ডুবছে নতুন নতুন জনপদ

টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় দেশজুড়ে বন্যার ভয়াবহতা বাড়ছে। প্রতি ঘণ্টায় বাড়ছে দেশের নদ-নদীগুলোর পানি। একই সঙ্গে প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন জনপদ। তলিয়ে গেছে ফসলের ক্ষেত ও রাস্তাঘাট, পানি ঢুকেছে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরসহ বাড়িঘরে। তলিয়েছে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে হাজারো ঘেরের কোটি কোটি টাকার মাছ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ, যারা চরম দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছে। অনেক জেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে বানভাসি মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকায় দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পনির সংকট। এ ছাড়া গবাদিপশুর খাবার নিয়েও বিপাকে পড়েছে বন্যার্তরা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী গতকাল শনিবার পর্যন্ত দেশের ১০ জেলার ৬৪টি উপজেলা বন্যাকবলিত। এরই মধ্যে বনা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিস্তারিত সংশ্লিষ্ট জেলা, উপজেলা প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে:

নেত্রকোনার কলমাকান্দায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উপজেলার উব্দাখালী নদীর পানি গতকাল বিকেল ৪টার দিকে বিপদসীমার ১০৩ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এর আগে গত শুক্রবার একই সময়ে এই নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল্লাহ জানান, বন্যায় কলমাকান্দার ১৭২টিসহ আট উপজেলায় ৫৪০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। কলমাকান্দায় ৬৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে পাঁচ হাজার লোক আশ্রয় নিয়েছে এবং পুরো উপজেলার দুই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। উপজেলার ২ হাজার ৫০টি পুকুর তলিয়ে প্রায় ৪ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে।

কলমাকান্দার প্রধান প্রধান সড়কসহ উপজেলা পরিষদ, থানা কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার কার্যালয় পানিতে নিমজ্জিত। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে পাঁচ-ছয় ফুট পানি থাকায় সড়ক দিয়ে চিকিৎসা নিতে আসতে পারছে না রোগীরা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগও হাঁটু পানির নিচে থাকায় চিকিৎসাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসার জন্য রোগী নিয়ে নৌকা করে আসতে হচ্ছে। যাতায়াতে নৌকাই প্রধান ভরসা সদরসহ পুরো কলমকান্দাবাসীর। এ ছাড়া দুদিন ধরে কলমাকান্দাবাসী বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে।

কলমাকান্দার কৃষি কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ জানান, পুরো উপজেলায় প্রায় ২৫০ হেক্টরের মতো আউশ ধান ও ৭০ হেক্টরের মতো রবিশস্যের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এদিকে মোহনগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেললাইনের নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় গতকাল একটি রেল কালভার্ট বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে। এতে মোহনগঞ্জের সঙ্গে ময়মনসিংহের ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

ধোবাউড়ায় বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত : ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী ধোবাউড়া উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেতাই নদীর বাঁধ ভেঙে চারটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ছয় শতাধিক পরিবার। ধোবাউড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফৌজিয়া নাজনীন জানান, ঘোষগাঁওয়ে নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ ও নেতাই নদীর পাড় ভেঙে উপজেলার দক্ষিণ মাইজপাড়া, ঘোষগাঁও ও পুরাকান্দুলিয়া ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া গোয়াতলা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

পাহাড়ি ঢলে হাওরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ছে। ডুবে গেছে রাস্তাঘাট ও হাটবাজার। জেলার সব কয়টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিশোরগঞ্জের হাওরে ধনু, ঘোড়াউত্রাসহ অন্যান্য নদীর পানি বেড়েছে। গতকাল নদীগুলোর পানি প্রায় ৮৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, আগামী তিন দিন আবহাওয়ার পূর্বাভাসে নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। জেলার ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ও আনন্দবাজারে পানি ঢুকেছে। পানিতে দোকানপাট তলিয়ে গেছে।

চলনবিল অঞ্চলের ৮ উপজেলা প্লাবিত : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়নের রাউতারা সøুইসগেট সংলগ্ন রিং বাঁধ ভেঙে শাহজাদপুরসহ চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জের ৮ উপজেলার প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর ফসলের মাঠ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে অতিবর্ষণ ও উজানের ঢলে বাঁধটি ভেঙে যায়। ফসল রক্ষার জন্য সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী এ বাঁধটি নির্মাণ করে।

কুড়িগ্রামে পানিবন্দি লক্ষাধিক : কুড়িগ্রামেরে ৯ উপজেলার এক লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও দুধকুমার নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় প্লাবিত হচ্ছে হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে নিম্নাঞ্চল ও নদ-নদী অববাহিকায় বসবাসকারী চরাঞ্চলের মানুষ। দুর্গম চরাঞ্চলে অনেক পরিবার নৌকা ও বাঁশের মাচানে আশ্রয় নিয়ে দিন পার করছে। আবার অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু সড়কে আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। বসতবাড়ি পানিতে তলিয়ে থাকায় দেখা দিয়েছে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। নিজেদের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্যসংকট নিয়েও বিপাকে পড়েছেন তারা। বন্যাকবলিত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান বন্ধ রেখেছে শিক্ষা বিভাগ।

বগুড়ায় যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বন্যার পানিতে ডুবেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকছে। গত শুক্রবার রাতে সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে। গতকাল বিকেলে পানি বিপদসীমার ১৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া বাঙালি নদীর পানিও বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তলিয়ে গেছে চরাঞ্চলের ফসলের ক্ষেত। পানি উঠেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের ভেতরের বাড়িঘরেও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় বিপাকে পড়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

আখাউড়ায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে ১১ গ্রাম প্লাবিত : ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে উপজেলার তিন ইউনিয়নের ১১ গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রশাসনের উদ্যোগে ওই এলাকার ২৮টি পরিবারকে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। গতকাল ভোরে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে আখাউড়ার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী কর্নেল বাজারসংলগ্ন আইড়ল এলাকায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। বাঁধসংলগ্ন সড়কও ধসে পড়েছে। মনিয়ন্দ ইউনিয়নের আইড়ল, ইটনা, খারকুট, বড় লৌহঘর, ছোট লৌহঘর ও বড় গাঙ্গাইল এবং পার্শ্ববর্তী মোগড়া ইউনিয়নের নিলাখাদ গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ায় সীমান্তবর্তী এসব গ্রামের বাসিন্দারা বিপাকে পড়েছে। এর আগে গত শুক্রবার দিনভর টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট সড়কের একাংশ এবং সীমান্তবর্তী আখাউড়া উপজেলার দক্ষিণ ইউনিয়নের কালিকাপুর, বীরচন্দ্রপুর, আব্দুল্লাহপুর ও বঙ্গেরচর গ্রামের নিচু এলাকা প্লাবিত হয়।

দিনাজপুরে বাড়ছে নদ-নদীর পানি : উত্তরের জেলা দিনাজপুরের নদ-নদীর পানি বেড়েই চলছে। জেলার প্রধান ৩টি নদীর পানি বিপদসীমা ছুঁই ছুঁই করছে। কয়েক দিন ধরে উজান থেকে বয়ে আসা পানির কারণে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পায়। তবে গত শুক্রবার দিনাজপুরে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে নদ-নদীগুলোর পানি অস্বাভাবিক বাড়ে। দিনাজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি সার্ভেয়ার মাহাবুব আলম জানান, জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে এমন প্রধান ৩টি পুনর্ভবা, আত্রাই ও ছোট যমুনার পানি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে জেলার কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিস্তায় আসছে ভয়াবহ ঢল : উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা অববাহিকা ঘিরে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ভারতের অংশে দো-মহনী পয়েন্টে তিস্তা, জলঢাকা, কালজানি ও তোর্সা নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে। ভুটানেও চলছে বৃষ্টি। এর জেরে ভুটান পাহাড় থেকে কালজানি এবং তোর্সা নদী দিয়ে প্রবল বেগে নেমে আসছে পানির স্রোত। নীলফামারীর ওপারে উজানে ৪৫ কিলোমিটার অদূরে ভারতের আলিপুরদুয়ার ও ১০ কিলোমিটার অদূরে কোচবিহারেও লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা নদীর প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের নীলফামারীর কালিগঞ্জ সীমান্ত লাগোয়া ভারতের অংশের তিস্তা অসংরক্ষিত এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদে সরে যেতে বলা হয়েছে। ভারতের দো-মহনী পয়েন্টে গতকাল বেলা ৩টা থেকে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে বলে জানানো হয়েছে। এতে ভারতের অংশের তিস্তায় লাল সংকেত জারি করা হয়েছে। উজানে ভারতের অংশের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অংশের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি গতকাল বিকেল থেকে হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডালিয়া বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ও ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী কর্মকর্তা আসফাউদদৌলা এ তথ্য জানান।

শেরপুরে ৪০ গ্রাম প্লাবিত : শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী শ্রীবর্দী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলায় ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ঢলের পানিতে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চরম ভোগন্তিতে রয়েছে বন্যাকবলিতরা। এ ছাড়া অর্ধশত স্কুল ও মাদ্রাসায় পানি ওঠায় ওই সব প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে পানিবন্দি মানুষের জন্য শুকনো খাবার, টাকা ও চাল বরাদ্দ করা হয়েছে।

জামালপুরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বেড়ে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গতকাল দুপুরে যমুনার পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে নিম্নাঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। নদীতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।