হারুনের ৪ রফিকুলের ১২ বছর সাজা

ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির নামে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের মামলায় অভিযুক্ত সবাই দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। ডেসটিনি গ্রুপের প্রেসিডেন্ট সাবেক সেনাপ্রধান হারুন-অর-রশিদকে ৪ বছর ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীনকে ১২ বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। তারা ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির আরও ৪৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। সাজার সঙ্গে তাদের ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা অর্থদন্ড দিয়েছে আদালতযা রাষ্ট্রের অনুকূলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চতুর্থ বিশেষ জজ আদালত-৪ এর বিচারক শেখ নাজমুল আলম এই মামলার রায় দেন। ডেসটিনিকান্ডে তোলপাড়ের পর ২০১২ সালের জুলাইতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ মামলা করেছিল। ১০ বছর পর সেই মামলার রায় দেওয়া হলো।

ডেসটিনির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ট্রি প্লান্টেশন প্রজেক্টের অর্থ-আত্মসাতের আরেকটি মামলা একই আদালতে বিচারাধীন। এ মামলায় ইতিমধ্যে ৭ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান।

অর্থ পাচারের এ মামলায় গত ২৭ মার্চ দুদক ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে রায়ের জন্য ১২ মে (গতকাল) ধার্য করা হয়। আসামিদের মধ্যে রফিকুল আমীন ও মোহাম্মদ হোসেন কারাগারে ছিলেন। রায় ঘোষণার আগে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এ ছাড়া হারুন-অর-রশিদ, দিদারুল আলম, জেসমিন আক্তার, জিয়াউল হক ও সাইফুল ইসলাম জামিনে থেকে আদালতে হাজির হন।

আলোচিত এ মামলার রায়টি ছিল এক হাজার পৃষ্ঠার। বিচারক শুধু রায়ের সার-সংক্ষেপ ও আসামিদের দন্ডদানের বিষয়টি পড়ে শোনান।

মামলাসংশ্লিষ্ট দুদকের আইনজীবীরা জানান, টাকার অঙ্কে অর্থ পাচারের অভিযোগ, আসামির সংখ্যা এবং ভলিউমের (নথি) হিসেবে দুদকের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় মামলা এবং রায়। দুদকের কোনো মামলায় এত বেশিসংখ্যক আসামির রায় হলো।

যে সাজা পেলেন আসামিরা : রফিকুল আমীনকে ১২ বছর কারাদন্ড ২০০ কোটি টাকা জরিমানাঅনাদায়ে আরও তিন বছর কারাদন্ড, হারুন-অর-রশীদকে ৪ বছর কারাদন্ড সাড়ে ৩ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও ৬ মাস কারাদন্ড, ডেসটিনি-২০০০-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসেনকে ১০ বছর কারাদন্ড, দেড় কোটি টাকা জরিমানাঅনাদায়ে এক বছর কারাদন্ড, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক গোফরানুল হক, পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন ও সাঈদ-উর-রহমানকে ১০ বছর করে কারাদন্ড, ১৮০ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আড়াই বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনকে ৯ বছর কারাদন্ড, ৩০ কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ২ বছর কারাদন্ড, ইরফান আহমেদ সানীকে ৯ বছর কারাদন্ড, দেড়শ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে তাকেও ২ দুই বছর কারাভোগ করার রায় দেওয়া হয়েছে। মিসেস ফারাহ দীবা, ইঞ্জিনিয়ার শেখ তৈয়বুর রহমান, নেপাল চন্দ্র বিশ্বাসকে ৮ বছর করে কারাদন্ড ৪০ কোটি টাকা অর্থদন্ডআনাদায়ে তাদের আরও দুই বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। জমশেদ আরা চৌধুরীকে ৮ বছরের কারাদন্ড ৩৫ কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও ২ বছর কারাবাস, জাকির হোসেন, আজাদ রহমান ও আকবর হোসেন সুমনকে ৯ বছর কারাদন্ড ১২৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আড়াই বছর সাজার রায় হয়েছে। মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, মো. সাইদুল ইসলাম খান রুবেল ও মজিবর রহমানকে ৮ বছরের কারাদন্ড, ১২৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আড়াই বছর কারাদন্ড, সুমন আলী খানকে ৯ বছর কারাদন্ড, ১২৫ কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আড়াই বছর কারাভোগ, শিরীন  আকতার ও রফিকুল ইসলাম সরকারকে ৮ বছরের কারাদন্ড, ১২৫ কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আড়াই বছর কারাভোগ করতে হবে বলে রায়ে বলা হয়।

এ ছাড়া লে. কর্নেল (অব.) মো. দিদারুল আলমকে ৮ বছর কারাদন্ড, ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে এক বছর কারাভোগ, ড. এম হায়দারুজ্জামানকে ৬ বছরের কারাদন্ড, ১০ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে এক বছর কারাভোগ, মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনকে ৬ বছর কারাদন্ড, ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে এক বছর কারাভোগ, কাজী ফজলুল করিমকে ৫ বছর কারাদন্ড, ৫০ লাখ টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সফিকুল ইসলামকে ৭ বছরের কারাদন্ড, ১০ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও এক বছর কারাভোগ, জিয়াউল হক মোল্লা ও ফিরোজ আলমকে ৫ বছরের কারাদন্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে এক বছর কারাবাসের রায় হয়েছে। ওমর ফারুককে ৫ বছর কারাদন্ড, ২৫ লাখ টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে এক বছর কারাভোগ, সিকদার কবিরুল ইসলামকে ৫ বছর কারাদন্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে এক বছর  কারাদন্ড, সুনীল বরুণ কর্মকারকে ৮ বছরের কারাদন্ড, ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও দুই বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। ফরিদ আক্তারকে ৮ বছর কারাদন্ড, আড়াই কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে আরও দুই বছর কারাবাস, এস. এম শহিদুজ্জামান চয়নকে ৮ বছর কারাদন্ড, ১৫ কোটি টাকা জরিমানাঅনাদায়ে আরও দুই বছর কারাভোগ, আব্দুর রহমান তপনকে সাত বছর কারাদন্ড, ১ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ড, মেজর (অব.) সাকিবুজ্জামান খানকে ৫ বছর কারাদন্ড, ১ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও একবছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। এস. এম আহসানুল কবির বিপ্লব ও এএইচএম আতাউর রহমানকে ৮ বছরের কারাদন্ড, ১০ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও দুই বছর কারাভোগ, জিএম গোলাম কিবরিয়া মিল্টনকে ৮ বছরের কারাদন্ড, ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও দুই বছর কারাবাস; আতিকুর রহমানকে সাত বছর কারাদন্ড, ৫ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও দুই বছর সাজার রায় হয়েছে। খন্দকার বেনজীর আহমেদ, একেএম সফিউল্লাহ ও দেলোয়ার হোসেনকে ৭ বছর কারাদন্ড, ১ কোটি টাকা অর্থদন্ড অনাদায়ে তাদের আরও এক বছর সাজা দেওয়া হয়েছে। মিসেস জেসমিন আক্তার মিলনকে ৫ বছর কারাদন্ড, এক কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। সফিকুল হককে ৭ বছররের কারাদন্ড, ১ কোটি টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও এক বছর কারাদন্ড, মোল্লা আল  আমিনকে চার বছর কারাদন্ড, ১০ লাখ টাকা অর্থদন্ডঅনাদায়ে আরও ৬ মাস কারাভোগের রায় হয়েছে।

এ মামলায় জামিনে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ দিদারুল আলমের ৮ বছরের সাজার মেয়াদ আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। রায়ের পর আদালত থেকেই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। হারুন অর রশিদসহ বাকি ছয় আসামিকে সাজা পরোয়ানা দিয়ে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এর মধ্যে রফিকুল আমীন আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন। মামলায় বাকি ৩৯ আসামি পলাতক রয়েছেন।

রায়ে বলা হয়, গ্রেপ্তার হলে বা আদালতে তারা যেদিন আত্মসমর্পণ করবেন সেদিন থেকে তাদের সাজার মেয়াদ হিসাব করা হবে।

দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২০২ সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। আসামিদের মধ্যে ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন সাফাই সাক্ষ্য দেন।

যেভাবে বিচার : ২০১২ সালের ৩১ জুলাই রাজধানীর কলাবাগান থানায় ডেসিটিনির শীর্ষ ব্যক্তিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি এবং ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন প্রজেক্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০১৪ সালের ৫ মে দুদক আদালতে উভয় মামলার অভিযোগপত্র দেয়। এর মধ্যে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভের মামলায় ৪৬ জন এবং ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশনের দুর্নীতির মামলায় আসামি ১৯ জন। হারুন-অর-রশিদ ও রফিকুল আমীন দুই মামলাতেই আসামি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০০৮ সাল থেকে মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভের নামে ডেসটিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। সেখান থেকে ১ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। ওই অর্থ-আত্মসাতের ফলে সাড়ে ৮ লাখ বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন। আর ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ২ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাড়ে ১৭ লাখ বিনিয়োগকারী। দুদক ৩৪টি ব্যাংকে এ ধরনের ৭২২টি হিসাবের সন্ধান পায়, যেগুলো পরে জব্দ করা হয়। আত্মসাৎ করা ৪ হাজার ১১৯ কোটি টাকার মধ্যে ৯৬ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হেেয়ছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।

রফিকুল-হারুনের মুক্তি চেয়ে স্লোগান : নিজেদের গ্রাহক দাবি করে ডেসটিনি গ্রুপের দুই শীর্ষ কর্মকর্তার মুক্তির দাবিতে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন অনেকে। রায় ঘোষণার আগে থেকে তারা আদালত প্রাঙ্গণে এসে জমায়েত হন। তারা রায়ের আগে ও পরে ডেসটিনি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন এবং প্রেসিডেন্ট হারুন-অর-রশীদসহ শীর্ষ কর্তাদের মুক্তি ও গ্রাহকের টাকা ফেরতের দাবি জানান।

রায়ে সন্তুষ্ট দুদক, আপিলে যাবে আসামিপক্ষ : রায়ের প্রতিক্রিয়ায় দুদকের কৌঁসুলি মীর আহমেদ আলী সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাল্টিপারপাস কোম্পানির নামে বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাতের এটি একটি বড় ঘটনা। আমরা আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। এই রায়টি দৃষ্টান্তমূলক এবং একটি মাইলফলক। আমরা সন্তুষ্ট।’

সাবেক সেনাপ্রধান হারুন-অর-রশিদের আইনজীবী এম মাইনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনি (হারুন) ডেসটিনির কোনো টাকা আত্মসাৎ করেননি। তার হিসাবে একটি টাকাও যায়নি। ডেসটিনির কোনো সম্পত্তি বা টাকা-পয়সা তিনি লেনদেন করেননি। তাকে বেআইনিভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ এবং হাইকোর্টে আপিল করব।’