রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ভোজ্য তেলের দাম। যুদ্ধরত দেশ দুটিতেই সবচেয়ে বেশি সূর্যমুখী তেল উৎপাদিত হয় এবং দেশ দুটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওই তেল রপ্তানি করে। যুদ্ধের কারণে সূর্যমুখী তেল রপ্তানি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়, যার বিরূপ প্রভাব পড়ে সয়াবিন ও পাম অয়েলের মূল্যের ওপর। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া বিশে^র প্রথম ও দ্বিতীয় শীর্ষ পাম তেল রপ্তানিকারক দেশ। ইন্দোনেশিয়া এপ্রিল মাসে পাম তেল রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে ভোজ্য তেলের বাজারে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। ব্যবসায়ীরা অতি লাভের আশায় ভোজ্য তেল, বিশেষ করে সয়াবিন বিক্রি বন্ধ করে কৌশলে মজুদ করে রাখেন। করোনার কারণে এমনিতেই সাধারণ মানুষের আয়-উপার্জন কমে গেছে, তার ওপর ভোজ্য তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প আয়ের মানুষজনকে ফেলেছে মহাবিপদে।
২০২০ সালের তুলনায় বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে শতকরা ৪০ ভাগ। আজ থেকে এক বছর আগে ভোক্তা ভোজ্য তেলের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন বর্তমানে ওই কাজে তাকে ৪০ থেকে ৭৫ ভাগ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। সরকারি সংস্থা টিসিবির মতে, ২০২০ সালের মে মাসে ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ছিল ৫২০ টাকা। বর্তমানে সেটির দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮৫ টাকা। অন্যদিকে পাম অয়েলের দাম এক বছরের ব্যবধানে শতকরা ৭৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভাবতে বিস্ময় লাগে প্রতি বছর কৃষিপ্রধান বাংলাদেশকে ভোজ্য তেল আমদানি বাবদ ২ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। (প্রতি ডলার ৯২ টাকা হিসেবে) টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ হলো ১ হাজার ৮৪০ কোটি।
বাংলাদেশে বার্ষিক ভোজ্য তেলের চাহিদার ব্যাপারে একেক সংস্থা একেক রকম কথা বলছে। কেউ বলেছেন, ২০ লাখ টন, কেউ বলছেন, ৩০ লাখ টন। কেউ বলছেন, প্রতি মাসে ১ লাখ ৫০ হাজার টন হিসেবে দেশে বার্ষিক ভোজ্য তেলের প্রয়োজন ১৮ লাখ টন। যে যাই বলুক না কেন, আমদানি ও উৎপাদনের উপাত্ত থেকে বলা যায়, ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ টনের নিচে নয়। কারও কারও মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে সয়াবিন তেলের বার্ষিক চাহিদা ১৩ লাখ টন এবং পাম অয়েলের চাহিদা ১৬ লাখ টন। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা আরও ১০ লাখ টন বেড়ে ৩৯ লাখ টনে দাঁড়াবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে ৫ লাখ ৬০ হাজার টন ভোজ্য তেল উৎপাদিত হয়, প্রয়োজনের তুলনায় যা নিতান্ত অপ্রতুল। মোট উৎপাদিত ভোজ্য তেলের মধ্যে সরিষা থেকে আসে ৩ লাখ ৬০ হাজার, সয়াবিন থেকে ১ লাখ এবং সূর্যমুখী, তিল ও বাদাম থেকে আসে ১ লাখ টন। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়া তেল ফসল উৎপাদনের জন্য বেশ উপযোগী। চাষ পদ্ধতি সহজ। অল্প খরচ, স্বল্পজীবনকাল হওয়ায় কৃষকের কাছে এটি একটি লাভজনক ফসল। বাংলাদেশে জনসংখ্যা অনুপাতে আবাদি জমির পরিমাণ খুবই সীমিত। দেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য ধানের চাষ হয় ৭০ ভাগ জমিতে। আর শতকরা ৩ ভাগ জমিতে হয় তেল ফসলের চাষ, যার মধ্যে আবার শতকরা ৭০ ভাগই হলো সরিষা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি থেকে ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৭০০ টন তেল বীজ উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে সরিষা ৭ লাখ ৮৭ হাজার, চীনাবাদাম ১ লাখ ৬৫ হাজার ১৪২, তিসি ১ হাজার ৯৯০, তিল ৮৪ হাজার ৬০০, সয়াবিন ১ লাখ ৩৫ হাজার ২৩১ ও সূর্যমুখী ২৫ হাজার ৬৬৪ টন।
দেশে ভোজ্য তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে নিম্নলিখিত স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
১. বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়। এ পরিমাণ জমির অন্তত ২৫% জমিতে বিনা উদ্ভাবিত বিনা ধান ৭, বিনা ধান ১৬ ও বিনা ধান ২২ কাটার পর স্বল্পমেয়াদি বিনা সরিষা ৪, বিনা সরিষা ৯ চাষ করতে হবে। ২. যদি আমন চাষের মোট জমির এক-চতুর্থাংশে অর্থাৎ ১৪ লাখ হেক্টরে স্বল্পমেয়াদি বিনা ও বারি সরিষা চাষ করা যায়, তাহলে ওই পরিমাণ জমি থেকে ১৮ লাখ ৬২ হাজার টন সরিষা বীজ উৎপাদন করে বছরে ৭ লাখ ৪৪ হাজার টন সরিষা তেল উৎপাদন করা সম্ভব।
৩. এ ছাড়া আখ, গম ও ভুট্টার জমিতে সাথী ফসল হিসেবে সরিষা ও তিসির চাষ করা যেতে পারে। নাটোর, রাজশাহী, পাবনা প্রভৃতি জেলায় প্রচুর পরিমাণে মসুর ডালের চাষ করা হয়। ডালের সঙ্গে মিশ্র ফসল হিসেবেও ওইসব জেলায় সরিষার চাষ করা যেতে পারে।
৪. দেশে উৎপাদিত ৪ কোটি টন ধান থেকে বিপুল পরিমাণ চালের কুঁড়া উৎপাদিত হয়। ওই কুঁড়ার ব্যবহার নিশ্চিত করে তা থেকে ৭ লাখ টন ভোজ্য তেল উৎপাদন সম্ভব। দেশে রাইস ব্র্যান থেকে তেল তৈরির আধুনিক মিল স্থাপন করতে হবে।
৫. দেশের উপকূলীয় লবণাক্ত অঞ্চলের যেসব জমিতে আমন ধান ছাড়া আর কিছুই হয় না, সেসব জমিতে লবণাক্তসহিষ্ণু বিনা ও বারি উদ্ভাবিত সরিষা, সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেলবীজ চাষ করতে হবে।
৬. ‘আমার তেল আমি খাবো, সংসারের খরচ কমাবো’ এই স্লোগানের মাধ্যমে দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের তাদের সারা বছরের জন্য প্রয়োজনীয় সরিষা, তিল ও তিসি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
৭. কম তেলে ও তেলবিহীন রান্নার কাজে দেশের গৃহিণীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অতিরিক্ত তেল পরিভোগের অপকারিতার কথাও তাদের বিষদভাবে বোঝাতে হবে।
৮. ২০২৫ সালের মধ্যে পাম তেলের উৎপাদন তিন গুণ বাড়ানোর প্রয়াসে ভারত সরকার এক যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণের জন্য আমরাও দেশের উপকূল, পাহাড়ি ও পার্বত্য অঞ্চলে এবং বসতবাড়ির আশপাশে, গ্রামীণ রাস্তার দুধারে, বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে, অফিস-আদালত, কল-কারখানার পতিত জমিতে পামগাছ রোপণ করতে পারি।
৬. বরি ও খরিপ মৌসুমে বিনা ও বারি উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল তিল চাষের জন্য কৃষকদের মধ্যে বিনা মূল্যে তিল বীজ বিতরণ করতে হবে।
৭. শুধু প্রধান তেল ফসল নয়, অপ্রচলিত তেল ফসল, কুসুম ও কালিজিরা চাষেও কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। চরের জমিতে বছরে দুবার উচ্চ ফলনশীল বাদাম চাষের ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. আমদানিনির্ভর তেলবীজ ও ভুট্টা উৎপাদনে শতকরা ৪ ভাগ সুদে কৃষিঋণ প্রদানের সরকারি সিদ্ধান্ত শুধু কাগজে-কলমে নয়; মাঠপর্যায়ে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। অবহেলা ও অনীহাকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও রন্ধন পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে ভোজ্য তেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা সম্ভব।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি)
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন