ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের অন্যতম দুই সহযোগী মিশু ও জিসানও জামিনে ছাড়া পেয়ে বিদেশে চলে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পিয়াসা ও মৌ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মিশু ও জিসানও ছাড়া পেয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে যে কয়টি মামলা হয়েছে সবগুলোতেই তারা আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন বলে আমরা জানতে পেরেছি। পিয়াসা ও মৌকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে তিনি জানান। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, তাদের (পিয়াসা ও মৌ) দুই সহযোগী মিশু ও জিসান দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। তাদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দ্রুত সময়ে আদালতে দাখিল করা হবে।
ডিবির অন্য এক কর্মকর্তা জানান, করোনা সংক্রমণের সময় অর্থকষ্টে পড়েছিলেন পিয়াসা। এমন পরিস্থিতিতে মৌ ও পিয়াসা কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে অর্থ সহায়তা চান। কিন্তু ওইসব ব্যবসায়ী তাদের টাকা দিতে অপারগতা জানান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এক ব্যবসায়ীর স্ত্রীকে ফোন করেন পিয়াসা। তার কাছে ওই ব্যবসায়ীর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও আছে বলে জানিয়ে দেন। এ নিয়ে ওই পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। তারপরই তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০২১ সালের ২ আগস্ট রাতে ডিবির একাধিক টিম রাজধানীর বারিধারায় মডেল পিয়াসার বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্যসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওইদিন রাতেই পিয়াসার আরেক সহযোগী ও মডেল মৌকে মোহাম্মদপুরের নিজ ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুই মডেলকে গ্রেপ্তারের পরদিন তাদের সহযোগী মিশু ও জিসানকে আটক করা হয়। এ চারজনকে কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তাদের গ্রেপ্তারের পর ডিবির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তারা একটি ব্ল্যাকমেইলিং সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যতম সদস্য। সমাজের উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের তাদের বাসায় মাদক সেবনের ব্যবস্থা করে দিতেন তারা। পরে ওইসব ছেলেমেয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর ছবি ওঠাতেন। আর এসব ছবি দিয়ে শিল্পপতি বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনদের ব্ল্যাকমেইল করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন। তাদের বাসায় নিয়মিত বসত মদ ও সিসার আসর। ওইসব আসরে অংশ নিতেন ধনাঢ্য ব্যক্তি অথবা তাদের সন্তানরা। পিয়াসা ও মৌয়ের জালে ফেঁসেছেন অনেকেই। তারা এখন নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে পুলিশের শরণাপন্ন হন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বারিধারার ৯ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাসার তৃতীয় তলায় রয়েছে বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটটি পিয়াসার। ২০০৯ সালে সুপার হিরোইন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শোবিজ জগতে পা রাখেন পিয়াসা। তার আস্থাভাজন হিসেবে তার অবৈধ কারবার দেখভাল করতেন মৌ। পিয়াসার শিকার হওয়া দুই ব্যবসায়ীর মধ্যে একজন বেশ ক্ষমতাশালী। তারা বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে এমন কাজের জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন। সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশে তাদের ধরা হয়েছিল। পুলিশ বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে মোহাম্মদপুর ও গুলশান থানায় মাদক আইনে মামলা করে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর থেকেই পিয়াসাকে কারাগার থেকে বের করতে নানা মহলে তদবির করে তার পরিবার। ওই সময় বের হতে না পারলেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বের হয়ে গেছেন কারাগার থেকে।
গুলশান এলাকার একাধিক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, পিয়াসা ও মৌয়ের নানা বিষয় তদারকি করতেন মিশু ও জিসান। ঈদের কিছুদিন আগে তারা গোপনে দুবাই চলে গেছেন। ওই ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, গ্রেপ্তারের পর যারা পিয়াসাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন তাদের বিষয়ে তারা খোঁজখবর নিচ্ছেন। এ নিয়ে তারা আতঙ্কে আছেন। মিশু ও জিসান বিদেশে পালিয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে তারা পিয়াসা ও মৌয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।