‘এসএমএস যুগের আগে’ নামের একটি উপন্যাস খানিকটা আনস্মার্ট স্বামীর মুখে বারবার ‘তালাক’ শব্দটি শুনে শহুরে ব্যাকগ্রাউন্ডের স্ত্রী ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং চিৎকার করে ধমকের স্বরে স্বামীকে বলেন, তালাক শুনতে কি বিচ্ছিরি লাগে, ডিভোর্স বলতে পারো না? সেই থেকে আমিও কষ্টার্জিত স্মার্টনেস ধরে রাখার জন্য তালাক শব্দটা মুখে এসে গেলেও থুক্কু বলে ডিভোর্স ডিভোর্স বলতে থাকি।
উপন্যাসটির স্বামী-স্ত্রী দুজনই দুজনের কাছ থেকে মুক্তি চান, তালাকে দুজনেরই সম্মতি রয়েছে, কিন্তু বিভিন্ন অনিবার্য কারণে তাদের আকাক্সক্ষার মুক্তির দিনটি এসেও ফিরে যায়, পিছিয়ে যায় তালাক। স্ত্রী ভাবেন স্বামী কেবল অজুহাত খুঁজছে কেমন করে ডিভোর্সটা পিছিয়ে দেওয়া যায়। স্বামীও তাই ভাবেন শ্বশুরের মৃত্যু ও শ্যালিকার বিয়ের কারণে তালাকটা পিছিয়ে গেছে, নিশ্চয়ই তার স্ত্রী তালাক পেছানোর ধান্দায় আছেন। আরও কোনো অজুহাত খুঁজছেন। কাহিনীটা এখানে শেষ হলেই ভালো হতো, কিন্তু দেখা গেল ঝগড়া-ফ্যাসাদের মধ্যেও, এমনকি সোশ্যাল ডিস্টেন্স বজায় রাখার সরকারি হুকুমের পরও দুজন এতটাই কাছাকাছি এসে যান যে স্ত্রী সন্তানসম্ভবা হয়ে পড়েন। ফলে দুজনের সম্মতিতেই তালাক কিংবা ডিভোর্সটা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। পরস্পরের প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে যারা স্বামী কিংবা স্ত্রী কিংবা উভয়ই কেবল তালাকের সিদ্ধান্তই নেননি দু-একবার তালাক তালাক ডিভোর্স ডিভোর্স উচ্চারণ করে ফেলেছেন কিন্তু ব্যাপারটা এখনই ঘটাতে চাচ্ছেন না তাদের হাতে সরকার একটি আকর্ষণীয় অজুহাত তুলে দিয়েছে। এবারের এই
তৃতীয় হাতটি (ডান হাত, বাম হাত এবং অজুহাত) অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠ এবং যুক্তিগ্রাহ্য। পাছে তালাক শব্দটি স্মার্টনেস হরণ করে নেয় সেজন্য বাজেট-পরবর্তী বিশ্লেষণের জন্য ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের আশ্রয় নিয়েছি। আমি যা পাঠ করেছি তার সারাংশ মোটামুটি এ রকম :
সরকার ডিভোর্স ব্যয়বহুল করে তুলেছে অর্থাৎ এ সরকার এবারের বাজেটে ডিভোর্সবান্ধব চরিত্রটি রক্ষা করতে পারেনি। প্রস্তাবিত বাজেটে ডিভোর্সের জন্য নির্ধারিত স্ট্যাম্পের মূল্য ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫২৫ বা ৫৫০ টাকা নয় একেবারে ২০০০ টাকা করেছে। নট এ স্মল স্টেপ বাট এ জায়ান্ট লিপ ফর ম্যানকাইন্ড। ডিভোর্স-প্রত্যাশী মানুষ এমনিতেই বিপন্নদশায় থাকেন। বিপন্ন মানুষকে ৫০০ টাকার টিকিট ২০০০ টাকা কিনতে হলে একে খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কি বলা যায়। আর এই ঘা-টা যতটা না পুরুষের ওপর তার দ্বিগুণসংখ্যক নারীর ওপর পড়তে যাচ্ছে। ২০২০ সালের হিসাবে ঢাকা শহরের আনুষ্ঠানিক ডিভোর্স-প্রার্থীর ৮৪৮১ জন নারী আর ৪,০৩২ জন পুরুষ অর্থাৎ অর্ধেকেরও কম। টিকিটের দামের চার গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব এটাও ইঙ্গিত করে, এ বাজেট ডিভোর্স-আকাক্সক্ষী-নারীবান্ধবও নয়।
এই লেখাটি ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে কটু-কাটব্য কিংবা গুণকীর্তনের জন্য রচিত হয়নি। যারা তালাক কিংবা ডিভোর্স চেয়েছেন এবং লজ্জাজনিত কারণে সে সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে পারছেন না তাদের জন্য একটি শক্তিশালী অজুহাত যে এই বাজেটে সৃষ্টি হয়েছে তারা অনুগ্রহ করে এটি কাজে লাগাতে পারেন এবং বলতে পারেন তালাকের টিকিটের দামই দুই হাজার টাকা, তো ডিভোর্সের গুল্লি মারি। পাঁচশ টাকা হলে না হয় একটা কথা ছিল।
অজুহাতটি দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই আমার এই বাজেট আলোচনা। তালাক যে কাক্সিক্ষত নয়, এ তো সবারই জানা। তবুও তালাক হয়। তালাক আনস্মার্ট মনে হলে ডিভোর্স হয়। এর মূল কারণ একটিই, আর বাকি সব শাখা-প্রশাখা।
মূল কারণটি হচ্ছে বিয়ে। বিয়ে করেননি কিন্তু ডিভোর্স করেছেন কিংবা ডিভোর্সড হয়েছেন এমন নজির অন্তত কাগজ-কলমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিয়ে না তালাক কোনটি আগে?
তালাক গবেষকরা বলেন, যেকোনো বাংলা অভিধানে তালাক এসেছে বিয়ের আগে পাতা উল্টে এখনই চেক করতে পারেন। আবার ম্যারেজ না ডিভোর্স কোনটা আগে? ডিভোর্স গবেষকরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবেন যেকোনো ইংলিশ ডিকশনারিতে ডিভোর্স আগে এসেছে, ম্যারেজ অনেক পরে। কাজেই ডিভোর্সের গুরুত্ব পাওয়ারই কথা। এ বাজেট বিয়েবান্ধব। সে কারণে হাজার টাকার কাবিনে সাড়ে বারো টাকার যে রেজিস্ট্রেশন ফি তা অক্ষুণ্ন রয়েছে, অব্যাহত রয়েছে।
দেশ রূপান্তর বাজেট ঘেঁটে দাম কম ও বাড়ার যে সম্ভাবনাময় চিত্রটি তুলে ধরেছে তা একেবারেই ব্যক্তিপর্যায়ে আমাকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তারও একটি ছবি উপস্থাপন করার তাগিদ অনুভব করছি।
মুড়ি ও চিনির দাম কমবে : মুড়ি খাওয়া এর মধ্যেই বাড়িয়ে দিয়েছি। মধুমেহ রোগগ্রস্ত না হলেও স্বাস্থ্যসচেতন লোকদের দেখাদেখি চিনি বর্জন করতে শুরু করেছি। গোখাদ্যের দাম কমলেও বার্ধক্যে পৌঁছে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব হয়ে উঠবে না।
গমের আটার দাম কমবে : দুবেলা আটার রুটিই খাচ্ছি, ভাত বর্জন করে দুপুরেও রুটির বন্দোবস্ত করার কথা ভাবছি।
রেস্তোরাঁয় খাবারের ওপর ভ্যাট কমবে, সুতরাং দাম কমবে। ছয় মাস নয় মাসে আমার রেস্তোরাঁয় খাওয়া হয় খরচ কমলেই আর কত কমবে। পাওয়ার টিলার, ব্রেইল, হুইলচেয়ার, রড, পোলট্রি ও গোখাদ্য, টাওয়েল, কাঠের বাড়ি, পলিথিন ব্যাগ, স্বর্ণ এবং উড়োজাহাজের দাম কমবে আপাতত এসবের কোনোটাই আমার কেনার প্রয়োজন নেই, বোয়িং হোক কি এয়ারবাস, উড়োজাহাজ তো নয়ই।
কাজুবাদাম সুস্বাদু হলেও এবং দাম কমলেও বিনা পয়সায় পেলেই খাব, গাঁটের পয়সায় কিনি দেশি বাদাম, দাম কমা আরও দুটি দ্রব্য মোবাইল ফোনের ব্যাটারি ও কানে শোনার যন্ত্রের ব্যাটারির দাম কমাটাকে স্বাগত জানাই গণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক ভাষণ শুনে আমি তফাৎ করতে পারি না, একই রকম মনে হয়। সস্তা দামের ব্যাটারিসহ কানে শোনার যন্ত্র কিনে দেখি আমার শ্রবণক্ষমতার কোনো হেরফের হয় কি না।
এবার দাম বাড়া পণ্য ও সেবাসামগ্রী ফ্রিজ (আশা করছি পুরনো ফ্রিজটি আরও এক বছর বেঁচে থাকবে, কাজেই কিনব না), রেলের টিকিট (শীতাতপনিয়ন্ত্রিত/তাপানুকূল/প্রথম শ্রেণিতে সফর করব না, ২০০৯ সালের পর রেলে চড়িনি, আশা করছি এ বছরটা বিনা সফরে কাটিয়ে দিতে পারব), মোবাইল সেট (হাতের সেটটি যতœ করে রাখব), বিড়ি-সিগারেট (আমি যেহেতু ধূমপায়ী নই, দাম আরও বাড়লেও আমার সমস্যা নেই), গাড়ি (কেনা সম্ভব নয়), কভিড সামগ্রী (স্যানিটাইজার আর মাস্ক ছাড়া কিছু কিনিনি, প্রবল চাপের মধ্যেও অক্সিমিটার কেনা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছি; আশা করব কভিড দয়া করে বিদায় নেবেন), জিআই ফিটিংস (কিনব না), পনির (পছন্দ করি তবে লোভ সংবরণ করব), কফি (উপায় নেই কিনতেই হবে), তার (আশা করি দরকার হবে না), ফোর স্ট্রোক মোটরসাইকেল, বিদেশি ইলেকট্রিক মোটর, বিদেশি গ্যাস লাইটার, বিদেশি সোলার প্যানেল, কংক্রিট রেডি মিক্স, বিদেশি প্রিন্টিং, কালি, বিদেশি কম্পিউটার ও প্রিন্টার কিনব না। তবে টোনার কার্টিজ কিনতে হবে। ল্যাপটপ (পুরনোটা মেরামত করাব), বিদেশি পাখি, প্রিন্টিং প্লেট, অপটিক্যাল ফাইবার কেবল লিফট এসবের কিছুই কিনব না। বিদেশি দ্রব্য যতটা সম্ভব রাগ-বিরাগের বশবর্তী না হেেয় বর্জন করব।
একটি পাদটীকা সংযুক্ত করতেই হয়। তালাক কিংবা ডিভোর্সের স্ট্যাম্পের দাম চার গুণ বৃদ্ধি করাতে (৫০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা) ওপথে না যাওয়ার একটি মোক্ষম অজুহাত তো পেয়ে গেলাম। সরকারকে দুটো কড়া গাল দিয়ে বললাম এত দিন ধরে তালাকের অপেক্ষায় বসেছিলাম। স্ট্যাম্পের দাম আকাশে তুলে দিয়ে দিল তো তালাকের বারোটা বাজিয়ে। এসএমএস যুগের আগেকার সেই ক্ষুব্ধ স্ত্রী বলে উঠল, কতদিন বলেছি ওটা তালাক নয় ডিভোর্স।
তালাক কথাটা কি বিচ্ছিরি যে শোনায়, অথচ ডিভোর্স কত স্মার্ট কদিন আগেই না বিল গেটস আর মেলিন্দার ডিভোর্স হয়ে গেল। ভাগ্যিস বাজেট ঘোষণার আগে হয়েছে! তাতে কী? দেড় হাজার টাকা বেঁচে গেছে।