তোলা হয়নি মামলা, মানা হয়নি শাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের দাবি

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনে অর্থ সরবরাহের অভিযোগে যেসব প্রাক্তন শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিল তা এখনো প্রত্যাহার হয়নি। এসব মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে তাদের। এ ছাড়া বর্তমান শিক্ষার্থীদের ওপর দায়ের করা মামলাও তোলা হয়নি।

রবিবার দৈনিক দেশ রূপান্তরকে এমন তথ্য জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের অন্যতম মুখপাত্র মোহাইমিনুল রাজ।

তিনি বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর সাথে আলোচনায় সুস্পষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল আমাদের সব দাবি মেনে নেয়া হবে। সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা মাথায় রেখে আমরা যে সব দাবি করেছিলাম সেসব বাস্তবায়নের ব্যাপারেও উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া হবে। সর্বোপরি আমাদের মূল দাবি উপাচার্যের অপসারণের বিষয়ে মাননীয় আচার্যকে অবহিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু চার মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত আমাদের বেশিরভাগ দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। উপাচার্য অপসারণের কোনো ইঙ্গিত এখনো দেখা যায়নি। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রত্যাহারের কথা থাকলেও সবগুলো মামলাই এখনো বহাল আছে। বিশেষ করে সাবেক শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেয়ার ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। 

তিনি আরো বলেন, ১৬ জানুয়ারি উপাচার্যের নির্দেশে পুলিশি হামলায় গুরুতর আহত সজল কুন্ডুকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। জাফর ইকবাল স্যারের আশ্বাস এবং শিক্ষামন্ত্রীর নিশ্চয়তার পরও দাবি বাস্তবায়নে এ ধরনের অবহেলা আমাদের প্রচণ্ড হতাশ করেছে। এখনো অধিকাংশ দাবি আদায় না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের অনেকে নিজেদের প্রতারিত মনে করছে।

আন্দোলনের আরেক মুখপাত্র উমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান ছাত্রকল্যাণ ও নির্দেশনা পরিচালক আমেনা পারভীন আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, ১৬ তারিখের ঘটনায় যারা আহত হয়েছিলো তাদের চিকিৎসার পুরো ব্যয়ভার বহন করবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ছাত্র উপদেষ্টা নিজেই এই বিষয়টি তদারকি করবেন বলে জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সরবরাহ করা হয়। কিন্তু পরে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।

আন্দোলনের আরেক মুখপাত্র শাহরিয়ার আবেদিন বলেন, মুহম্মদ জাফর ইকবাল স্যার এবং ইয়াসমিন হক ম্যামের আশ্বাস শিক্ষার্থীদের আশাবাদী করেছিল যে তাদের তৎপরতায় দ্রুতই উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করা হবে। কিন্তু জাফর ইকবাল স্যার ও ইয়াসমিন ম্যামের নিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীদের অনশন ভাঙার প্রায় ৫ মাস হতে চললেও ফরিদ উদ্দিন এখনো স্বপদে বহাল আছেন। এ বিষয়ে অনেকবার জাফর স্যারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রতিবারই তিনি জানিয়েছেন সরকারের ওপর মহল থেকে তাকে বলা হয়েছে সব ব্যাপারেই পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু এতে আমরা খুব একটা আশ্বস্ত হতে পারছি না।

গত ১৩ জানুয়ারি রাত থেকে শুরু প্রভোস্ট বিরোধী আন্দোলনে ১৬ জানুয়ারি পুলিশ লাঠিপেটা, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। এতে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।

তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশনসহ আন্দোলন অব্যাহত রাখে শিক্ষার্থীরা।

ঘোষণা দেন উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার। সাত দিন পর সেই অনশন ভাঙান জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন হক।

এরপর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তখন মামলা প্রত্যাহারসহ অন্যান্য দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। 

পুলিশি হামলায় শরীরে স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সজল কুন্ড।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, গত ১৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনের মদদে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য পুলিশি হামলার শিকার হয়ে আইসিইউতে ছিলাম। আমার শরীরে প্রায় ৮৩টি স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয়। ডান হাতটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আজকে আমাদের সেই আন্দোলনের প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেছে। আমাদের আশ্বাস দেওয়া একটি দাবিও বাস্তবায়ন হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে করা একটা মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে আমাদের সাবেক সিনিয়র যারা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন উনাদের মামলাগুলোও তোলা হয়নি। জামিনে থাকলেও প্রতিনিয়ত তাদের কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দেখভাল করার কথা থাকলেও অপারেশনের পরে আমার পোস্ট ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। ৩৪টা স্প্লিন্টার বিদ্ধ আমার ডান হাতটা আজকে প্রায় অকেজো। বুকে লাগা ২৩টা স্প্লিন্টার এর ২টিই স্প্লিন্টার লাংস এর কাছাকাছি বিদ্ধ হওয়ায় আমার মাঝে মাঝে শ্বাস আটকে যায়, বিষম লাগে, আমি দম নিতে পারি না। দু’পায়ে ৯টার মত স্প্লিন্টার বিদ্ধ থাকায় এবং প্রচণ্ড লাঠির আঘাতের কারণে প্রায় তিন মাস আমাকে ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। আমার করোটিতে আরও দুটি স্প্রিন্টার বিদ্ধ আছে।

‘আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও একটি চাকরির দাবি তোলা হয়েছিল। সেইসময়ে  শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা উঠিয়ে নেয়া হবে এবং আমার বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হবে। আজ ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও কোন দাবির বাস্তবায়ন তো দূরে থাক আমাদের সঙ্গে আর কেউ কোনরকমের যোগাযোগও অব্যাহত রাখেননি। আমরাও সংশ্লিষ্ট কেউ অবধি পৌঁছতে পারছি না।

এই বিষয়গুলো নিয়ে একাধিকবার জাফর স্যারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হলে তিনিও হতাশা ব্যক্ত করেন। স্যারকে জিজ্ঞেস করলে শুধু স্যার একটা কথাই বলেন, আমাকে তো তারা কথা দিয়েছিল এখন কেন এমন করছে বুঝতে পারছি না।’

এ বিষয়ে চেষ্টা করেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কারো মন্তব্য নেয়অ সম্ভব হয়নি। 

শাবিপ্রবির উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সজলের করুণ আকুতি