পতনের দ্বারে পূর্ব ইউক্রেন

ইউক্রেনে রাশিয়া বিশেষ অভিযান শুরুর পর থেকেই সবচেয়ে আলোচিত ডনবাস অঞ্চল। অভিযান শুরু করার কয়েক বছর আগে থেকেই ডনবাসকে কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উত্তপ্ত ছিল। বিশেষ করে ক্রিমিয়া ইউক্রেনের হাতছাড়া হওয়ার পর ডনবাস অঞ্চলে রুশপন্থি যে বিদ্রোহী অংশ রাতারাতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, তখনই মূলত ডনবাসকে কেন্দ্র করে রুশ প্রেসিডেন্ট  ভøাদিমির পুতিনের দীর্ঘমেয়াদি আকাক্সক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। অভিযানের শুরুর দিকে ইউক্রেনের প্রায় চারপাশ থেকেই রাশিয়ার সেনাবাহিনী হামলা চালালেও দ্বিতীয় ধাপে ডনবাস অঞ্চলকেই টার্গেট করে চলতে থাকে অভিযান। অভিযানের ১০৬তম দিনে এসে ডনবাস এখন অনেকটাই রুশ সেনাদের দখলে। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও শক্তিশালী রুশ ট্যাংক বাহিনী ইউক্রেনীয় প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ ডনবাসের সেভেরোদনেতস্ক অঞ্চলে চলছে লড়াই। ওই শহরের অবস্থা এতটাই খারাপ যে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে পর্যস্ত স্বীকার করতে হয়েছে যে, শহরটি এখন মৃতপ্রায়। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে শহরটির মেয়র ওলেকজান্ডার স্ট্রিউক দেশটির জাতীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আজকের দিন ও রাত আমাদের জন্য অনেক ভয়ের। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী শহরের কিছু অংশ যেখানে মূলত শিল্পকারখানাগুলো রয়েছে, সেখানে অবস্থান করছে। চারপাশেই রুশ সেনারা হামলা চালাচ্ছে।’ শহরটিতে এখন ১০ হাজারের মতো বাসিন্দা আটকা পড়েছেন বলেও জানিয়েছে ওলেকজান্ডার। তিনি যে শিল্পকারখানার কথা বলছেন, সেটি মূলত আজভ কেমিক্যাল প্ল্যান্ট। ওই প্ল্যান্টে আটশ’র বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন রুশ বোমা হামলা থেকে বাঁচতে। ডনবাসের যে অঞ্চলগুলো এখনো ইউক্রেনীয় সেনাদের নিয়ন্ত্রণে আছে, সেখানে ব্যাপক বোমা হামলা চালাচ্ছে রুশ বাহিনী। তবে গত দুই দিন আগে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, সেভেরোদনেতস্কের প্রায় অর্ধেক জায়গা তারা আবার দখল করে নিয়েছে। কিন্তু এক দিনের মাথাতেই তা আবার দখল করে নেয় রুশ বাহিনী।  ইউক্রেনীয় বাহিনী পিছু হটার অন্যতম কারণ হিসেবে গোলাবারুদ সংকটের কথা বলা হচ্ছে।

এদিকে লুহানস্ক অঞ্চলের গভর্নর সের্হি হাইদাই বলেছেন, রাশিয়ার গোলা নিক্ষেপ এবং বিমান হামলা বাড়ানোর পর বিশেষ বাহিনী পিছু হটেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আমাদের বাহিনী এখন আবার শুধুমাত্র শহরের বাইরের অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে লড়াই এখনো চলছে, আমাদের বাহিনী সেভারোদনেতস্ককে রক্ষা করছে। তিনি আরও বলেন, এটা বলা অসম্ভব যে রুশ সেনারা শহরটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। গভর্নর বলেন, প্রায় ১৫ হাজার বেসামরিক লোক সেভারোদোনেতস্ক এবং নিকটবর্তী শহর লিসিচানস্কে রয়েছেন। গত বুধবার রাশিয়া দাবি করেছে যে, ডনবাসে জনশক্তি, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে ইউক্রেন। মার্চের শেষের দিকে যখন রুশ সেনারা রাজধানী কিয়েভের আশপাশ থেকে পিছু হটে, তখন যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু পূর্ব ইউক্রেনের দিকে সরে যায়। ২০১৪-১৫ সালের যুদ্ধের পর থেকেই ডনবাসের বড় অংশ রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছেন যে, রাশিয়ার আগ্রাসনের পরিণতি বিশ্বের জন্য খারাপ হচ্ছে। প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা, শক্তি এবং অর্থের ওপর যুদ্ধের প্রভাব পদ্ধতিগত, গুরুতর এবং দ্রুততর হয়ে উঠছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো আইওয়ালা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো বিরতি ছাড়াই খাদ্য সংকট বছরের পর বছর স্থায়ী হতে পারে।