শাবিপ্রবির উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ সজলের করুণ আকুতি

আপডেট : ১২ জুন ২০২২, ০৩:১৪ পিএম

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সজল কুন্ডকে আইআইসিটি ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের করে দিতে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ভিসিবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের হামলায় মারাত্মক আহত হয়েছিলেন তিনি।

রবিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সজল কুন্ড নিজেই। 

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি দরিদ্র পরিবারের সন্তান, আমার বাবা মারা যাবার পর ২০১৭ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে চা মিষ্টি বিক্রি করে আমি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, পরিবারকে সাপোর্ট করতে থাকি। কাকা মারা যাওয়ার পরে কাকাতো দুই বোন এবং কাকির দায়িত্বও আমার উপর এসে পড়ে। একটু একটু করে অনলাইনে একটি মিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করি।

‘সম্প্রতি আমি জানুয়ারি ২০২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি ক্যাফেটেরিয়ার বরাদ্দ পেয়েছিলাম। ১৫ দিনের মাথায় ১৬ জানুয়ারি আমার গুলি লাগে এবং আমার অসুস্থতা ও ক্যাম্পাসের অচলাবস্থার কারণে ক্যাফেটেরিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

তিনি বলেন, অপারেশনের পর এবং ক্যাম্পাস সচল হলে আমি পুনরায় ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্যাফেটেরিয়া চালু করি। চালু করার পরে আমি লক্ষ্য করি যারা আমার কাজের প্রতি অনেক সন্তুষ্ট ছিলেন হঠাৎ করে তাদের কি যেন হল।

নতুন-নতুন নিয়ম কানুন ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি হতে থাকে। কারণে-অকারণে আমাকে শাসানো হতে থাকে আর বলা হতে থাকে আমি এইখানে থাকতে পারব না। অপারেশন হয়ে আসার পর আমি সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতাম, এই বুঝি কোন একজন স্যার আসবেন আর আমাকে শাসাতে শুরু করবেন।

image

সজল কুন্ড বলেন, আমি ওই সময়টাতে যে কি পরিমাণ মানসিক প্রেশারে থাকতাম সেটা বর্ণনাতীত। রোজার ঈদের সময় সিকিউরিটির বিষয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে ক্যাফেটেরিয়ার চাবি নিয়ে নেয় প্রশাসন।

উল্লেখ্য, প্রশাসন গত ২৮ মার্চ ক্যানটিনের পুরাতন নীতিমালা বাতিল করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করে যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ব্যবসা করার পক্ষে বেশ সাংঘর্ষিক। ঈদের পর চাবি দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন তালবাহানা, নতুন নিয়ম ইত্যাদি দেখানো শুরু করে। এবং এখন প্রশাসন বলছে তারা পুনরায় দরপত্র আহ্বান করবে। অর্থাৎ আমাকে এখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।

সজল কুন্ড আক্ষেপ করে বলেন, আমি মার খেলাম, গুলি খেলাম, মানসিক নির্যাতনের স্বীকার হলাম। আমাকে যথার্থ চিকিৎসা দেওয়া হল না, ক্ষতিপূরণ দেওয়া হল না, একটা চাকরি দেওয়ার কথা ছিল সেটাও দেওয়া হল না। উল্টো আমার জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম, শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই অন্যায়ের বিচার আমি কার কাছে চাইব? 

সজল আরও বলেন, গত ১৬ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে প্রশাসনের মদদে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য পুলিশি হামলার শিকার হয়ে আইসিইউতে ছিলাম। আমার শরীরে প্রায় ৮৩টি স্প্রিন্টার বিদ্ধ হয়। ডান হাতটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আজকে আমাদের সেই আন্দোলনের প্রায় ৫ মাস পেরিয়ে গেছে। আমাদের আশ্বাস দেওয়া একটি দাবিও বাস্তবায়ন হয়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নামে করা একটা মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থীকে আসামি করে মামলা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে আমাদের সাবেক সিনিয়র যারা আমাদের সহযোগিতা করেছিলেন উনাদের মামলাগুলোও তোলা হয়নি। জামিনে থাকলেও প্রতিনিয়ত তাদের কোর্টে হাজিরা দিতে হচ্ছে। হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দেখভাল করার কথা থাকলেও অপারেশনের পরে আমার পোস্ট ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে আর কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। ৩৪টা স্প্লিন্টার বিদ্ধ আমার ডান হাতটা আজকে প্রায় অকেজো। বুকে লাগা ২৩টা স্প্লিন্টার এর ২টিই স্প্লিন্টার লাংস এর কাছাকাছি বিদ্ধ হওয়ায় আমার মাঝে মাঝে শ্বাস আটকে যায়, বিষম লাগে, আমি দম নিতে পারি না। দু’পায়ে ৯টার মত স্প্লিন্টার বিদ্ধ থাকায় এবং প্রচণ্ড লাঠির আঘাতের কারণে প্রায় তিন মাস আমাকে ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয়েছে। আমার করোটিতে আরও দুটি স্প্রিন্টার বিদ্ধ আছে।

‘আমার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আমার জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও একটি চাকরির দাবি তোলা হয়েছিল। সেইসময়ে  শিক্ষামন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে মামলা উঠিয়ে নেয়া হবে এবং আমার বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হবে। আজ ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও কোন দাবির বাস্তবায়ন তো দূরে থাক আমাদের সঙ্গে আর কেউ কোনরকমের যোগাযোগও অব্যাহত রাখেননি। আমরাও সংশ্লিষ্ট কেউ অবধি পৌঁছতে পারছি না।

এই বিষয়গুলো নিয়ে একাধিকবার জাফর স্যারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হলে তিনিও হতাশা ব্যক্ত করেন। স্যারকে জিজ্ঞেস করলে শুধু স্যার একটা কথাই বলেন, আমাকে তো তারা কথা দিয়েছিল এখন কেন এমন করছে বুঝতে পারছি না।’

গত ১৩ জানুয়ারি রাত থেকে শুরু প্রভোস্ট বিরোধী আন্দোলনে ১৬ জানুয়ারি পুলিশ লাঠিপেটা, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে। এতে ৩০ শিক্ষার্থী আহত হন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দেয় কর্তৃপক্ষ।

তবে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আমরণ অনশনসহ আন্দোলন অব্যাহত রাখে শিক্ষার্থীরা।

ঘোষণা দেন উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাওয়ার। সাত দিন পর সেই অনশন ভাঙান জনপ্রিয় লেখক অধ্যাপক জাফর ইকবাল ও তার স্ত্রী ইয়াসমিন হক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত