টানা বৃষ্টিপাত ও ভারত থেকে নেমে আসা উজানের ঢলে সিলেট বিভাগে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই বাংলাদেশ কমবেশি প্রতিবছর বন্যায় প্লাবিত হয়। কখনো এই বন্যা সহনশীল থাকে, আবার অনেক সময়ই ভয়াল আকার ধারণ করে। এবারের বন্যা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কেননা, দেশ যখন করোনা মহামারীতে বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে তখনই খাঁড়ার ঘা হিসেবে বৃহৎ অঞ্চলে বন্যার প্রকোপ দেখা দিল।
গত তিন দিনে বাংলাদেশের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ওই বৃষ্টির পানি ঢল হয়ে বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের প্রায় সব ক’টি জেলায় প্রবেশ করেছে। সরকারের বন্যা-পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, আগামী তিন দিন উজানে ভারতীয় অংশে ও বাংলাদেশ অংশে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদী তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে তিস্তা অববাহিকার চারটি জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে মনে করছে বন্যা-পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।
বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় সিলেট বিভাগের বেশিরভাগ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। টেলিফোন নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে ও দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো সিলেটের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সিলেট বিভাগ কার্যত সারা দেশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলা যায়। প্রতিবেশী ভারতের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে। ওই এলাকার ভাটি এলাকা হিসেবে বাংলাদেশে পানি নামা শুরু করবে। এর আগে থেকেই ওই এলাকায় এমনিতেও বৃষ্টি বেশি ছিল। এর সঙ্গে নতুন পানি যোগ হয়ে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
যেকোনো দুর্যোগে সবার আগে মানবিক বিপর্যয়ের দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এজন্য বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় অসহায় মানুষ যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয় পায়, এ ব্যাপারে বিশেষ যতœবান হতে হবে। ইতিমধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যার্তদের উদ্ধারে সেনাবাহিনী কাজ শুরু করেছে। এতে করে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বন্যার্তদের উদ্ধারের পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
প্রতি বছর ছোট-বড় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে এর প্রকোপ কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য নদ-নদীগুলোর নাব্য বাড়াতে হবে সর্বাগ্রে। আমাদের অবিবেচনাপ্রসূত কর্মকা- ও অদূরদর্শিতায় একসময়ের খরস্রোতা নদীগুলো আজ জীর্ণশীর্ণ অথবা মরণাপন্ন অবস্থায় উপনীত হয়েছে। নদ-নদীগুলোকে অবশ্যই মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক নদ-নদীগুলোর ব্যাপারে আমাদের অবস্থান ও দাবি আরও জোরালো করার লক্ষ্যে কার্যকর কূটনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ। উল্লেখযোগ্য নদীগুলোর উৎস দেশের ভূসীমানার বাইরে। অভিন্ন নদীগুলোর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ভারত ও নেপালের সঙ্গে এমন গঠনমূলক আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
বাংলাদেশ এখন এক বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জরুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। সব ধরনের দুর্যোগেই যারা সবচেয়ে বেশি অসহায় অবস্থায় পড়ে, সেই দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় খাদ্য ও নিরাপদ পানির সংকট। বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে ঘরে ঘরে খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে; অধিকাংশ বন্যাপ্লাবিত এলাকার পানীয় জলের প্রধান উৎস অগভীর নলকূপগুলোর বেশিরভাগই তলিয়ে গেছে। এটা গভীর উদ্বেগের বিষয়। কারণ নিরাপদ পানির অভাব থেকে পানিবাহিত নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। বন্যাদুর্গত মানুষের পক্ষে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বসবাস করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক মানুষকে একসঙ্গে আশ্রয় নিতে হয় উঁচু সড়ক, বাঁধ, স্কুলঘর ইত্যাদি জায়গায়; দিনরাত কাটাতে হয় গাদাগাদি করে। এ রকম ঘনবদ্ধ বসবাস ভাইরাস সংক্রমণ বৃদ্ধির অনুকূল। বন্যার ঢল ঠেকানো সম্ভব নয় বটে, তবে বন্যাদুর্গত মানুষকে করোনা সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষার কোনো উপায় নেইএটা মনে করারও কোনো সুযোগ নেই। মানুষকে বাঁচাতে হবে, সে জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কার্যকর পন্থাগুলো খুঁজে বের করতে হবে।