আমি দেশে ফিরতে চাই : পি কে হালদার

বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে ভারতে পালানো প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার এখন দেশে ফিরতে চান। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গতকাল সোমবার মেডিকেল চেকআপের পর দেশটির কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) পশ্চিমবঙ্গের কার্যালয়ে প্রবেশের সময় তিনি সাংবাদিকদের বাংলাদেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান।

পি কে হালদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যে। আমি দেশে ফিরতে চাই।’

ভারতের একাধিক গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকারও পি কে হালদারসহ গ্রেপ্তার অন্যদের দেশে ফেরানোর জন্য আবেদন জানিয়েছে। তবে এর নানা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। আর্থিক দুর্নীতি, নাম ভাঁড়িয়ে ভুয়া নথিপত্র নিয়ে বসবাস, বেআইনি সম্পত্তিসহ একাধিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের সাজা খাটতে হবে ভারতে। তারপর তারা বাংলাদেশে যেতে পারবেন। তবে গোটা বিষয়টি নির্ভর করছে ইডির ওপর। তারা কী ধারায় মামলা দিচ্ছে বা আদালত কী ধরনের শাস্তি ঘোষণা করছে তার ওপর নির্ভর করছে পি কে হালদাররা কবে বাংলাদেশে যেতে পারবেন। গতকাল সকালে ইডির আঞ্চলিক দপ্তর সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্স থেকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় পি কে হালদারকে। হেফাজতে থাকা আসামিদের প্রতি ২৪ ঘণ্টায় চেকআপ করা বাধ্যতামূলক। সেই নিয়ম অনুযায়ী আজ (গতকাল) তার মেডিকেল চেকআপ করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোকনগরের একটি বাড়ি থেকে পি কে হালদার ও তার পাঁচ সহযোগীকে গত শনিবার গ্রেপ্তার করে ইডি। ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে পি কে হালদারসহ আরও রয়েছেনÑ তার ভাই প্রাণেশ হালদার, বাংলাদেশের বাসিন্দা ইমাম হোসেন, স্বপন মিত্র, উত্তম মিত্র ও আমানা সুলতানা ওরফে শর্মি হালদার। স্বপন ও উত্তম পি কে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধার আত্মীয় বলে জানা গেছে। বাকি দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার ওই নারী সুস্মিতা সাহা, তিনি পি কে হালদারের স্ত্রী।

এদিকে ইডি এক বিবৃতিতে বলেছে, হাজার কোটি টাকা পাচারকারী পি কে হালদার নাম পাল্টে শিবশংকর নামে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বসবাস করতেন। ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ, বসবাস, বেনামে সম্পত্তি কেনা, আইনবহির্ভূতভাবে অর্থ বাংলাদেশ থেকে ভারতে আনাসহ অনেক অভিযোগ রয়েছে পি কে হালদার ও তার পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে।

গত রবিবার ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর শনিবার গভীর রাতে ইডি থেকে পি কে হালদারের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ব্যাঙ্কশালের আদালতে শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট বিচারক শর্মি হালদারকে মঙ্গলবার (আজ) পর্যন্ত জেল হেফাজতের নির্দেশ দিয়ে অন্য পাঁচজনকে তিন দিন করে রিমান্ডের আদেশ দেন।

গতকাল ইডি কর্মকর্তারা জানান, রিমান্ডে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের সম্পত্তি, ফ্ল্যাটের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত হওয়া বিভিন্ন নথি, কাদের অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানান, পি কে হালদারসহ গ্রেপ্তার ৬ জনকে মঙ্গলবার (আজ) আবার আদালতে তোলা হবে। এখন পর্যন্ত তাদের বাজেয়াপ্ত হওয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ গতকাল ব্যাংক বন্ধ ছিল। আজও ছুটি। আগামীকাল (আজ) সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে গিয়ে অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেন খতিয়ে দেখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সন্দিহান ইডি। ফলে আগামীকাল (আজ) তাদের আদালতে তুলে ফের হেফাজতে চাইতে পারে ইডি।

ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে ভারতে এসে পি কে হালদার কীভাবে ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করাসহ রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড এবং আধার কার্ড পেলেন এবং রাজ্যের একাধিক জায়গায় সম্পত্তি ক্রয় করলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কে বা কারা তাকে এসব কাজে সাহায্য করেছে তা খতিয়ে দেখছে ইডি। সেই সঙ্গে তিনি নাম ভাঁড়িয়ে শিবশঙ্কর হালদার পরিচয়ে রাজ্যে বসবাস করছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ইডির তদন্তে উঠে এসেছে, পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের পেছনে কোনো প্রভাবশালীর যোগ রয়েছে। তবে সেই ব্যক্তি কে, তা জানার জন্য গ্রেপ্তারদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এই চক্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তির যোগ রয়েছে কি না, তাও জানার চেষ্টা চলছে।

সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, আর্থিক দুর্নীতি ছাড়া পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বাকি অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সিবিআইয়ের হাতে তাদের হস্তান্তর করা হতে পারে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নাম ভাঁড়িয়ে ভুয়া নথিপত্র নিয়ে দেশটিতে বসবাস করা, বেআইনি সম্পত্তিসহ একাধিক অপরাধ।

ইডি জানিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগরে সুকুমার মৃধা নামে এক মাছ ব্যবসায়ীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পি কে হালদারসহ ওই ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাংলাদেশে পি কে হালদারের সহযোগী ছিলেন সুকুমার মৃধা। তিনি ভারতে পালিয়ে আসেন। তবে সুকুমার এখনো পলাতক বলে জানায় ইডি।

ভারতীয় গণমাধ্যম আরও জানায়, বেশ কয়েক দিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছিল ইডি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারত সরকারকে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের জানানোর পর ইডিও সক্রিয় হয়ে ওঠে।

ইডি কর্মকর্তাদের ধারণা, পি কে হালদার, সুকুমার মৃধাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং চক্রের যোগ রয়েছে। সুকুমার মৃধার সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশ রয়েছে, সেই নামটাই জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। এ ক্ষেত্রেও কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়তে পারে।