জনি ডেপ-অ্যাম্বার হার্ড মামলার ভিন্ন পাঠ

সাবেক স্ত্রী হার্ডের বিরুদ্ধে মানহানি মামলায় জিতেছেন ডেপ। বিচার চলাকালে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনতে হয় হার্ডকে। পারিবারিক সহিংসতার মতো গুরুতর বিষয়ে হাসি-ঠাট্টাও হয়। এতে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা। বিষয়টা গণমাধ্যমে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা ঠিক কি না প্রশ্ন তাদের। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া   

ডেপ-হার্ড মামলা

হলিউডের আলোচিত অভিনেতা জনি ডেপ ও তার সাবেক স্ত্রী অভিনেত্রী অ্যাম্বার হার্ডের মানহানি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ডেপের পক্ষে রায় দেয় জুরি। হাই-প্রোফাইল এই মামলা নিয়ে ১১ এপ্রিল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনায় চলে শুধু বিনোদন জগতের মধ্যে নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখা যায়। ডেপ-হার্ডের মামলা নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা যায়। একই সঙ্গে চলে ব্যঙ্গবিদ্রুপও। বিশেষ করে অ্যাম্বার হার্ড ছিলেন হাসি-ঠাট্টার প্রধান লক্ষ্যবস্তু। সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ জনগণকে অভিনেতা ডেপের পক্ষ নিতে দেখা যায় বেশি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটকে হ্যাশট্যাগ টিমজনিডেপ ৭ কোটি ৭০ লাখ বার ভিউ হয়। আদালতে হার্ডের আবেগী সাক্ষ্য দেখে বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যে ইন্সটাগ্রাম ভেসে যায়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, গণমাধ্যমে ডেপ-হার্ডের বিচার যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা উপহাসে পরিণত হতে বাধ্য এবং শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছে; জনি ডেপ তার সাবেক স্ত্রী হার্ডকে নির্যাতন করেছিলেন নাকি নিজেই নির্যাতন বা পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছিলেন, তা গণমাধ্যমে মুখ্য থাকেনি। হার্ডকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেক্সিস্ট মন্তব্যের বন্যা বয়ে যাওয়া বেশ দুঃখজনক।      

১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ও জে সিম্পসনের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার মামলা হলে সেই বিচারকাজ টেলিভিশনে সরাসরি দেখানো হয়। তখন থেকে আমেরিকানরা টিভিতে বাদী-বিবাদীর লড়াই বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখা শুরু করে। আইনের মারপ্যাঁচ খুব কম মানুষই বোঝে। টেলিভিশনে প্রচারিত বিচারকাজ দেখে অনভিজ্ঞ যে কেউই বুঝতে পারবেন, টিভিতে মানুষজন যা দেখছেন এবং সেখান থেকে তারা যে সিদ্ধান্তে আসছেন, কথা বলছেন, তাতে সংবেদনশীলতার অভাব থাকতে পারে, কখনো কখনো সেসব ক্ষতিকরও হতে পারে। সম্প্রতি ডেপ-হার্ডের মামলার ক্ষেত্রে এমনটা দেখা গেছে। হার্ডকে নিয়ে অনেককে অসংবেদনশীল মন্তব্য করতে দেখা গেছে। হার্ড দায়ী নাকি ডেপ দায়ী তার চেয়ে বড় বিষয় পারিবারিক সহিংসতাকে গণমাধ্যম কীভাবে দেখে। পারিবারিক সহিংসতা গুরুতর বিষয়। বিশ্বজুড়ে যত রকমের অপরাধ সংঘটিত হয়, তার মধ্যে এটি অন্যতম। পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত একাট্টা মনে হলেও দেশ ও সমাজভেদে এটি ঘিরে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা রয়েছে।

পারিবারিক সহিংসতা কী

পারিবারিক সহিংসতা বলতে একটা সময়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার শারীরিক সহিংসতাই বোঝাত। সম্প্রতি কয়েক দশক ধরে সব ধরনের শারীরিক, যৌন, অর্থনৈতিক ও মানসিক সহিংসতাকে পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধু স্বামী নয়, পরিবারের যেকোনো সদস্য বা কাছের সঙ্গী এসব সহিংস আচরণ করতে পারেন। পারিবারিক সহিংসতা অনেকভাবে হতে পারে। যেমন ভয় দেখানো, আঘাত করা, চুপিসারে অনুসরণ করা, অবহেলা করা, অর্থনৈতিক বঞ্চনার মধ্যে রাখা ইত্যাদি। প্রযুক্তির ব্যাপক উৎকর্ষের এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কাছের কাউকে ভয়ভীতি দেখানো বা ব্ল্যাকমেইল করাও পারিবারিক সহিংসতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কারও ওপর ক্ষমতা জাহির করতে বা তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশির ভাগ সময় সহিংস হয়ে ওঠে মানুষ। মানসিক চাপ ও অক্ষমতা ঢাকতেও এ ধরনের আচরণ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজবিজ্ঞানী লেনোর ওয়াকার জানান,‘ নির্যাতনের সময় অপরাধী চার ধাপের অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান। প্রথম অনুভূতি হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির সময়, যা তাকে নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেয়। পরের ধাপে নির্যাতনকারী অপরাধবোধে ভোগেন। তৃতীয় ধাপে তিনি নির্যাতিতের প্রতি সদয় হয়ে ওঠেন, এই সময় তার মধ্যে মায়া-মমতার উদ্রেক হয়। শেষ ধাপে নির্যাতিত যখন মনে করেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে ও তিনি আশা দেখতে শুরু করেন, তখন ফের উত্তেজনা দেখা দেয় ও অপরাধী নির্যাতন চালাতে থাকেন। ’   

যেসব অপরাধ কর্মকাণ্ড নিয়ে খুব বেশি মামলা হয় না, তার মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা অন্যতম। এটি শুধু বিশ্বের একটি-দুটি নয়, প্রায় সব দেশের ক্ষেত্রে সত্য। পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারী-পুরুষ মামলা না করায় এ নিয়ে আলোচনাও কম হয়। ২০১১ সালের এক পর্যালোচনা নিবন্ধে বলা হয়, নির্যাতনের শিকার বেশির ভাগ নারী-পুরুষ থানায় যান না। এর কারণ হতে পারে হয় তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন বা মামলা করতে লজ্জাবোধ করেন। নারীর ওপর পুরুষের সহিংস হওয়ার সূত্রপাত বেশির ভাগ সময় নারী ঘটায় বলা হলেও পুরুষ তার ওপর যে নির্যাতন চালায়, তা প্রায়ই ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের অপরাধ-সংক্রান্ত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ৪০ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক নারী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি হওয়ার কারণ তারা তাদের ঘনিষ্ঠ পুরুষ সঙ্গীর নির্যাতনের শিকার। ১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্রাইম ভিকটিমাইজেশন সার্ভেতে বলা হয়, পুরুষদের চেয়ে নারীরা পাঁচ গুণ বেশি পারিবারিক সহিংসতার শিকার।

ঝুঁকিতে বেশি যারা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচওর মতে, অনেকে মনে করেন, মৌখিক বা শারীরিকভাবে কাউকে নির্যাতন করা জায়েজ। এই মনস্তত্ত্বের কারণে তারা সহিংস আচরণ করার এক ধরনের বৈধতা পেয়ে যান। এ ছাড়া দারিদ্র্যতা, মানসিক সমস্যা ও নির্যাতনকারীর ওপর নির্ভরশীলতাও পারিবারিক সহিংসতার অন্যতম কারণ। নির্যাতনকারী পুরুষ মনে করেন, ভিকটিমের নির্যাতন প্রাপ্য। সামাজিক শিক্ষা তত্ত্বে বলা হয়, যারা ছোটবেলায় নির্যাতন দেখে বড় হয় বা এর শিকার হয়, তারাই সাধারণত বড় হয়ে অন্যের ওপর নির্যাতন চালায়। উন্নয়নশীল দেশে পরিবারের অভ্যন্তরে পারিবারিক সহিংসতার হার সবচেয়ে বেশি। এর জন্য প্রধানত অর্থনৈতিক অবস্থাকে দায়ী করা হয়। আর্থিক অনিশ্চয়তা পুরুষদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে আর নারীরা যেহেতু আর্থিকভাবে দুর্বল তাই তারা নিপীড়নমূলক সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে না।

পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন দেশে দেশে এক নয়। উন্নত দেশে এটি অপরাধযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। উন্নয়নশীল কটি দেশে অবশ্য ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কথা বলা যায়। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত না শরীরে দাগ পড়ছে ততক্ষণ পর্যন্ত একজন আমিরাতি পুরুষ তার স্ত্রী ও সন্তানদের শারীরিকভাবে শৃঙ্খলা শেখানোর অধিকার রাখেন। তা ছাড়া উন্নয়নশীল অনেক দেশ আছে যারা পারিবারিক সহিংসতাকে সাদরে বরণ করে নিয়েছে। এর বড় কারণ দুর্বলের মানসিক কাঠামো। দুর্বল ব্যক্তি যদি মনে করে, তার ওপর নির্যাতন ঠিক আছে, তাহলে তা নির্যাতনকারীকে নির্যাতনে আরও উৎসাহ জোগায়। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের জরিপ বলছে, বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রীর ওপর স্বামীর নির্যাতন জায়েজ, এমনটা ভাবা আফগান নারীর হার ৯০ শতাংশ। এই নারীদের বয়স ১৫-৪৯ বছরের মধ্যে। একই মানসিকতা ধারণ করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির ৮৭ শতাংশ আর মধ্য আফ্রিকার দেশ সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের ৮০ শতাংশ নারী। ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন ইন ফ্যামিলিজ অ্যান্ড রিলেশনশিপস বইয়ে বলা হয়, ‘কিছু পরিস্থিতিতে স্ত্রী পেটানো জায়েজ মনে করে বিভিন্ন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। স্ত্রী সত্যি সত্যি পরকীয়া করছে বা করে থাকতে পারে এই সন্দেহে ওইসব দেশে স্ত্রী পেটানোকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এ ছাড়া স্বামীর প্রতি আনুগত্যের ঘাটতি দেখা দিলেও নির্যাতন করা সেখানে সর্বজনগৃহীত। পারিবারিক সহিংসতার ক্ষেত্রে ভিকটিম ব্লেমিং উন্নয়নশীল দেশে এমনকি শিল্পোন্নত দেশেও দেখা যায়। ২০১০ সালের এক জরিপে বলা হয়, নারীর উসকানিমূলক আচরণই তাদের ওপর সহিংসতার প্রধান কারণ বলে মনে করেন ৫২ শতাংশ উত্তরদাতা।

গণমাধ্যমের ভূমিকা

মানব প্রজননবিষয়ক সাময়িকী রি-প্রোডাক্টিভ হেলথের এক গবেষণায় বলা হয়, নারী-পুরুষের বিদ্যমান বৈষম্য, নারীবাদের গতানুগতিক ভূমিকা ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর পক্ষে কথা বলে আসছে গণমাধ্যম। এই মাধ্যমে পুরুষের কাছে নারীর অধীনতার জয়গান গাওয়া হয়। কখনো কখনো তাদের নারীর প্রতি সহিংসতার ন্যায্যতা দিতেও দেখা যায়। গণমাধ্যমের এ ধরনের অবস্থান সব বয়সীর বিশেষ করে তরুণদের ব্যাপক প্রভাবিত করে। তথাকথিত রোমান্টিক সম্পর্ককে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে মহান করে দেখাতে তৎপর দেখা যায় গণমাধ্যমকে। এর মধ্য দিয়ে ভালোবাসার তথাকথিত এক আদর্শ রূপ তরুণদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়। এই রোমান্টিক সম্পর্ক যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসমতার ভিত্তিতে নির্মিত, তা বেশির ভাগ সময় তাদের চোখে পড়ে না। পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে গণমাধ্যমের অবস্থান বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১১ সালে আমেরিকান টিভি সিরিজ ফ্যামিলি গাইয়ের এক পর্বে নিপীড়নমূলক এক সম্পর্ককে সমর্থন করতে দেখা যায়। কাসৌটি জিন্দেগি কে নামের ভারতীয় এক সোপ অপেরায় এক নারীকে তার স্বামী চড় দিলে সেই নারী পরিবারের বাকি সদস্যদের তার স্বার্থে চুপ থাকতে বলেন। 

আয়ারল্যান্ডের মেনুথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যানি ও’ব্রায়েনের মতে, পারিবারিক সহিংসতার শিকার নারীদের মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা দেখে মনে হয় তাদের ওপর পরিবারের সদস্যদের নির্যাতনে কোনো সমস্যা নেই। নির্যাতন করতে নারীই সব সময় পুরুষকে প্ররোচিত করে, নির্যাতনকারী কখনো কোনো ধরনের শাস্তি পায় না কারণ নির্যাতন করা আসলে তার স্বভাবে নেই নারীই তাকে উসকানি দেওয়ার কারণে এ কাজ করতে সে বাধ্য হয়েছে এই-ই হয় সংবাদমাধ্যমের মূল বক্তব্য। নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা সাধারণভাবে একপাক্ষিকভাবে হাজির করা হয় আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। ব্যক্তি নারীর অবস্থান সেখানে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়।   

অবশ্য পারিবারিক সহিংসতাকে গণমাধ্যম যথাযথভাবে উপস্থাপনে ব্যর্থ হলেও এটির ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় দিকও ফেলে দেওয়া যায় না। শান্তি ও নিরাপত্তার অর্থনৈতিক দিক নিয়ে কাজ করা সাময়িকী ইকোনমিকস অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির মতে, সমাজের প্রচলিত মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে গণমাধ্যম। উদাহরণ হিসেবে ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর কথা বলা যায়। ওই রাজ্য নিয়ে এক গবেষণায় বলা হয়, কেবল টেলিভিশন আসার পর সেখানকার সমাজে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। কেবল টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠানে ‘শহুরে আচরণ’ দেখে নারীদের মধ্যে পারিবারিক সহিংসতা মেনে নেওয়ার হার ১৬ শতাংশ কমে যায়। একই সঙ্গে পুত্রসন্তানের বিষয়েও তাদের পক্ষপাতিত্ব ৮.৮ শতাংশ নেমে যায়।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল তারকা ও জে সিম্পসনের বিরুদ্ধে করা ব্যাপক আলোচিত পারিবারিক সহিংসতা মামলার বিচার টেলিভিশনে প্রচারিত হওয়ার পর দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন জাতীয় পারিবারিক সহিংসতা হেল্পলাইনের অনুমোদন দেন। অবশ্য সিম্পসনের মামলা চলাকালে পত্রপত্রিকায় পারিবারিক সহিংসতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদন ও কলামের সংখ্যা বাড়লেও মামলা শেষে সেসব কমতে শুরু করে। মিডিয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সেসব ঘটনার ক্ষেত্রে, যেগুলো আদালত পর্যন্ত যেতে পারে না। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গায়ক ক্রিস ব্রাউন তার বান্ধবী রিহান্নার মুখে ঘুষি মারেন। এ নিয়ে কোনো মামলা বা বিচার না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে তুলোধুনো করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে কারও বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ উঠলে অনলাইনে তীব্র সমালোচনা হয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিতে এই মাধ্যমে বেশি সময় লাগে না। 

২০১৫ সালের এক ঘটনাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রে ব্রক টার্নার নামে ২০ বছর বয়সী এক সাঁতারুর বিরুদ্ধে অজ্ঞান এক নারীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে মামলা হলে একপর্যায়ে আদালত টার্নারকে মাত্র ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়া কোম্পানি বাজফিড ভিকটিমের বক্তব্য প্রকাশ করলে তা নিয়ে যে পরিমাণে আলোচনা হয়, তার রেশ ওই সাঁতারুর ছয় মাসের কারাবাসের অনেক সময় পর পর্যন্ত থেকে যায়। যৌন নিপীড়নের শিকার ওই ভিকটিমের বক্তব্য নিয়ে করা প্রতিবেদন বাজফিডের ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদন, যা শেয়ার করে অনেক মানুষ।   

হলিউডের প্রতিভাবান অভিনেতা জনি ডেপ ও তার সাবেক স্ত্রী অভিনেত্রী অ্যাম্বার হার্ড পরস্পরের বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করেন। সপ্তাহখানেক আগে আদালতের রায়ে আইনি জয় হয় ডেপের। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে এক কলাম লেখেন অ্যাম্বার হার্ড। সেখানে তিনি ডেপের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ তোলেন। এ নিয়ে সাবেক স্ত্রীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন ডেপ। তার বক্তব্য, হার্ডের ওই কলাম তার অভিনয় জীবনকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত করে। পরে হার্ডও সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করেন। আদালত থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই মামলা টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে অসংখ্য মানুষ। সমাজে প্রচলিত কাঠামো অনুযায়ী অনেকে শুরু থেকে হার্ডের ওপর চড়াও ছিল। আদালতের রায় তার বিরুদ্ধে গেলেও ছয় সপ্তাহ ধরে বিচার চলাকালে তাকে যে নিষ্ঠুর ও তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য শুনতে হয়েছে, এসব তার প্রাপ্য ছিল না। বিচার চলাকালে জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডকে ঘিরে সাধারণ মানুষের উৎসাহ ছিল তুঙ্গে। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ডেপের প্রতি জুরিকে বেশি সহানুভূতিশীল হতে দেখা গেছে। সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের সাক্ষ্য যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই জনমতের বড় অংশই হার্ডের বিপক্ষে যায়। জনি ডেপ ও অ্যাম্বার হার্ডের মামলা থেকে গণমাধ্যমের অনেক কিছু শেখার রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন বা মন্তব্য করার সময় মানুষের বিবেচনা যেন আইনের ওপর ভিত্তি করে হয়। আদালতের রায় ঘোষণার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিকটিম (নারী বা পুরুষ যেই হন না কেন) বা নির্যাতনকারীকে হেয় করলে কোনো পক্ষেরই জয় হয় না।