জঙ্গি থেকে শুরু করে দুর্ধর্ষ অপরাধীরা ব্যবহার করছে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক অচল করতে ব্যবহৃত বিশেষ ডিভাইস (যন্ত্র) জ্যামার। অপরাধীদের অবস্থান শনাক্ত থেকে শুরু করে গ্রেপ্তার অভিযান পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে পদে পদে বাধার সৃষ্টি করছে এ ডিভাইসটি। মূলত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে অপরাধীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য দেশে জ্যামার আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ। এরপরও বিভিন্ন কৌশলে আমদানি হচ্ছে নিষিদ্ধ এই ডিভাইস। আর বিভিন্ন হাত ঘুরে তা পৌঁছে যাচ্ছে ব্যবহারকারীদের হাতে। জ্যামার বিক্রি চক্রের কিছু সদস্য বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও আড়ালেই থেকে যাচ্ছে এর ব্যবহারকারীরা। গত কয়েক বছরে দেশে কয়েক শ জ্যামার বিক্রির তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেলেও ব্যবহারকারী গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র কয়েকজন। এমনকি দেশে এই জ্যামারের অবৈধ ব্যবহারকারী বর্তমানে কত, তার সঠিক হিসাবও জানা নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
পুলিশ ও র্যাবের তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্যামারের মতো প্রযুক্তি সাধারণত সরকারি নিরাপত্তামূলক কাজে আমদানি ও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু রাজধানীর বায়তুল মোকাররম ও স্টেডিয়াম মার্কেটে এই প্রযুক্তি বিক্রি হচ্ছে হরহামেশাই। রাজধানী ছাড়াও দেশের অন্যান্য জায়গা এবং অনলাইনে বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে বিক্রি হচ্ছে জ্যামারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ডিভাইস। অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বৈধ যন্ত্রপাতির আড়ালে এগুলো আমদানি ও বিক্রি করছেন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপরাধী ধরতে গেলে জ্যামার সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক সময় অভিযান পরিচালনা করতে আমাদের বিভিন্ন ডিভাইস ব্যবহার করা লাগে, যেগুলো নেটওয়ার্কনির্ভর, সে ক্ষেত্রে কার্যক্রমে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ছাড়া অভিযান চলার সময় ঘটনাস্থলে আমাদের বিভিন্ন তথ্য পেতে হয়, যার ভিত্তিতে অভিযানটি পরিচালিত হয়। কিন্তু ঘটনাস্থলে যদি নেটওয়ার্ক না থাকে, তাহলে আমরা লাইভ ইনফরমেশন (তাৎক্ষণিক তথ্য) পাই না।’
এই গোয়েন্দা কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘জ্যামারের বিষয়টি আমাদের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। যারা ব্যবহার করছে, তাদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে।’
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোনো এলাকায় নাশকতা করতে চাইলে সন্ত্রাসীরা জ্যামার ব্যবহার করে সেই এলাকার টেলিযোগাযোগ ব্লক (অচল) করে ফেলতে পারে, যাতে কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নাশকতার বিষয়ে তথ্য দিতে না পারে। রাজধানীর পল্লবী, বনানী, নিকুঞ্জ, মহাখালী, পুরান ঢাকার কিছু এলাকা, পুরানা পল্টন, বনশ্রী ও ধানমণ্ডিতে এসব অবৈধ প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। জ্যামারসহ আমদানি নিষিদ্ধ অন্যান্য নেটওয়ার্ক ডিভাইস বেশি বিক্রি হচ্ছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনলাইন মার্কেটপ্লেস হলো দারাজ ওব বিডিস্টল ডট কম। চলতি বছরের ২০ ও ২৫ এপ্রিল বিটিআরসির পক্ষ থেকে ওই দুই প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এ সময় জ্যামার, বুস্টার, রিপিটারসহ বিটিআরসির অনুমোদনহীন বেতার যন্ত্রপাতি বিক্রি করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ব্লক করে এ-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিজ্ঞাপন অপসারণ করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে রাজধানীর উত্তরায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) তিন সদস্যকে জ্যামারসহ গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তখন ডিবি জানায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে ওই জঙ্গিরা জ্যামার ব্যবহার করছিল। এ ছাড়া ২০১৮ সালের এপ্রিলে রাজধানীর কাকরাইলে তাবলিগ জামাতের মারকাজ মসজিদে মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রাখার উদ্দেশ্যে জ্যামার বসানোর তথ্য পায় পুলিশ। এক প্রকৌশলী ওই জ্যামার বসায় বলে দাবি করে পুলিশ জানায়, এলিফ্যান্ট রোডের একটি দোকান থেকে জ্যামার দুটি কেনা হয়। মারকাজের দক্ষিণ পাশের ভবনের তৃতীয় তলার দুটি কক্ষে সেগুলো স্থাপন করা হয়। পুলিশ সে সময় আরও বলেছিল, ‘বড় ধরনের ক্ষতিসাধনের লক্ষ্যে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করার উদ্দেশ্যে এসব জ্যামার বসানো হয়েছে।’
চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম মার্কেট, তেজগাঁও ও এলিফ্যান্ট রোডের বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালিয়ে অবৈধ জ্যামারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বশেষ গত শনিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ জ্যামার বিক্রির সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ২৪টি জ্যামার ও জ্যামার অ্যানটেনা। চক্রটি গত দুই বছরে দুই শোর বেশি জ্যামার বিক্রি করেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। র্যাবের দাবি, এ ডিভাইসটির ব্যবহারকারীরা দেশে নাশকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালিত হবে।
র্যাবের এ অভিযানসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বড় বড় ব্যবসায়ী নিষিদ্ধ জ্যামার দেশে আমদানি করছেন। তাদের বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে এ বিষয়ে তদন্ত কতটা এগোবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
র্যাবের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অপরাধ জগতের যারা এই জ্যামার কিনেছে, তাদের একটি তালিকা করা হচ্ছে। সেই তালিকা ধরে অভিযান পরিচালিত হবে।’
বিটিআরসির কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধ জগতের সদস্যদের জ্যামারের মতো ডিভাইস ব্যবহারের ফল ভোগ করছেন সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারীরা। ঘন ঘন কল ড্রপ বা নেটওয়ার্ক না পাওয়ার বিষয়ে অপারেটররা সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছে। তাদের গবেষণার ফলাফল যথেষ্ট উদ্বেগের। সেখানে দেখা গেছে, রাজধানীর পল্লবী থানার একটি অংশ, বনানী থানার দুটি আবাসিক এলাকা, নিকুঞ্জ, মহাখালী ডিওএইচএস ও পুরান ঢাকার কিছু এলাকায় জ্যামার, বুস্টার ও রিপিটার বেশি ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া পুরানা পল্টন, বনশ্রী ও ধানমণ্ডিতে এসব অবৈধ প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ জ্যামার, বুস্টার ও রিপিটার অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদেও জ্যামার বসানোর তথ্য মিলেছে।
বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনো জায়গায় জ্যামার থাকলে তার আশপাশের প্রচুর গ্রাহক নেটওয়ার্ক সংযোগ পান না। অবৈধ বুস্টার বা রিপিটারও একই ধরনের সমস্যা তৈরি করে। মোবাইল প্রযুক্তি একটি প্রকৌশল পরিকল্পনা ও মানদণ্ড মেনে করা হয়, যাতে গ্রাহকরা নির্বিঘেœ সেবা পেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি অবৈধভাবে নিজের নেটওয়ার্ক সবল করার জন্য বুস্টার বা রিপিটার বসায়, তাহলে তার আশপাশের সব মোবাইল ফোন অপারেটরের গ্রাহকেরই সেবায় বিঘœ ঘটে। ব্যক্তি উদ্যোগে অবৈধভাবে স্থাপিত এসব প্রযুক্তির কারণে অসংখ্য গ্রাহক ভোগান্তি পোহাচ্ছে।
এসব ডিভাইসের ব্যবহার বন্ধে বিটিআরসি সম্প্রতি একটি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসির উপপরিচালক (ডিডি) এস এম গোলাম সরোয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্যামার হচ্ছে একটি ডিভাইস, যেটি নির্দিষ্ট স্থানে রাখলে একটি সার্টেন এরিয়ার (নির্দিষ্ট এলাকা) মধ্যে কোনো ধরনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না। মোবাইলে কোনো কল আসবে না এবং যাবে না। কোনো ধরনের ইন্টারনেট ব্যবহার করা যাবে না। একটি নির্দিষ্ট এরিয়ায় (এলাকা) টেলিযোগাযোগ ব্লক করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যে ধরনের জ্যামার উদ্ধার হয়েছে, সেগুলো ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার স্কয়ারফিটের (বর্গফুট) একটি ফ্ল্যাট এরিয়ার টেলিযোগাযোগ ব্লক করার সক্ষমতা রাখে।’