাইন নেই। অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রান্স-সাহারান পাইপলাইন এখনো কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ। আগামী ১০ বছরেও এই প্রকল্প আলোর মুখ দেখবে কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে।