বাজারে বিক্রিতে ধস

দেশের বাজারগুলোতে চলতি বছরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। বাড়তে বাড়তে এখন এমন অবস্থা, মানুষ খাবারের জন্য অন্য অনেক খাতের ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। তাতেও কূল না পাওয়ায় অনেকেই কমিয়ে দিয়েছেন খাবারের পরিমাণ ও মান। সব মিলিয়ে মানুষ এখন আগের চেয়ে বাজারে যাচ্ছেন কম। ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়ে অনেকেই গুটিয়ে নিয়েছেন ব্যবসা; বিশেষ করে মাছ-মাংস ও হোটেল-রেস্তোরাঁর ব্যবসায় একধরনের ধস নেমেছে। মাংসের দোকানের ক্রেতা যেমন কমেছে, তেমনি হোটেল-রেস্তোরাঁয় মাছ-মাংসের পরিবর্তে ডাল-আলু ভর্তার কাস্টমারই বেশি আসছেন।

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমে অর্ধেকে নেমেছে। ঈদের আগে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিক্রি হতো, কয়েক দিন ধরেই তার অর্ধেকও বিক্রি হচ্ছে না। গতকাল মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরের গোশত ব্যবসায়ী ইকবাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের আগে ভোক্তা অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া দামেই গোশত বিক্রি করছি। তবুও আগের মতো বিক্রি করতে পারছি না। দিন দিন বিক্রি কমে এলেও খরচ কমছে না। আমার এই দোকানে আমিসহ মোট চারজন কাজ করি। কর্মীদের মজুরি এবং দোকান ভাড়া মিলিয়ে দৈনিক প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা খরচ রয়েছে। এক মাস ধরে তাদের বেতন দিতে পারছি না। বিক্রি না হলে কোথা থেকে দেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার এখানে দুই মাস আগেও প্রতিদিন ১০টার বেশি খাসি জবাই হতো, এখন দিনে ৩টার বেশি জবাই করতে পারি না। তারও আবার কোনো কোনো দিন অনেক গোশত থেকে যায়।’

কারওয়ান বাজারের ফ্রেশ গোশতের দোকানের মালিক তাহের বলেন, ‘বর্তমানে যে হারে সবকিছুর দাম বাড়তেছে তাতে মনে হচ্ছে মানুষ বাজারে আসাই বন্ধ করে দেবে। গত কয়েক দিনে গোশতের দোকানগুলোতে মানুষ একেবারেই কম আসতেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার পাশের দোকানি তার চালান হারিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। যেভাবে বাজারে কাস্টমার কমছে, এভাবে আর দিন বিশেক চললে আমার ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যাবে।’

কারওয়ান বাজারের মাসফিয়া ব্রয়লার হাউজের মালিক সুজনের সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দিন দিন দেশের মানুষের অসচ্ছলতা বাড়ছে। বাজারমুখী মানুষের সংখ্যাও কমে আসছে। আমাদেরও বেচাবিক্রি কম হচ্ছে। ঈদের আগে আমি যা বিক্রি করতাম, বর্তমানে তার অর্ধেকও বিক্রি করতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এক মাস আগেও আমার দোকানে দৈনিক ৫০০ কেজি মুরগি সেল হতো। বর্তমানে তা কমে ২৫০-৩০০ কেজিতে নেমেছে। যেসব হোটেল আগে ১০০ পিস মুরগি নিত তারা এখন ৪০ থেকে ৫০টি করে নিচ্ছে। তারা বলছেন, তাদের ক্রেতাও অর্ধেকে নেমেছে।’ 

পাশের বি এম ব্রয়লার হাউজের মালিক মানিক জানান, বর্তমান বাজারে মুরগির বাচ্চা, ওষুধ ও খাবারের দাম বেড়েছে বহুগুণ। তাই মুরগির দাম বেড়ে গেছে। ফলে সংকট হয়েছে ক্রেতার। আগের মতো কাস্টমার আসে না। যারা আসেন, তারাও চাহিদার তুলনায় অনেক কম কেনাকাটা করেন।

মালিবাগের ডিম ব্যবসায়ী শহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে বাজারের যা অবস্থা চলছে তা কখনো কল্পনা করিনি। বাজারে জিনিসপত্রের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি মানুষের ক্রয়ও কমেছে। পরিচিত অনেককেই দেখেছি চাহিদার তুলনায় অনেক কম বাজার করেছেন।’ 

নতুন করে বেড়েছে মসলার দামও। কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে চায়না আদা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা। গত ২১ মার্চ যা বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকায়। দেশি আদা বিক্রি হচ্ছে ১২০-১২৫ টাকা, যা কয়েক দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়।

কারওয়ান বাজারে আসা হাসানুর নামের এক ক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারে প্রবেশ করে এক ঘণ্টা যাবৎ ঘুরতেছি। টাকা এবং বাজার সদাইর সঙ্গে মেলাতে পারছি না। একদিকে কিনলে আবার অন্যদিকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।’

গত দুই দিনে সবজির দাম বাড়েনি। দুদিন আগের দামেই বাজারে করলা বিক্রি হচ্ছে ৪০, চিচিঙ্গা ৩৮-৪০, লাউ ছোট ৫০, কুমড়া আকারভেদে ৫০ থেকে ৬৫, চালকুমড়ো ছোট ৫০, মরিচ ৮৫-৯০, পেঁপে ৫০-৫৫, ঢেঁড়স ৪০, লতি প্রতি কেজি ৬০ টাকায় কিনছেন ক্রেতারা।

তবে কমেছে মাছের দাম। ব্যবসয়ীরা বলছেন, আগের থেকে বর্তমানের প্রতি কেজি মাছ অন্তত ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে। মোহাম্মদপুর কাঁচাবাজার থেকে প্রয়োজনীয় সদাই নিয়ে বাসায় ফিরছিলেন মধ্য বয়সী সায়ীদ। তার সঙ্গে বাজার নিয়ে কথা বলতেই তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমান বাজারের যা অবস্থা, দেখা যাচ্ছে না খেয়ে দিন পার করতে হবে আমাদের। বাজার নিয়ন্ত্রণে না এলে আমাদের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী আমাদের খরচ অনাকাক্সিক্ষতভাবে বেড়েই চলেছে। অপরদিকে খরচ অনুযায়ী আমাদের আয় বাড়ছে না।’

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’ তবে বাজারের পণ্যের মূল্য বাড়ার পেছনে ব্যবসায়ীদেব ভূমিকা সব থেকে বেশি। তারা এক ধরনের কৃত্রিম সিন্ডিকেট তৈরির মাধ্যমে বাজারের অবস্থা খারাপ করে রেখেছেন।

তিনি বলেন, কে কতটুকু বাজার করবেন তা একান্ত ভোক্তার স্বাধীনতা। এখানে কারও কিছু বলার নেই। তবে ভোক্তাদের মনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সরকারি পদক্ষেপ আরও জোরদার করা হবে।