যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠাতারা একসময় বন্দুকের মালিকানার বৈধতা দিলেও তারা হয়তো কখনো ভাবেননি, এটা একদিন নিরীহ মানুষের দিকে তাক করা হবে। ডেমোক্র্যাটরা বারবার কঠোর অস্ত্র আইনের দাবি জানালেও তা গুরুত্ব দিচ্ছে না রিপাবলিকানরা। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
বন্দুক সহিংসতা
যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি একের পর এক বন্দুক সহিংসতা স্তব্ধ করে দিয়েছে পুরো দেশের মানুষকে। খোদ প্রেসিডেন্টের গলায় অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। গত মাসের ১৪ তারিখে নিউ ইয়র্কে সুপারমার্কেটে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী এক কিশোরের গুলিতে প্রাণ হারায় ১০ জন, যাদের বেশির ভাগই ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ভয়াবহ ওই বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই ২৪ মে টেক্সাসের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালান সালভাদোর রামোস নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণ। এতে নিহত হন ওই বিদ্যালয়ের ১৯ শিক্ষার্থীসহ দুই শিক্ষক। বিদ্যালয়টিতে হামলার আগে রামোস বাড়িতে তার দাদির কপালে গুলি করে মারাত্মক জখম করে। ওই ঘটনার দুদিন পর ২৬ মে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে দুই বছরের ছেলের গুলিতে বাবার মৃত্যু হয়। এরপর চলতি মাসের ১ তারিখে ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যে এক হাসপাতালে বন্দুকধারীর গুলিতে চারজন নিহত হন। পরের দিন ২ জুন আইওয়া অঙ্গরাজ্যে গির্জার বাইরে গুলি চালিয়ে দুই নারীকে হত্যা করে আরেক বন্দুকধারী। ৪ জুন পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে ব্যস্ত সড়কে বন্দুকধারীদের গুলিতে তিনজন নিহত হন। ৯ জুন মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে এক কারখানা কর্মীর গুলিতে তার তিন সহকর্মী নিহত হন। বন্দুক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অস্ত্র আইন কঠোর করার দাবিতে প্রতিবাদ করছেন হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক। আঙুল উঠেছে দেশটির সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীর দিকে। কী রয়েছে এই সংশোধনীতে?
দ্বিতীয় সংশোধনীর ইতিহাস
১৭৭৬ সাল। যুক্তরাষ্ট্রে তখনো ব্রিটিশদের শাসন চলছে। ব্রিটিশ শাসনে ক্ষুব্ধ মার্কিনিরা সে সময় বিদেশিদের হাত থেকে দেশকে রক্ষায় বন্দুকের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। একপর্যায়ে জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষের হাতে বন্দুক চলে আসে। ঘরে ঘরে তখন বন্দুক। লোকজন বাড়িতে বই না রাখলেও বন্দুক ঠিকই রাখত। এসব বন্দুকের বেশির ভাগই ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যবহার করা হয়। ১৭৮৩ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর নতুন দেশের রূপরেখা নিয়ে দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। একটি অংশ ফেডারেলিস্ট আর অন্যটি অ্যান্টি-ফেডারেলিস্ট। ফেডারেলিস্টরা দেশ শাসনে জাতীয় প্রজাতন্ত্র চায় আর অ্যান্টি ফেডারেলিস্টদের দাবি ছিল, ছোট, স্থানীয় সরকার দেশ পরিচালনা করবে। খসড়া সংবিধান প্রণয়নের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের (জর্জ ওয়াশিংটন, আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টন, বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন, জন অ্যাডামস, স্যামুয়েল অ্যাডামস, টমাস জেফারসন, জেমস ম্যাডিসন, জন জে) উভয় শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এমন এক সংবিধান তারা প্রণয়ন করতে চেয়েছিলেন, যাতে দুই পক্ষই সন্তুষ্ট হয়। জাতীয় প্রজাতন্ত্র চাওয়া ফেডারেলিস্টরা মনে করতেন, দেশে শক্তিশালী সেনাবাহিনী থাকলে তারাই স্বাধীনতা রক্ষা করবে। অন্যদিকে অ্যান্টি-ফেডারেলিস্টদের ভাষ্য, জনগণের চেয়ে রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। রাষ্ট্র নয়, জনগণকেই শক্তিশালী করতে হবে। ফেডারেলিস্ট ও অ্যান্টি-ফেডারেলিস্টদের খুশি করতে বিল অব রাইটসে সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট বা দ্বিতীয় সংশোধনী নামে এক ধারা যুক্ত করেন প্রতিষ্ঠাতারা। এ ধারায় বলা হয়, নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অধিকার সহায়ক অধিকার। এ অধিকার মানুষের আত্মরক্ষার সহজাত অধিকার, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় সহযোগিতা করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন জেমস ম্যাডিসন সে সময় বলেছিলেন, অঙ্গরাজ্যগুলোর মিলিশিয়া বাহিনীকে কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড নজরে রাখার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় সংশোধনীকে সে সময় মার্কিনিদের বন্দুকের মালিকানার অধিকার হিসেবে দেখা হতো না। বরং আরেক প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্ডার হ্যামিল্টনের ভাষ্য, শাসনের সমষ্টিগত ব্যবস্থায় জনগণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে তাদের বন্দুকের মালিকানা দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের বৈধতা দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে তা ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়। গানফাইট বইয়ের লেখক ও আইনের অধ্যাপক অ্যাডাম উইঙ্কলার বলেন, লুকিয়ে অস্ত্র বহন নিষিদ্ধের আইন করেছিল বেশির ভাগ অঙ্গরাজ্য। অস্ত্র বহনের বিষয়ে অনেক মার্কিন সংস্থা নির্দেশ দেয়, বন্দুক নিয়ে সংস্থার ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। ১৮৯৩ সালে টেক্সাসের গভর্নর বলেছিলেন, হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার লক্ষ্যেই অস্ত্র লুকিয়ে বহন করা হয়। কেউ অস্ত্র গোপনে বহন করছে কি না, সেদিকে নজর রাখা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন সময় যেসব আইন প্রণয়ন করা হয়, সেসব প্রায়ই চ্যালেঞ্জ করা হতো। তবে সেসব আইন কদাচিৎ কোনো আদালত বা আইনসভা বাতিল করত। শিল্পবিপ্লবের পর পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করে। ১৯৬৩ সালে লি হার্ভে অসওয়াল্ডের হাতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নিহত হওয়ার পর মার্কিন নাগরিকরা অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করার আহ্বান জানায়। প্রেসিডেন্ট কেনেডি হত্যার পাঁচ দিন পর কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর টমাস ডড ডাকযোগে শটগান ও রাইফেল বিক্রি নিয়ন্ত্রণের আইন প্রণয়ন করে। মার্কিন নাগরিকদের বন্দুকের মালিকানা থাকবে কী থাকবে না, বর্তমান সময়ের এই বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে মূলত ওই সময়েই।
বন্দুকের মালিক কারা
যুক্তরাষ্ট্রে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো না। সংবিধানে উল্লিখিত বন্দুকের মালিকানার অধিকার তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল না। দ্বিতীয় সংশোধনীর খসড়া করার সময় আইনে কৃষ্ণাঙ্গদের বন্দুকের মালিকানার অনুমতি দেওয়া হয়নি। বন্দুক কেবল অন্যায়-জুলুম প্রতিরোধের হাতিয়ার ছিল না, এর মাধ্যমে সম্পদও রক্ষা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের দাস মালিকরা কৃষ্ণাঙ্গদের হাত থেকে সম্পদ রক্ষার জন্য নিজেদের কাছে প্রচুর অস্ত্র রাখত। সাধারণ জনগণের চেয়ে দ্বিগুণ অস্ত্রের মজুদ ছিল তাদের। কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের বিপ্লব দমনের লক্ষ্যে দাস মালিক ও সেনাবাহিনী প্রায়ই এসব অস্ত্র ব্যবহার করত।
হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নোয়াহ শাস্টারম্যান জানান, বন্দুকের মালিকানা দিয়ে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তার শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের শক্তিশালী করে, অন্যদিকে সামাজিক কাঠামোও বজায় রাখা হয়। এই কাঠামোতে শ্বেতাঙ্গরা ছিল ওপরে, কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থান ছিল সমাজের তলানিতে। এ কারণে আইনে শ্বেতাঙ্গদের বন্দুক রাখার বৈধতা দেওয়া হলেও কৃষ্ণাঙ্গদের দেওয়া হয়নি। ষাটের দশকে অবশ্য ভিন্নচিত্র দেখা যায়। সে সময় কৃষ্ণাঙ্গদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক অধিকার আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয়। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকান মন্ত্রী ম্যালকম এক্স থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দল ব্ল্যাক প্যান্থার পার্টি ও কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা বর্ণবাদ উচ্ছেদের লক্ষ্যে তাদের সমর্থকদের সশস্ত্র হওয়ার পক্ষে সমর্থন দেন। বর্ণবাদী আচরণের জবাব দিতে বন্দুকের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তারা। বন্দুকের মালিকানার পক্ষে কৃষ্ণাঙ্গদের জোরালো অবস্থান দেখে বন্দুক নিয়ন্ত্রণ সংগঠন খুলে বসে কু ক্লাক্স ক্ল্যান (মার্কিন শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী যাদের লক্ষ্য আফ্রিকান আমেরিকান, ইহুদি, লাতিনো, এশিয়ান আমেরিকান, ক্যাথলিক ও ন্যাটিভ আমেরিকান)। এর প্রতিক্রিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ নেতারা বন্দুক কিনতে শুরু করলে কেন্দ্রীয় সরকার বন্দুক বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করে। সত্তরের দশকে শ্বেতাঙ্গরা বলতে শুরু করেন, সহিংস সংখ্যালঘুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষায় বন্দুক দরকার তাদের। বন্দুকের মালিকানার আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না এ বিতর্ক উঠলেই শ্বেতাঙ্গরা যুক্তি দাঁড় করান, অশ্বেতাঙ্গদের বাড়াবাড়ির জবাব একমাত্র বন্দুকই দিতে পারে। এই যুক্তি তারা সেই সত্তরের দশক থেকে এখন পর্যন্ত দেখিয়ে আসছেন। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক জানান, বন্দুকের মালিকানার সঙ্গে দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গভীর যোগাযোগ রয়েছে। ১৯৭২ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে বন্দুক বিক্রি বাড়ে। দেশটির শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল রিপাবলিকান পার্টি বন্দুকের মালিকানার পক্ষে, অন্যদিকে সংখ্যালঘুদের ব্যাপক সমর্থন পাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টি কঠোর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন চায়।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের অভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা বাড়ছে বৈ কমছে না। বছর কয়েক আগে এক প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রতি ১০০ আমেরিকানের কাছে ১২০.৫টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। অর্থাৎ গড়ে একজন মার্কিনি একটির বেশি বন্দুকের মালিক। মাথাপিছু বন্দুকের হিসাবে এই সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে রিপাবলিকানদের দ্বিগুণের বেশি বন্দুক রয়েছে। নব্বই দশক থেকে ডেমোক্র্যাটদের বন্দুকের মালিকানার হার অনেক কমে যায়।
বন্দুক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ও বন্দুক সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা এভরিটাউন ফর গান সেফটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দুক আইন দুর্বল থাকা ১৩টি অঙ্গরাজ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের কারণে মৃত্যুহার বেশি। এসব অঙ্গরাজ্য হচ্ছে ক্যানসাস, আলাস্কা, কেনটাকি, মিসৌরি, নিউ হ্যাম্পশায়ার, অ্যারিজোনা, ওকলাহোমা, সাউথ ডাকোটা, আরকানসাস, মন্টানা, আইডাহো, মিসিসিপি ও ওয়াইওমিং। অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়া, হাওয়াই, নিউ ইয়র্ক, কানেকটিকাট, ইলিনয়, ম্যাসাচুসেটস, মেরিল্যান্ড ও নিউ জার্সি এই আট অঙ্গরাজ্যে বন্দুক আইন কঠোর হওয়ার কারণে বন্দুক সহিংসতার হার কম। কঠোর বন্দুক আইন যেসব অঙ্গরাজ্যে রয়েছে, সেখানে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব ও দুর্বল বন্দুক আইনের অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের প্রভাব স্বভাবতই বেশি।
ইলিনয়ের নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির শিক্ষার্থী ম্যাথিউ ল্যাকম্ব জানান, বন্দুকের মালিকানা কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, তা বুঝতে হলে দ্বিতীয় সংশোধনীর পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা লক্ষ্য করা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বন্দুকের অধিকারবিষয়ক সংস্থা ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশনের (এনআরএ) সম্পাদকীয়কে সব সময় বন্দুকের মালিকানার সঙ্গে দেশপ্রেমের সেতু নির্মাণে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।
এনআরএ কী
কেন্দ্র সরকার দমনমূলক আচরণ করলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য একসময় সংবিধানে দ্বিতীয় সংশোধনী আনা হয়েছিল। অধ্যাপক শাস্টারম্যানের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীতে পেশাদার সেনাদের ভাড়াটে সেনা হিসেবে দেখা হতো। অন্যদিকে মিলিশিয়াদের দেশপ্রেমিক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। আজকে যারা দ্বিতীয় সংশোধনী সমর্থন করছেন, সেই অ্যান্টি-ফেডারেলিস্টদের উত্তরসূরিদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকেও সমর্থন করতে হবে। এটি না করা অদেশপ্রেমসুলভ আচরণ। অথচ একসময় ফেডারেলিস্টরা সেনাবাহিনীকেই শক্তিশালী করতে বলেছিল, জনগণকে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের বিরোধিতার জন্য বন্দুকের যদি আর প্রয়োজন না থাকে, তাহলে এটি কেন এখনো আমেরিকানদের জীবনের অপরিহার্য অংশ? এর উত্তরে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ন্যাশনাল রাইফেল অ্যাসোসিয়েশন (এনআরএ) কোটি কোটি ডলার রিপাবলিকান প্রার্থীদের পেছনে ব্যয় করে। রিপাবলিকানরা বরাবরই কঠোর বন্দুক আইনের বিরোধিতা করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধের সময় শহরবাসী ইউনিয়ন সেনাদের বন্দুক চালানো শেখাত এনআরএ। এ লক্ষ্যেই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বন্দুকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এনআরএ একসময় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করত। এমনকি প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যাকাণ্ডের পর বন্দুক আইন কঠোরে কংগ্রেসের সিদ্ধান্তও সমর্থন করেছিল এনআরএ। ষাট ও সত্তরের দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের নেতৃত্বাধীন নাগরিক অধিকার আন্দোলন ব্যাপক জনপ্রিয় হলে এনআরএর অবস্থান পুরোপুরি বদলে যায়। বিশেষ করে ১৯৬৮ সালে বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির ওপর লাইসেন্স ব্যবস্থা আরোপ করলে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ১৯৭৫ সালে বর্ণবাদী বিভাজন পুঁজি করতে শুরু করে এনআরএ। একইসঙ্গে চলে অস্ত্রের লবি। দুই বছর পর পুরনো নেতৃত্বের বড় অংশকে বের করে দিয়ে দ্বিতীয় সংশোধনীর পক্ষের লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয় সংগঠনটিতে। এনআরএ কত শক্তিশালী এক সংগঠনে পরিণত হয়েছে, তা বুঝতে একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ২০১২ সালে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের নিউটাউন শহরে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে ঢুকে গুলি করে ২৬ জনকে হত্যা করে ২০ বছর বয়সী অ্যাডাম ল্যানজা। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল শিশুশিক্ষার্থী। ওই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। তিনি বলেছিলেন, নিহতদের পরিবারকে দেখতে যাওয়া তার প্রেসিডেন্ট জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। ওই প্রথম কোনো ঘটনায় সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টদের কাঁদতে দেখেছেন তিনি। বন্দুক হামলার ওই ঘটনার এক বছর পর ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক সিনেটর জো মানচিন ও রিপাবলিকান সিনেটর প্যাট টুমি সিনেটে এক খসড়া বিল উত্থাপন করেন যাতে বন্দুকের মালিকানার ওপর কড়াকড়ির প্রস্তাব করা হয়। বন্দুক কিনতে ইচ্ছুক ব্যক্তি কখনো কোনো ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন কি না তা খতিয়ে দেখার কথা মূলত ওই বিলে বলা হয়। এ বিষয়ে আলোচনায় তারা দুজনই এনআরএকে যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। মানচিন ও টুমির প্রস্তাব সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
সিবিএস নিউজের জরিপে দেখা যায়, সিনেটর মানচিন ও টুমির প্রস্তাবে সমর্থন জানায় ৯২ শতাংশ আমেরিকান। এমনকি রিপাবলিকান পোলস্টার (জনমত জরিপ বিশ্লেষণকারী ব্যক্তি) ফ্রাঙ্ক লুনজও জানান, এনআরএর ৭৪ শতাংশ সদস্য ওই বিলের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এক সপ্তাহ পর বন্দুকের মালিকানার পক্ষের প্রায় আড়াই লাখ মানুষ আমেরিকার বন্দুক মালিক নামের এক অ্যাডভোকেসি গ্রুপের থেকে একটি ইমেইল পায়। এতে বলা হয়, দ্বিতীয় সংশোধনী দুর্বল করার লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এনআরএ। কয়েক দিন পর প্রস্তাবিত খসড়া বিলের বিরোধিতা করে সংশ্লিষ্টদের ইমেল করে সংগঠনটি। সিনেটে বিলের পক্ষে ভোট আদায় করা আর সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারণায় বড় অঙ্কের আর্থিক সহযোগিতা করেই শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত হয়েছে এনআরএ। বিষয়টি আসলে তা নয়। ২০১৭ সালে লবিংয়ের জন্য ৪.১ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছিল এনআরএ। ঠিক একই সময়ে ডেইরি ইন্ডাস্ট্রি একই কাজে ব্যয় করে ৪.৪ মিলিয়ন ডলার। এতে বোঝা যায়, এনআরএর ক্ষমতার উৎস শুধু অর্থ নয়। ম্যাথিউ ল্যাকম্বের মতে, এনআরএর ক্ষমতার প্রাথমিক উৎস রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অ্যাক্টিভিজম ও সংগঠনের সদস্যদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের মধ্যে নিহিত। বন্দুকের মালিকানার প্রতি সমর্থন ও রিপাবলিকান অনেকের কাছে সমার্থক হয়ে গেছে। কালকে যদি এনআরএ তাদের দোকান বন্ধও করে দেয়, তাহলেও মার্কিনিরা এ দুটিকে আলাদা করতে পারবে না।
২০২১ সালে জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শপথ নেওয়ার কয়েক দিন আগে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা করে তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা। ওই হামলাকারীদের সঙ্গে মিলিশিয়া বাহিনীর সাদৃশ্য পাওয়া যায় অনেকটাই। এই মিলিশিয়াদের অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেশপ্রেমিক হিসেবে দেখা হতো। অধ্যাপক শাস্টারম্যান বলেন, ‘বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করা এখন আগের চেয়ে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে। সামনে আরও কঠিন হতে পারে।’ সম্প্রতি একের পর এক বন্দুক হামলায় উদ্বিগ্ন মার্কিনিরা বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে। এই আইন কঠোর না করলে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক সহিংসতা বন্ধ হবে না। রিপাবলিকানদের চাপে শেষ পর্যন্ত বাইডেন প্রশাসন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোর করতে পারবে না বলে আশঙ্কা অনেকের। একমাত্র জনগণের দুর্বার আন্দোলনই পারে বন্দুক সহিংসতা থামাতে, অন্যথায় নয়।