অতীত ভুলে জয়ের খোঁজে বাংলাদেশ

সাকিব আল হাসান খেলবেন, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের আগে এটাই বড় খবর। দল কী করবে না করবে তা যেন গৌণ। বাংলাদেশ অধিনায়ক মুমিনুল হকের সংবাদ সম্মেলনে সাকিবের খেলা, তার অন্তর্ভুক্তিতে দলের শক্তি কেমন সেটাই হলো প্রথম প্রশ্ন। মুমিনুল ইতিবাচক। জানান সাকিব খেলছেন, তাতে দলের শক্তিও বাড়ছে। কিন্তু ফলাফলে পরিবর্তন আসবে কী। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের যে পরিণতি তাতে সহজেই বাংলাদেশের জয়ের পক্ষে বাজি রাখা যায় না। তাতে কি! মুমিনুল সবসময়ই জয়ের জন্য মাঠে নামার কথা বলেন, কালও ব্যতিক্রম হলো না। আগে কী হয়েছে তা নিয়ে না ভেবে নতুন ম্যাচে জয় চান তিনি। ওদিকে শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক দিমুথ করুনারতেœরও স্বাভাবিকভাবে অভিন্ন লক্ষ্য। তবে চ্যালেঞ্জটা ভিন্ন। করুনারতেœ যে দুবার চট্টগ্রামে খেলেছেন কোনোবারই টেস্ট জেতেনি শ্রীলঙ্কা। এবার অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রামে না জেতার অতীত বদলাতে চান।

মুমিনুলের ঘোষণায় সাকিব একাদশে ফেরায় বাংলাদেশ দলের কম্বিনেশন সহজ হয়ে গেল। দুই পেসার ও দুই স্পিনার নিতে এখন আর বাধা নেই। সাকিব থাকছেন তৃতীয় স্পিনার হিসেবে। তবুও আজকের সকালের জন্য অপেক্ষাই বাড়ালেন মুমিনুল। বরাবরের মতো সকালের উইকেট দেখে একাদশ সাজাবে বাংলাদেশ। এমনকি আজকের উইকেট কেমন হবে তাও নাকি জানেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক। অথচ শ্রীলঙ্কা অধিনায়ক করুনারত্নে এসেই জানালেন, “পিচ একদম ব্যাটিং সহায়ক। এমন উইকেটে বোলারদের কিছুই করার নেই। ২০ উইকেট নেওয়া খুব কঠিন হবে। তার জন্য ‘বিশেষ কিছু’ গিয়ে ভাবতে হবে।”

কিন্তু এমন উইকেটেও তো হতাশ করেন বাংলাদেশ ব্যাটাররা। সেই অতীত বারবারই এসেছে ফিরে। সবশেষ পাকিস্তানের বিপক্ষেও চট্টগ্রামে লিডের সুবিধা নিতে পারেনি বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৩ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ব্যাটিং ব্যর্থতার পুরনো রোগেই ভুগেছে। একই কারণে সবশেষ দক্ষিণ আফ্রিকাতেও হতাশা গ্রাস করেছে বাংলাদেশকে। তাই ভালো ব্যাটিং করে সেই ধারাবাহিকতাটা রাখা এই সিরিজে বাংলাদেশের বড় চিন্তার কারণ। সেই বিষয়ে এ কয়দিন কাজ করেছেন বলে জানান মুমিনুল। এই চেষ্টায় সফল হতে সাহায্য করবে নিজেদের পরিচিত কন্ডিশন, ‘দেখেন প্রত্যেকটা সিরিজে এরকম ফেল হলেও ব্যাটসম্যান হিসেবে সবাই জিনিসগুলো থেকে ওভারকাম করতে চায়। আমরা এগুলো নিয়ে কাজ করছি। আগের সিরিজে কী হয়েছে, সেটা নিয়ে চিন্তা করছি না। ওই কন্ডিশন আর এই কন্ডিশন আলাদা। এখন এখানে কীভাবে মানিয়ে নেব এটাই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওই জায়গা থেকে কতটা শিখছি।’

মুমিনুলের চাওয়ার সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্সেও মিলতে হবে। সবশেষ এক বছরে টেস্টে লিটন দাশ ছাড়া অভিজ্ঞ কোনো ব্যাটারই ধারাবাহিক হতে পারেননি। নতুনদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান জয় ও ইয়াসির আলি রাব্বি নিউজিল্যান্ড থেকে আস্থা তৈরি করছেন। কিন্তু মুশফিকুর রহিম দলে থেকেও নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে ব্যর্থ। তবে আশার কথা লঙ্কার বিপক্ষেই তিন দ্বিশতকের একটি আছে মুশফিকের। সেই ইনিংস ২০১৩ সালে হলেও তার কাছে পুরনো ছন্দে ফেরার দাবি পুরো দলের। ২০২১-এ শ্রীলঙ্কা সিরিজে ভালো করা তামিম ইকবাল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফিরে খুব ভালো কিছু করতে পারেননি। চট্টগ্রামেও সবসময় রান পান এমন না, তবুও তার ব্যাটেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে। সাকিব একাদশে অনেকটা আনফিট হয়েই থাকবেন। তবে সবচেয়ে বেশি যার দিকে নজর থাকবে তিনি মুমিনুল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বরাবর রান পাওয়া এই ব্যাটসম্যান নিজের দুঃসময় কাটাতে পাচ্ছেন প্রিয় ভেন্যু চট্টগ্রামকে।

মুমিনুলদের জন্য পরিচিত কন্ডিশনের সঙ্গে সুবিধা হিসেবে যোগ হচ্ছে লঙ্কানদের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পিছিয়ে থাকা। এ বছর বাংলাদেশের চেয়ে কম ম্যাচ খেলেছে করুনারতেœর দল। ভারতের সঙ্গে সবশেষ সিরিজে হারও জুটেছে তাদের। সঙ্গে দেশের নাজুক অর্থনীতি ও শৃঙ্খলার মানসিকতায়ও আঘাত পড়েছে। এর ওপর বাংলাদেশে এসে দুদিনের একমাত্র অনুশীলন ম্যাচেও খেলতে পারেনি দলটি। সবমিলিয়ে নিজেদের দুঃসময় কাটাতে পিছিয়ে থাকা শ্রীলঙ্কাকে পাচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও করুনারতেœ এমনটা ভাবেন না। তার বিশ্বাস না খেললেও প্রস্তুতি আছে তাদের, ‘প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলা আমাদের জন্য সমস্যা না। আমরা দেশে চারদিনের সুপার লিগ খেলে এসেছি। হ্যাঁ, এ বছর আমরা একটু কম খেলেছি। আন্তর্জাতিক ম্যাচ প্রস্তুতি হয়তো কম, কিন্তু আমরা ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার মধ্যেই ছিলাম। সেটা অবশ্যই কাজে দেবে।’ পাশাপাশি অনভিজ্ঞ বোলিং লাইন নিয়েও চিন্তা নেই লঙ্কান অধিনায়কের। জানালেন স্পিন বিভাগ তরুণ হলেও তাদের ওপর বিশাল আস্থা তার, ‘হ্যাঁ, আমাদের অনেক কিছুই নতুন। যেমন কোচ, বোলাররা। কোচ এখনো আমাদের সঙ্গে মানিয়ে উঠতে পারেননি। এটা তার প্রথম সিরিজ হবে। আর বোলাররাও খুব বেশি ম্যাচ খেলেনি। যদি স্পিনারদের কথা বলি তো এম্বুলদেনিয়া বেশি মানে ১৫ ম্যাচ খেলেছে। কিন্তু দেখবেন তার ৭০ উইকেট আছে। আর রমেশ-জায়া (বিক্রমা) অল্পদিনেই অনেক কিছু শিখেছে। আমি ওদের ওপর অবশ্যই আস্থা রাখছি।’

এই স্পিনে আবার বাংলাদেশের সমস্যা। দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পর উঁচু মানের স্পিন খেলতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছিলেন মুমিনুল হক। ইদানীং অধিনায়কের সমস্যাটাই বেশি হচ্ছে। তবে তার বিশ্বাস বাজে সময়ে নেই তিনি। তেমনি ব্যাটসম্যানদের কেউই বাজে সময়ে নেই। এই টেস্টে সেই প্রমাণও রাখবেন বলে জানান, ‘ আমি মনে করি না যে আমি বাজে সময়ে আছি। সেরকম ভাবলে সত্যিই রান পাব না। অবশ্যই আমরা ব্যর্থতার জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেছি। এই টেস্টে ভালোভাবে কামব্যাক করতে পারব।’

বাংলাদেশের জন্য এই সুযোগটা আছে। সম্প্রতি এই শ্রীলঙ্কার সঙ্গেই ভালো খেলছে বাংলাদেশ। দলটির সঙ্গে ২০১৩ থেকে ৫ সিরিজের চারটিতে একটি করে ড্র আছে। ২০১৭ সালে ১-১ ব্যাবধানে সিরিজ ড্রয়ের সাফল্যও আছে। সেই সাফল্যর ধারাবাহিকতা রাখতে পারবেন বিশ্বাস করেন মুমিনুল। সেখানে নিজ দলের কিছু সেরা তারকাকে মিস করার আক্ষেপও করলেন, ‘তাসকিন, মিরাজ আমাদের অতীত টেস্টগুলোতে সেরা পারফরম করেছে। ওদের হারানোটা সত্যিই খুব দুঃখজনক। তবে এটা ভালো যে সাকিব ভাই ফিরেছেন। গত সিরিজে তো তাকে ছাড়াই খেলতে হয়েছিল। আশা করি যারা আছে তারা অনুপস্থিতদের অপূর্ণতাটা কাটিয়ে দিতে পারবে।’

চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সবশেষ টেস্ট জিতেছিল ২০১৮ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে। চার বছর এই ভেন্যুতে জয় নেই। এই সময়ে জিম্বাবুয়ে ছাড়া আর কোনো দলকে ঘরের মাঠে হারানোর সাফল্যও নেই। সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ভুলে সমশক্তির শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ঘরের মাঠে টেস্ট জয়ের আনন্দ মুমিনুলরা ফেরাতে পারবেন? বহু দামি এই প্রশ্নের মীমাংসা হবে আগামী ৫ দিনে সাগরিকার জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে, যার গ্যালারিতে দুবছর পর ফেরার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে ক্রিকেটানুরাগীদের।