রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতকারী ৬ দশমিক ৪ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারী ৪০-৫৯ বছর বয়সীদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির শিকার ৮০ দশমিক ৮ শতাংশ নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব পড়ছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
১৩-৩৫ বছর বয়সী ৮০৫ জন নারীর ওপর এ জরিপ চালানো হয়। গতকাল শুক্রবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘ঢাকা শহরে গণপরিবহনে হয়রানি : কিশোরী এবং তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল প্রকাশ করে আঁচল ফাউন্ডেশন।
গবেষণায় রাজধানীতে বহুল ব্যবহৃত গণপরিবহনগুলোর মধ্যে বাস, ট্রেন, লেগুনা ও রাইড শেয়ারিংকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রাজধানীর আজিমপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারাসহ বিভিন্ন এলাকার ১৩ থেকে ৩৫ বছরের নারীরা এ গবেষণায় অংশগ্রহণ করেছেন। অনলাইন এবং অফলাইন উভয় পদ্ধতিতে ডেটা সংগ্রহ করা হয়েছে।
জরিপটিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৮৬ দশমিক ০৯ শতাংশ। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৯ দশমিক ০৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ কলেজপড়ুয়া এবং ৪ দশমিক ২২ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া। এছাড়াও ৭ দশমিক ৭০ শতাংশ কর্মজীবী এবং ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ গৃহিণীও অংশ নিয়েছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী জানিয়েছেন, তারা দিনে অন্তত ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা গণপরিবহনে ব্যয় করেন। ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ অন্তত ১ থেকে ২ ঘণ্টা, ২৪ দশমিক ৭ শতাংশ ১ ঘণ্টার কম এবং ৫ দশমিক ৮ শতাংশ ৪ ঘণ্টার বেশি সময় গণপরিবহনে ব্যয় করেন।
সংবাদ সম্মেলনে নারীদের প্রতি হয়রানি ও সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ। তিনি বলেন, বাসায়, রাস্তাঘাটে কিংবা গণপরিবহনে সর্বত্র নারীর প্রতি হয়রানি বাড়ছে। আমরা দেখেছি গণপরিবহনে হয়রানির শিকার হলে তরুণীদের কাজের স্পৃহা কমে যায়, তাদের বিষন্নতা বেড়ে যায়। এই বিষণœতা তাদের আত্মহত্যার দিকেও ধাবিত করতে পারে।
উত্তরণের দিক আলোকপাত করতে গিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, প্রতিটি গণপরিবহনকে সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারির আওতায় আনা, ড্রাইভার, হেলপারদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ দেওয়া, যেকোনো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে দ্রুত বিচার করা ইত্যাদি উদ্যোগ গ্রহণ করলে সমস্যার মাত্রা অনেকটাই কমে আসবে।
গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি নিয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. মো. ইসমাইল হোসাইন বলেন, আঁচল ফাউন্ডেশনের এ জরিপের মধ্যে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তা থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, এ সামাজিক সমস্যাকে পুরোপুরি মোকাবিলা করতে হলে আমাদের নৈতিকতাকে ঠিক করতে হবে। আমাদের সামাজিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং আইনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের জেনারেল সেক্রেটারি সামিরা আক্তার সিয়াম এ সমীক্ষা নিয়ে বলেন, নিরাপত্তাহীনতা একজন নারীর জন্য অনেক বড় একটি ব্যাপার। আর তা যদি হয় গণপরিবহনে প্রতিদিন যাতায়াতের ক্ষেত্রে, তাহলে এর ফলে মারাত্মক মানসিক অবসাদে ভুগতে পারেন একজন নারী। সামাজিক বৈষম্য বা অভিমতের কারণে গণপরিবহনে ঘটে যাওয়া এসব হয়রানির কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে দ্বিধাবোধ করেন অনেকেই। এমনকি এর ফলে কমে যায় তার আত্মবিশ্বাসও, যা মোটেও কাম্য নয়। তাই মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে এবং সুস্থ সমাজ গড়ার জন্য সবাইকে হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে নারীদের জন্য গণপরিবহন নিরাপদ করতে ১০টি প্রস্তাবনা তুলে ধরে আঁচল ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে গণপরিবহনে সিট সংখ্যার বেশি যাত্রী না তোলা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে বাস স্টাফসহ যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা, প্রতিটি বাসে সিটের পাশে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক বিভিন্ন লিফলেট লাগানো, নারীদের জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা করা ও বাসের সংখ্যা বাড়ানো এবং গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা ও প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিচার নিশ্চিত করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়।
গণপরিবহনের বড় সমস্যা যৌন হয়রানি : গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৬৩.৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী গণপরিবহনে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হয়েছেন। তন্মধ্যে ৪৬.৫ শতাংশ বলেছেন তাদের যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ১৫.৩ শতাংশ বুলিং, ১৫.২ শতাংশ সামাজিক বৈষম্য, ১৪.৯ শতাংশ লিঙ্গবৈষম্য এবং ৮.২ শতাংশ বডি শেমিংয়ের মতো হয়রানির শিকার হয়েছেন।
জরিপে গণপরিবহনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা বিবিধ কাজে যাতায়াতের প্রয়োজনে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৯.৪৪ শতাংশ গণপরিবহনে এবং ৬.৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহনে আসা-যাওয়া করেন। এছাড়াও ২.৭৩ শতাংশ ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার করে থাকেন। গণপরিবহনে যাতায়াতকারীদের ৮৪.১০ শতাংশ বাসে, ৪.৫৮ শতাংশ ট্রেন বা রেল, ১.৫৩ শতাংশ রাইড শেয়ারিংয়ে এবং ৩.২৭ শতাংশ সিএনজিতে যাতায়াত করেন।
যাত্রীদের হাতে বেশি হয়রানির শিকার : জরিপে যৌন নিপীড়নের শিকার নারীদের ৭৫ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের অন্য যাত্রীদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। ২০.৪ শতাংশ জানিয়েছেন তাদের হেলপারের মাধ্যমে, ৩ শতাংশ হকারের মাধ্যমে এবং ১.৬ শতাংশ ড্রাইভারের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সমীক্ষায় উঠে এসেছে। গণপরিবহনকে অনিরাপদ করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী সাধারণ যাত্রীরা। এছাড়া জরিপে দেখা গেছে, ৬১.৭ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী ৪০ থেকে ৫৯ বছর বয়সীদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ৩৬.৩ শতাংশ নারী কিশোর ও যুবক অর্থাৎ ১৩ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। নিপীড়নের ক্ষেত্রে মধ্যবয়সীরা এগিয়ে থাকলেও কিশোর-তরুণদের মাধ্যমে এ হারটা কম নয় বলে উল্লেখ করেছে আঁচল ফাউন্ডেশন।
আপত্তিকর স্পর্শের মুখোমুখি ১১.৯ শতাংশ : জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গণপরিবহনে চলাচলের সময় ১১.৯ শতাংশ নারী আপত্তিকরভাবে স্পর্শের মুখোমুখি হয়েছেন। ৩০.৮ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী জানিয়েছেন, গণপরিবহনে যথেষ্ট জায়গা থাকা সত্ত্বেও অন্য যাত্রীরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। ইচ্ছাকৃতভাবে হালকাভাবে স্পর্শ করে গেছেন ১৭.৯ শতাংশকে। এছাড়াও ১৪.২ শতাংশ নারী ইচ্ছাকৃতভাবে ধাক্কার শিকার হয়েছেন। বাজে মন্তব্যের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন ১৩.৮ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৬০.৯ শতাংশ নারীকে বাসে ওঠা-নামার সময় অসম্মতি থাকা সত্ত্বেও হেলপাররা স্পর্শ করেছে। ২৪.৬ শতাংশ নারী গত ছয় মাসে অন্তত তিনবার এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত স্পর্শের ভুক্তভোগী হতে হয়েছে।
ভিড়ে যৌন হয়রানি বেশি : গণপরিবহনে হালকা ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ৩২.৮ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়েছেন। অতিরিক্ত ভিড় যৌন হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ২৭.২ শতাংশের ক্ষেত্রে। বসে থাকা অবস্থায় যৌন নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন ২২.৯ শতাংশ। গণপরিবহনে ওঠা বা নামার সময় ১১.৩ শতাংশ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছেন। জরিপ অনুযায়ী দেখা গেছে, গণপরিবহনে সিটের অতিরিক্ত লোক নেওয়ার কারণে যৌন হয়রানি বাড়ছে।
হয়রানির শিকার হয়েও নারী থাকেন নীরব : যৌন হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩৪.৮ শতাংশ ভয় পাওয়ার কারণে নীরব থেকেছেন। ২০.৪ শতাংশ পরবর্তী সময়ে সেই গণপরিবহন এড়িয়ে চলেছেন। ৪.২ শতাংশ পার্শ্ববর্তী সহযাত্রীদের কাছে সাহায্যের অনুরোধ করেছেন। অন্যদিকে মাত্র ০.৫ শতাংশ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্যোগ নিয়েছেন। নারীদের প্রতিবাদী না হতে শেখালে তাদের হয়রানির শিকার হওয়ার হার বাড়তে থাকতে পারে বলে মনে করে আঁচল ফাউন্ডেশন।
প্রতিবাদ করে ঝামেলা জড়াতে চান না অনেকেই : গবেষণায় দেখা গেছে, যৌন নিপীড়নের ঘটনাকে অহেতুক ঝামেলা মনে করায় তা এড়াতে পিছিয়ে গেছেন ১৪.২ শতাংশ। আর কীভাবে তার পাশে দাঁড়ানো যায়, তা না বুঝতে পারায় সহযোগিতা করতে পারেননি ৩৩.৫ শতাংশ। সেই গণপরিবহনের অন্য যাত্রীদের সাহায্য করা উচিত বলে মনে করেছেন ১৪.৭ শতাংশ। আর ৭.৩ শতাংশ যৌন হয়রানি হতে দেখে ভীত হয়ে পড়ার কারণে সহযোগিতাপূর্ণ আচরণে এগিয়ে আসতে পারেননি বলে পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। এছাড়া যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পর ৩৬.৯ শতাংশ বলেছেন, অন্য যাত্রীরা যৌন হয়রানির মতো ঘটনাকে উপেক্ষা করে গেছেন। এমনকি ২ শতাংশ তরুণী ও কিশোরী জানিয়েছেন, গণপরিবহনের অন্য যাত্রীরা নিপীড়নকারীকে সমর্থনও করেছেন।
প্রভাব পড়ছে মানসিক স্বাস্থ্যে : গবেষণায় দেখা গেছে, ২১.২ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী গণপরিবহন ব্যবহারের সময় যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার কারণে পরবর্তীকালে ট্রমাটাইজড হয়েছেন। ২৯.৪ শতাংশের মনে গণপরিবহন এক ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ১৬.৪ শতাংশ হীনমন্যতায় এবং ১৩.৮ শতাংশ বিষণœতায় ভুগেছেন বলে জানিয়েছেন।
সহযোগিতা পাচ্ছেন না বেশিরভাগ নারী : সমীক্ষায় দেখা যায়, গণপরিবহনে হয়রানির শিকার ৫৭ শতাংশ নারী কারও সহযোগিতা পাননি। বাকি ৪৩ শতাংশ অন্যদের সাহায্য পেয়েছেন। গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হলে সাহায্য পাওয়ার জন্য ৯৯৯-এ কল করার জন্য উৎসাহিত করা হয়। তবে ৬২.৪ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী হেল্পলাইন সম্পর্কে জানলেও সহায়তা নিয়েছেন মাত্র ২.৫ শতাংশ। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯৭.৬ শতাংশ কিশোরী ও তরুণী মনে করেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজধানী ঢাকা শহরের প্রতিটি সড়কে নারীদের জন্য সংরক্ষিত বাস বৃদ্ধি করা উচিত এবং ৯৪ শতাংশ মনে করেন, নারীদের সংরক্ষিত সিট সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।