গাজীপুরের কাপাসিয়ার বিভিন্ন প্রত্যন্ত গ্রামে বিশাল বিশাল মাটির চুল্লি বানিয়ে বনের কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরি করছে একটি অসাধু চক্র। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন ধরনের বনজ ও ফলদ গাছ কেটে এসব অবৈধ চুল্লিতে দেদার পোড়ানো হচ্ছে কাঠ এবং তা থেকে তৈরি হচ্ছে কয়লা। এসব চুল্লি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। চরম হুমকিতে পড়ছে জনস্বাস্থ্য, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নানা ফল ও ফসল, কমে যাচ্ছে জমির উর্বরতা। স্থানীয় প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিভিন্ন সময় এদের জরিমানা ও উচ্ছেদ করলেও কিছুদিনের মধ্যেই অন্য এলাকায় গিয়ে তারা আবার একই কাজ শুরু করে। এসব কাজে স্থানীয় প্রভাবশালীরা যুক্ত থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। সরেজমিনে উপজেলার বারিষাব ইউনিয়নের গিয়াসপুর ও নরোত্তমপুর এবং কাপাসিয়া সদর ইউনিয়নের সূর্য নারায়ণপুর এলাকায় দেখা গেছে অবাধে কাঁচা কাঠ পুড়িয়ে কয়লা তৈরির মহাকর্মযজ্ঞ। বারিষাব ইউনিয়নের নরোত্তমপুর গ্রামের প্রত্যন্ত জঙ্গলে জহিরুল ইসলামের প্রায় এক বিঘা জমিতে ৮টি চুল্লি বানিয়ে দিনরাত কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। তার কাছ থেকে মাসিক চুক্তিতে জমি ভাড়া নিয়েছেন শ্রীপুর উপজেলার বরমী এলাকার ব্যবসায়ী আবুল হোসেন ও শফিকুল ইসলাম।
একই ইউনিয়নের গিয়াসপুর ভেড়ারচালা এলাকায় ৭টি চুল্লিতে একইভাবে কাঠ পুড়িয়ে কয়লা বানানো হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, প্রতিদিন শত শত মণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে এই চুল্লিগুলোতে। ধোঁয়ায় নাক-মুখ বন্ধ হয়ে যায়। দিনে যেমন তেমন মধ্যরাতে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে শ^াস নেওয়া যায় না। কালো ধোঁয়ার কারণে এ পর্যন্ত গ্রামের বেশ কয়েকটি গরু মারা গেছে বলে তার দাবি। এসব চুল্লিতে কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাটি, ইট ও কাঠের গুঁড়া দিয়ে তৈরি এসব চুল্লিতে কাঠ সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রেখে আগুন দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় ১০ দিন পোড়ানোর পর চুলা থেকে কয়লা বের করা হয়। প্রতিটি চুল্লিতে প্রতিবার ২০০ থেকে ৩০০ মণ কাঠ পোড়ানো হয়। পরে সেই কয়লা ঠা-া করে বাজারজাত করা হয়।
শ্রীপুর উপজেলার বরমী এলাকার কয়লা ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘এসব কয়লা তৈরির চুলার জন্য কীসের অনুমতি নিতে হয় তা আমার জানা নেই। আমার জানামতে পরিবেশের কোনো ক্ষতিসাধন হচ্ছে না এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিও না। আর আমি স্থানীয়দের এবং প্রশাসন ম্যানেজ করেই ব্যবসা করি।’
আরেক কয়লা ব্যবসায়ী বারিষাব ইউনিয়নের ইউপি সদস্য কামাল হোসেন বলেন, ‘চুল্লিতে কাঠ পোড়ানোর ফলে কোনো ধরনের ক্ষতি হচ্ছে কি না আমার জানা নেই। তবে আমরা সংশ্লিষ্ট সব মহলকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করছি।’ এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খাঁন বলেন, ‘অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব চুল্লির বিরুদ্ধে অচিরেই অভিযান চালানো হবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলা সহকারী পরিচালক মো. মমিন ভূঁইয়া বলেন, ‘এসব অবৈধ কয়লা তৈরির চুল্লি পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। অচিরেই অভিযান চালিয়ে এসব চুল্লি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’