দেশে করোনা সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্র্যন্ত প্রায় তিন মাস সংক্রমণ নিম্নমুখী ছিল। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী রূপ নিয়েছে। গত এক সপ্তাহে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
গত ফেব্রুয়ারিতেও সংক্রমণ উদ্বেগজনক ছিল। সে মাসে দৈনিক সর্বনিম্ন রোগী ছিল ৭৫৯ জন ও সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৩৫৪ জন। মার্চে সর্বোচ্চ রোগী ছিল ৭৯৯ জন, ১ মার্চ। সে মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত দৈনিক রোগী একশর ওপরেই ছিল। পরে ২৬ মার্চ থেকে কমতে থাকে এবং দুই অঙ্কের ঘরে নেমে আসে। এরপর এ মাসের ১১ তারিখ পর্যন্ত দৈনিক রোগীর সংখ্যা দুই অঙ্কের ঘরেই ছিল। কিন্তু গত তিন দিন ধরে সেই সংখ্যা আবারও একশর ঘরে উঠে গেছে।
একইভাবে গত আড়াই মাসেরও বেশি সময় ধরে সংক্রমণ হার ১ শতাংশের নিচে ছিল। কিন্তু গত আট দিন ধরে এই হার আবারও ১ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে। সর্বশেষ গত ৬ জুন সংক্রমণ হার ছিল শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ। এর পরদিন থেকেই হার ১ শতাংশের ওপরে উঠে যায় ও গতকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। এমনকি গত আট দিনের মধ্যে ১২ জুন সংক্রমণ হার ছিল ২ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ ও গতকাল সে হার আরও বেড়ে ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ হয়। এমন পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক বলছেন দেশের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে করোনা সংক্রমণের চতুর্থ ঢেউ শুরু হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি না মানলে আবারও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গত কয়েক দিন ধরেই সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে সতর্ক করে আসছেন। গতকাল মঙ্গলবারও রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) অডিটরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দেশে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। গত এক মাস সংক্রমণের হার শূন্য দশমিক ছয় শতাংশ ছিল, এখন সেটা দুই শতাংশের ওপরে উঠেছে। প্রতিদিন যেখানে ৩০-৩৫ জন করোনা সংক্রমিত হতো, সেখানে এখন ১০০-এর ওপরে উঠেছে। করোনা পরীক্ষা আরও বেশি করলে, হয়তো আরও বেশি শনাক্ত হবে। দেশে বর্তমানে করোনায় মৃত্যু নেই, তবে সংক্রমণ বেড়ে গেলে মৃত্যুও বেড়ে যাবে।
এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সবাইকে করোনা টিকার বুস্টার ডোজ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমি সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজকর্ম করতে বলব, সামাজিক দূরত্ব যতটা মানা যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। এমনকি যারা বুস্টার গ্রহণ করেনি, তারা যেন টিকা গ্রহণ করেন আমরা সেই আশা করি। বুস্টার ডোজ গ্রহণ করলে সবাই সুরক্ষিত এবং ভালো থাকবেন।
এ ব্যাপারে করোনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত সরকারের জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন ঢেউয়ের মধ্যে পড়েছে দেশ। গত বছরের মার্চে করোনা বেড়েছিল। এবার জুনে বাড়ল। গত বছরের চেয়ে এবার একটু দেরিতে এসেছে। কারণ অনেককে টিকা দেওয়া হয়েছে। আমাদের মাস্ক পরতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।
একইভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, দেশের মধ্যে চলাচল, পর্র্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ, ইনডোরের অনুষ্ঠানএসব জায়গায় যদি স্বাস্থ্যবিধি না মানি, তাহলে যেকোনো সময় করোনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এক সপ্তাহে বেড়েছে তিন গুণ : গত দুই সপ্তাহের করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে (১-৭ জুন) রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৪৭ জন। দৈনিক গড় রোগী ছিল ৩৫ জন। এ সময় দৈনিক গড় শনাক্ত হার ছিল শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। কিন্তু গত সপ্তাহে তা তিন গুণ বেড়ে যায়। এ সময় (৮-১৪ জুন) শনাক্ত হয়েছে ৬৫১ জন ও দৈনিক গড় রোগী ছিল ৯৩ জন। এ সময় দৈনিক গড় শনাক্ত হার ছিল ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনার সাপ্তাহিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, গত সপ্তাহে (৬-১২ জুন) দেশে করোনা রোগী বেড়েছে আগের সপ্তাহের (৩০ মে-৫ জুন) তুলনায় ১১৮ শতাংশ। গত সপ্তাহে রোগী ছিল ৪৫৮ জন ও তার আগের সপ্তাহে রোগী ছিল ২১০ জন।
আবার শনাক্ত হার তিন শতাংশের ঘরে : গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা অনুপাতে করোনা শনাক্তের হার ছিল ৩ দশমিক শূন্য ৫৬ শতাংশ। আগের দিন এ হার ছিল ১ দশমিক শূন্য ৯১ শতাংশ। সে হিসেবে ১০১ দিন বা তিন মাসের বেশি সময় পর সংক্রমণ হার আবার ৩ শতাংশের ওপরে উঠল। এর আগে সর্বশেষ তিন শতাংশের ওপরে শনাক্ত হার ছিল ৪ মার্চ, তিন দশমিক ২০ শতাংশ।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে টানা তৃতীয় দিনের মতো দৈনিক শনাক্ত ১০০-এর বেশি হয়েছে। এ সময় ১৬২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় শনাক্ত হয়েছে ১৫৩ জন। এ সময় করোনায় কারও মৃত্যু হয়নি। আগের দিন ১২৮ জন শনাক্ত হয়েছিল। তার আগের দিন শনাক্ত হয়েছিল ১০৯ জন। গত ২৫ মার্চের পর ওই দিনই প্রথম ১০০-এর বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছিল।
সংক্রমণের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৫ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে ২৯ হাজার ১৩১ জনের।
এখনো টিকা নেয়নি ৪% মানুষ : ডা এ এস এম আলমগীর বলেন, করোনা দ্বিগুণ বেড়েছে। কারণ করোনা তো যায়নি। এখনো অনেকেই করোনা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরীক্ষা করাচ্ছে না। পরীক্ষার সংখ্যা দৈনিক সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজারে নেমে এসেছে। রোগতত্ত্বের হিসাবে, একজন শনাক্ত হলে পাঁচজন শনাক্তের বাইরে আছে। অথচ এতগুলো লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, এখনো দেশের ২-৪ শতাংশ টিকা নেয়নি। তারা এখনো টিকা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছে। প্রথম ডোজ নেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজ বাকি রয়ে গেছে, এমন জনসংখ্যাও অনেক। সুতরাং যারা এখনো টিকা নেননি তাদের টিকা নিতে হবে। এতে করোনা যদি বাড়েও তা হলেও এক ধরনের রক্ষা পাওয়া যাবে।
স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই : ডা. এ এস এম আলমগীর বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে মানুষ প্রচুর ঘুরে বেড়াচ্ছে এখন। সেখানে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই। সবাই মনে করে, টিকা নিলেই হয়ে গেল। ব্যাপারটা এরকম না। টিকা নিলেও স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এ ছাড়া দেশের ভেতর এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যে চলাফেরা হচ্ছে, সেখানেও কেউ মাস্ক পরে না। হোটেল, কমিউনিটি সেন্টারসহ প্রচুর ইনডোর অনুষ্ঠান হচ্ছে। ইনডোরে মাস্ক না পরলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি। ভাইরাসেরও পরিবর্তন হচ্ছে। সবকিছু মিলে বাড়ছে।
তবে করোনা বেড়েছে এবং মানুষ যে উদ্বিগ্ন, সেটা বোঝা যাচ্ছেজানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, আগে পরীক্ষার জন্য যে পরিমাণ নমুনা পেতাম, সেটা তুলনামূলকভাবে বাড়ছে। যারা এতদিন পরীক্ষা করেনি, তারা এখন পরীক্ষা করতে আগ্রহী হচ্ছেন। আগামী এক সপ্তাহ পরিবর্তন দেখলে বোঝা যাাবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনার এই বৃদ্ধি অবশ্যই শঙ্কার। কারণ আমরা মহামারীর মধ্যেই আছি। ২০২০ সালে সারা পৃথিবীতে ২০০-৩০০ রোগী হতো। ১০০ লোক মারা গেছে। আমরা ভয় পেয়েছি। এখন দিনে ১৫শ লোক মারা যাচ্ছে, তবুও লোকজন বলে যে মৃত্যুর সংখ্যা কমে এসেছে, মৃত্যু নেই বললেই চলে। মহামারী তো মহাবিক্রমে চলে। প্রতিদিন যদি তিন লাখ লোক শনাক্ত হয়, তা হলে ১ জন শনাক্ত হলে ৫ জন শনাক্তের বাইরে থাকে, সে হিসেবে ১৫ লাখ আক্রান্ত আছে। এক-দেড় কোটি মানুষ চিকিৎসাধীন আছে। এত লোকের শরীরে যখন ভাইরাসটা ট্রান্সমিশন হয়, তাহলে যেকোনো সময় ভাইরাসটার বড় কোনো পরিবর্তন হতে পারে। সেটা আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তাই আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। মাস্ক পরতে হবে, হাত ধুতে হবে। এই দুটির কোনো বিকল্প নেই।
মাস্ক পরলে মাঙ্কিপক্স থেকেও বাঁচা যায় : অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনার জন্য মাস্ক পরলে মাঙ্কিপক্স থেকেও রক্ষা পাওয়া যায়। মাঙ্কিপক্সের জীবাণু নাক দিয়ে ঢোকে। মাঙ্কিপক্স থেকে বাঁচার জন্য হাতের কোথাও যদি আঁচড় লাগে, ওটা ঢেকে রাখতে হবে। কারণ মাঙ্কিপক্সের জীবাণু স্কিন দিয়ে ঢোকে না, কিন্তু স্কিনে যদি কোনো ডাস্ট বা ধুলোবালি থাকে, তার মাধ্যমে ঢুকে যায়।