সেরাদের স্বীকৃতি দিতে ভুলে গেছে বিসিবি!

সাকিব আল হাসানের জন্য এটা একরকম দীর্ঘশ্বাসই হবে। নিঃসন্দেহে দেশের সেরা ক্রিকেটার। অথচ হাতে ওঠেনি বর্ষসেরার একটি ট্রফিও। পাবেন কি, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) বর্ষসেরার পুরস্কার দেওয়াই তো বন্ধ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালে। তার আগে-পরে মাত্র দুবার ‘অ্যাওয়ার্ড নাইট’ (বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ) আয়োজন করেছিল বিসিবি। এরপর এই আয়োজন আর হয়নি। তাই সাকিব, তামিম, মুশফিক বা মাহমুদউল্লাহরা একরকম এই পুরস্কার না দেখেই অবসরের দিকে এগোচ্ছেন।

২০০৫ ও ২০০৭-এ যে দুবার বিসিবি বর্ষসেরা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল সেই স্মৃতির ওপর পড়েছে ধুলোর আস্তরণ। ১৫ বছরের সময়টা এতই বড় যে সম্ভবত সেই নথিও সংরক্ষণ হয়নি কোথাও। ২০০৫ এ বর্ষসেরা ক্রিকেট সাংবাদিক পুরস্কার পাওয়া বর্তমানে জাতীয় দলের মিডিয়া ম্যানেজার রাবিদ ইমামও খুব অল্পই স্মরণ করতে পারলেন। জানালেন, ২০০৫ এ বর্ষসেরা ক্রিকেটার ও ব্যাটসম্যান ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। পরের বার ২০০৭-এ সেরা ক্রিকেটার ও ব্যাটসম্যান হয়েছিলেন শাহরিয়ার নাফীস, সেরা বোলার ও অলরাউন্ডার হয়েছিলেন মোহাম্মদ রফিক।

বর্ষসেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার এখন প্রতি ক্রিকেট বোর্ডই আয়োজন করে। আইসিসি তো আলাদা ভাবে করেই। তাতে কোন ক্রিকেটার কতবার সেরা হচ্ছেন সেই প্রতিযোগিতা হয়। পুরস্কারে সম্মান পাওয়ার লড়াইয়ের মানসিকতা ক্রিকেটারদের মাঠের লড়াইয়ে সেরা হতে এগিয়ে দেয়। আইসিসি বর্ষসেরা পুরস্কার (স্যার গ্যারফিল্ড সোবার্স ট্রফি) শুরু করে ২০০৪ সালে। প্রথমবার বর্ষসেরা হয়েছিলেন রাহুল দ্রাবিড়। সেই সঙ্গে বর্ষসেরা ওয়ানডে, উদীয়মান ক্রিকেটারের পুরস্কারও দেওয়া হয়। অস্ট্রেলিয়ার অ্যালান বোর্ডার বর্ষসেরা পুরস্কার শুরু করে আইসিসিরও আগে, ২০০০ সাল থেকে। ভারতের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলোয় নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকা-পাকিস্তানও যথাক্রমে ২০১০ ও ২০১২ সাল থেকে নিজেদের বর্ষসেরা ঘোষণা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্ষসেরার ঘোষণা বা এর উদ্যোগে যতি চিহ্নই পড়ে আছে।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথম বর্ষসেরা আশরাফুল। ২০০৪-এ ভারতের সঙ্গে টেস্টে ১৫৮ রান ও ২০০৫-এ ন্যাটওয়েস্ট ট্রফিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো দুর্দান্ত সেঞ্চুরির জন্য স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। জানালেন আবার এই স্বীকৃতি চালু হলে দারুণ হবে, ‘এমন কিছু হলে তো অবশ্যই বর্তমান ক্রিকেটারদের জন্য বাড়তি অনুপ্রেরণা হতো। বছর শেষে কার কেমন পারফরম সেই অনুযায়ী মূল্যায়ন হতো। এছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটে যারা ভালো করে তাদেরও মূল্যায়ন করা হতো শুধু তাই না, সব ক্রিকেটারের একটা মিলনমেলাও হতো একে উপলক্ষ করে।’ পরের মৌসুমে বর্ষসেরা হওয়া শাহরিয়ার নাফীস স্বীকৃতি পেয়েছিলেন ২০০৬ মৌসুমে এক হাজার রান ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরির কারণে। বর্তমানে বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্সে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নাফীসও এমন স্বীকৃতি আবার দেখতে চান, ‘বিসিবি যে অ্যাওয়ার্ড নাইট সব ক্রিকেটারদের জন্য খুবই আগ্রহ ও উদ্দীপনার ছিল। সবাই তো পুরস্কার পেতে পছন্দ করে কিন্তু আমরা যে প্রতিষ্ঠানের অধীনে সেখান থেকে পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়া বাড়তি কিছু। তাই এই অ্যাওয়ার্ড আমাদের ক্রিকেটারদের মধ্যে খুবই আলোড়ন তুলেছিল। তাই সব ক্রিকেটারই চায় এই অ্যাওয়ার্ডটা আবার হোক। এটা ক্রিকেটারদের দাবিও। আশার কথা হলো বিসিবির এমন কিছু প্রতি বছর করার জোর বিবেচনায় আছে।’

বিসিবির অ্যাওয়ার্ড নাইটে ছেদ পড়ে আসলে সরকার বদলের সঙ্গেই। ২০০৭ এর শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শুরুতেই অনেক কিছুই বদলে যায়। বিসিবির বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ২০১২ সালে সরকারের মনোনীত হয়ে শুরু করেন। ততদিনে অ্যাওয়ার্ড নাইটে লম্বা ছেদ পড়ায় আর সেই আলোচনা আলোর মুখ দেখেনি। এরপর তৃতীয় দফায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েও বিসিবি অ্যাওয়ার্ড নাইটের ব্যাপারে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারেনি তার কমিটি।

তবে নাজমুল হাসান পাপনের কমিটিতে দীর্ঘদিন পরিচালক হিসেবে থাকা জালাল ইউনুস জানালেন পুরস্কারের বিষয়টি করোনার আগে এক সভায় উঠেছিল। মহামারীর কারণে আর এগোয়নি। সামনের সভাতেই বিষয়টি আবার তুলবেন বলে জানালেন ক্রিকেট অপারেশন্স প্রধান, ‘যদি নতুন করে শুরু করতে হয় তবে সবগুলো বছরের পুরস্কার দিয়ে আসতে হবে। সব না হলেও অন্তত বিগত কয়েক বছরের পুরস্কার দিয়ে আসতে হবে, না হলে খেলোয়াড়রা বঞ্চিত হবে। এরকম পুরস্কারে ক্রিকেটাররা উজ্জীবিত হয়। সামনের বোর্ড মিটিংয়ে এ বিষয়টা ওঠানো যায় কিনা দেখব।’

২০২১ সালের আইসিসি বর্ষসেরা ওয়ানডে ক্রিকেটারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন সাকিব। শেষ পর্যন্ত বাবর আজমের সঙ্গে আর পেরে ওঠেননি। আইসিসির এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের একজনই পেয়েছেন। ২০১৬ সালে সেরা উদীয়মান হন মোস্তাফিজুর রহমান। সাকিব-তামিম-মুশফিকরা আইসিসির স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ মেটাতে পারেন দেশের স্বীকৃতি দিয়ে। তবে বিসিবির এই অ্যাওয়ার্ড নাইট আবার কবে হবে সেটাই এখন প্রশ্ন।