নবায়নযোগ্য শক্তির নতুন আশা মাধ্যাকর্ষণ

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বিশ্ব জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খুঁজছে। নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস হিসেবে আপাতত আছে সূর্য ও বাতাস। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আকাশ দীর্ঘদিন মেঘাচ্ছন্ন থাকে, তাহলে সৌরশক্তি মিলবে কীভাবে? যদি বাতাসে জোর না থাকে, তবে উইন্ড টারবাইন ঘুরবে কীভাবে? আপাতত নবায়নযোগ্য শক্তির দুই মহাশক্তি ধর যদি পর্যাপ্ত শক্তি উৎপাদনে ব্যর্থ হয়, তবে কি বিশ্ব অচল হয়ে যাবে? এমন অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিকল্প এবং নির্ভরযোগ্য শক্তির উৎস হতে পারে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বল। সীমাহীন এই বল রয়েছে পৃথিবীব্যাপী। আর এই মাধ্যাকর্ষণ বলই দেখাচ্ছে আশার আলো।

নিউটনের অকাট্য যুক্তি হলো কোনো বস্তু ওপরে ছুড়লে তা নিচে নেমে আসবেই। এই সহজ সত্যকে কাজে লাগিয়েই তৈরি হতে পারে আগামীর শক্তি। ধরা যাক প্রচুর পরিমাণে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের পর কিছু শক্তি কাজে লাগিয়ে বিপুল ওজনের কোনো বস্তুকে সুনির্দিষ্ট উচ্চতায় নিয়ে রেখে দেওয়া হলো, এরপর সেই বস্তুটিকে নিচের দিকে ছেড়ে দেওয়ার পর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলে নেমে আসার সময় যে শক্তি উৎপন্ন হবে; তাতে চলল জেনারেটর, উৎপন্ন হলো শক্তি।

উদ্বৃত্ত শক্তি কাজে লাগিয়ে এই পদ্ধতিতে বর্তমানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। নিচে থাকা পানিকে ওপরে তুলে প্রয়োজনের সময় তা নিচে প্রবাহিত করে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।এই পদ্ধতি পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য। তবে এ ধরনের শক্তি উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় যেমন বেশি, তেমনি এটা তৈরি করার জন্য যেসব ভৌগোলিক ব্যাপার লাগে, সেসব সব জায়গায় না-ও পাওয়া যেতে পারে।

তবে এই অসাধ্য সাধনেরই চেষ্টা করছে ব্রিটেনের এডিনবার্গভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্র্যাভিট্রিসিটি। গত বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষামূলকভাবে ৪৯ ফুট টাওয়ার থেকে ৫০ টন লোহার সমপরিমাণ ওজন নিচের দিকে ছেড়ে দিয়ে মাধ্যাকর্ষণ বলের মাধ্যমে বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনে সফল হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী জিল ম্যাকফারসন জানান, বেশ ছোট আকারে পরীক্ষা চালিয়ে তারা ২৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হন। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ৭৫০টি বাড়ির জন্য যথেষ্ট। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজে লাগাতে কেবল ওপরের দিকে টাওয়ার নির্মাণ করার বদলে ভূপৃষ্ঠের গভীরেও নজর দিচ্ছে গ্র্যাভিট্রিসিটি। উচ্চতাই যেখানে মূল, সেখানে ভূপৃষ্ঠে চাপ না বাড়িয়ে ইতিমধ্যে পৃথিবীর বুকে থাকা পরিত্যক্ত খনিগুলোকেও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংরক্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

গ্র্যাভিট্রিসিটি ছাড়াও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক এনার্জি ভল্টও একইভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সংরক্ষণ করছে। এ জন্য ২০তলা উঁচু কাঠামো তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যখনই নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদাপূরণ হচ্ছে, তখনই প্রতিষ্ঠানটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্রেন দিয়ে ৩০ টনের দুটি ব্লক টেনে ওপরে তুলে রাখা হচ্ছে। আবার যখন নবায়নযোগ্য শক্তির চাহিদা জোগানের তুলনায় বেড়ে যাচ্ছে, তখনই তুলে রাখা বিপুল ওজনের ব্লক দুটি ছেড়ে দিয়ে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মাধ্যমে হাজারো ঘরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ইতিমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ শুরু করেছে এনার্জি ভল্ট।