আমরা যুদ্ধ সংঘাত চাই না, শান্তি চাই : প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের জাতীয় পতাকার মান সমুন্নত রেখে বিশে^ বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গতকাল রবিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস-২০২২’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি। গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠানে যোগদান করে প্রধানমন্ত্রী এ বছরের শান্তিরক্ষী দিবসের থিম ‘জনগণের শান্তি অগ্রগতি : অংশীদারিত্বের শক্তি’র মাধ্যমে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করার অঙ্গীকার করেন।

বিশে^র বিভিন্ন স্থানে কর্মরত শান্তিরক্ষীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পেশাদারিত্ব ও সততা বজায় রেখে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। নিজেদের সুরক্ষিত রেখে আত্মবিশ্বাস নিয়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে কাজ করবেন। কারণ বিশ্ব শান্তি প্রচার করা একটি মহৎ কাজ।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর তরুণ সদস্যরা একুশ শতকের বিশ^ শান্তি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম। সব সময় মনে রাখবেন যেকোনো দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাসটা হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। কাজেই সকলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবেন। তাহলেই আপনারা সফল হবেন।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি জাতিসংঘের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রয়োজনে আরও শান্তিরক্ষী পাঠাতে প্রস্তুত। বিশ^ করোনাভাইরাসের মতো মহামারী অতিক্রম করতে করতেই আবার একটি যুদ্ধের দামামা (রাশিয়া-ইউক্রেন) বেজে উঠেছে; যা আজ বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বিরাট প্রভাব ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো যুদ্ধ বা সংঘাত চাই না, শান্তি চাই। সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক সেটাই আমাদের কাম্য। বিশ^বাসীর পাশাপাশি বাংলাদেশের জনগণ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আপনাদের এ ভূমিকা চিরকাল স্মরণ রাখবে।’

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠান থেকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত দক্ষিণ সুদান, লেবানন, সেন্ট্রাল আফ্রিকা রিপাবলিক এবং কঙ্গোতে অবস্থানকারী বাংলাদেশি কন্টিনজেন্টের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তিনি ইউএন পিস কিপিং জার্নালের একটি সংস্করণের মোড়কও উন্মোচন করেন।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল বিরামে ডিওপ এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি জিওন লুইস অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে আইনমন্ত্রী শান্তিরক্ষা মিশনে শহীদ দুই পরিবার এবং সাহসিকতার জন্য একজনসহ ১৪ জন আহত শান্তিরক্ষীকে পদক তুলে দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার মহৎ উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গকারী শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ৩৪ বছরের যাত্রার ওপর একটি ছোট ভিডিও ডকুমেন্টারিও প্রদর্শিত হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘে আমাদের উত্থাপিত ‘শান্তির সংস্কৃতি’ শীর্ষক প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। তখন থেকে প্রতি বছর এটি জাতিসংঘ কর্র্তৃক স্বীকৃত হয়ে আসছে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশে ‘পিস কিপিং অপারেশন ট্রেনিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০২ সালে এটি ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং-বিপসট’ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ইনস্টিটিউটের মর্যাদা পায়। বিশ্বে এটি বর্তমানে শান্তিরক্ষীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই ইনস্টিটিউট স্থাপন বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।  সরকারপ্রধান বলেন, এ মুহূর্তে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ১২১টি দেশের ৭৫ হাজার ৫১৬ জন শান্তিরক্ষী নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের ৬ হাজার ৮২৫ জন শান্তিরক্ষী রয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের ৫১৯ জন নারী শান্তিরক্ষী বিশ্ব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত আছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জেনে আনন্দিত যে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং পুলিশ বাহিনী তাদের নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করে চলেছে। তা ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব শান্তিরক্ষা মিশনে আরও বেশিসংখ্যক নারী সদস্যকে সম্পৃক্ত করার আগ্রহ দেখিয়েছেন; আমরা বলেছি আমরা সব সময় প্রস্তুত।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের শান্তিরক্ষীরা ৪৩টি দেশে ৫৫টি মিশন সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে ১৩টি মিশনে আমাদের শান্তিরক্ষীরা নিয়োজিত রয়েছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিভিন্ন মিশনে ডেপুটি ফোর্স কমান্ডার এবং সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাবাব ফাতিমা বর্তমানে জাতিসংঘের পিস-বিল্ডিং কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী শান্তি প্রতিষ্ঠায় শহীদ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।