প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত হয়। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে সঠিকভাবে রক্তচাপ মাপুন, নিয়ন্ত্রণ করুন, সুস্থ থাকুন দীর্ঘদিন। বিশ্বব্যাপী ১২০ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। উচ্চ রক্তচাপ একটি নীরব ঘাতক।
কারণ : শতকরা ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের কারণ অজানা। হরমোনঘটিত কিছু রোগব্যাধি, কিডনির রোগ, স্টেরয়েড জাতীয় এবং অন্যান্য কিছু ওষুধ শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগ রক্তচাপের জন্য দায়ী। এছাড়া গর্ভকালীন অবস্থায় সাময়িক সময়ের জন্য কেউ কেউ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে অনেকগুলো উপাদান উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বয়স, স্থূলতা, অতিরিক্ত চর্বি ও লবণ জাতীয় খাবার গ্রহণ, বংশগত ধারা, আয়েশি যাপিত জীবন, অতিরিক্ত মানসিক অভিঘাত উচ্চ রক্তচাপের প্রধান ঝুঁকি।
লক্ষণ ও প্রভাব : সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো উচ্চ রক্তচাপের কারণে মাথাব্যথা, নাক থেকে রক্তক্ষরণ, ঝাপসা দৃষ্টি, বুক ধড়ফড় ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। রক্তচাপ খুব বেড়ে গেলে বমি, বুকে ব্যথা, অস্থিরতা, শারীরিক দুর্বলতা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দেয়। এটি নীরবে নিভৃতে রক্তনালি এবং হৃৎপি-ের ক্ষতিসাধন করে থাকে। ফলে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। হার্ট ফেইলরের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে রক্তচাপ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ চোখের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর রেটিনার ক্ষতিসাধন করে। ফলে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসে। কিডনি ফেইলরের পেছনে উচ্চ রক্তচাপ অনেকাংশে দায়ী। এজন্য উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় নীরব ঘাতক।
রক্তচাপ নির্ণয় : হৃৎপি- যখন সংকুচিত হয় তখন রক্তনালিতে যে চাপ অনুভূত হয় সেটা হচ্ছে সিস্টোলিক রক্তচাপ। আর হৃৎপি- যখন প্রসারিত হয় তখন রক্তনালিতে চাপ কমে আসে। সেটি হচ্ছে ডায়াস্টলিক রক্তচাপ। সিস্টোলিক ও ডায়াস্টলিক রক্তচাপ যথাক্রমে ১৪০ এবং ৯০ মিমি পারদের বেশি হলে তাকে বলা হয় উচ্চ রক্তচাপ। ঘরে বসেই রক্তচাপ মাপক যন্ত্রের সাহায্যে যে কেউ নির্ণয় করতে পারবেন। তবে অনেকেই সঠিকভাবে রক্তচাপ পরিমাপ করতে পারেন না। সেজন্য অভিজ্ঞ কারও কাছ থেকে এটি নির্ণয়ের পদ্ধতি জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সাময়িক রক্তচাপ বৃদ্ধি : পরিমাপ করে একবার রক্তচাপ বেশি পেলেই উচ্চ রক্তচাপ বলা যৌক্তিক হবে না। বিশেষত অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সামনে এলে কারও কারও মানসিক উদ্বিগ্নতার কারণে রক্তচাপ সাময়িক সময়ের জন্য স্বল্পমাত্রায় বেড়ে যেতে পারে। এটাকে বলা হয় হোয়াইট কোট হাইপারটেনশন। তাই ডাক্তারের চেম্বারে এসে রক্তচাপ বেশি পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া অনুচিত। সেজন্য রক্তচাপ একাধিকবার মেপে যদি এটি সার্বক্ষণিক বেশি পাওয়া যায় তাহলে কেবলমাত্র ওষুধ শুরু করতে হবে।
করণীয় : সাধারণ কিছু নিয়মাবলি মেনে চলতে হবে। লবণ গ্রহণ সীমিত করতে হবে। দৈনন্দিন লবণ গ্রহণের পরিমাণ হবে দেড় গ্রাম। চর্বি জাতীয় খাবার গ্রহণে সচেতন হতে হবে। তবে মাছের চর্বি উচ্চ রক্তচাপের জন্য উত্তম। শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে হবে। খাদ্য তালিকায় স্থান দিতে হবে শাকসবজি, বাদাম, ফলমূল ইত্যাদি। নিয়মিত শরীরচর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ১৫০ মিনিট জোর কদমে হাঁটার অভ্যাস করতে হবে। মানসিক অভিঘাত থেকে মুক্ত থাকার জন্য প্রার্থনা, মেডিটেশন, ইয়োগা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বাইরে ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি করা যেতে পারে। ঘুমাতে হবে প্রতিদিন অন্তত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। ধূমপান এবং অ্যালকোহল সম্পূর্ণ বর্জন করতে হবে। এ সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।