জলাবদ্ধ বন্দরনগরে দুর্ভোগ চরমে

চার দিন ধরে টানা বর্ষণে হাঁটু-কোমর সমান পানিতে ডুবল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। এতে নগরীর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে নগরবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। এদিকে, পুরো বন্দরনগরী প্রায় পানিবন্দি হয়ে পড়ায় যান চলাচলও কমে গেছে। দুয়েকটি পাবলিক বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা চলাচল করছে; সেগুলো ভাড়া নিচ্ছে দুই থেকে তিনগুণ বেশি। এতে অফিসগামী লোকজন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টার পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৪৭.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে বৃষ্টিপাত আরও দুয়েক দিন থাকার কথা জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ।

এর আগে, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে গত শুক্রবার রাতে নগরীর আকবর শাহ থানা এলাকায় পৃথক দুটি পাহাড় ধসের ঘটনায় চারজন নিহত হওয়ার পর অভিযানে নেমেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল দিনব্যাপী এই অভিযানে নগরীর আকবরশাহ থানাধীন পূর্ব ফিরোজশাহ ১নং ঝিল এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১৮০টি অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে।

গত বুধবার থেকে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক, গলি ও উপগলি হাঁটু থেকে কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া নগরীর মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, ২ নম্বর গেট, জিইসি, ফরিদারপাড়া, চকবাজার, বাদুরতলা, কাপাসগোলা, ষোলশহর, মোগলটুলি, আগ্রাবাদ, ট্রাঙ্ক রোড, বাকলিয়া ডিসি রোড, তালতলা, চান্দগাঁও, খতিবের হাট, সিঅ্যান্ডবি কলোনি, চাকতাই, খাতুনগঞ্জ, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, আগ্রাবাদ, ঈদগাঁও, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর, হালিশহর, বিবিরহাট এলাকা, অক্সিজেন ও অন্যান্য আবাসিকসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে স্থানীয় ও পথচারীদের দুর্ভোগ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সড়কের পাশাপাশি অলিগলি, নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়েছে। প্রায় সকলেই পানিবন্দি হয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

প্রতিবারের মতো এবারও টানা বর্ষণের কারণে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলা হাঁটুসমান তলিয়ে গেছে। এতে চরম বেকায়দায় পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিচতলার রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।

সাইফুদ্দিন নামে এক রোগীর স্বজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত সপ্তাহ থেকে আমার এক আত্মীয় এখানে ভর্তি আছেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার রাতে হঠাৎ হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। এতে হাসপাতালের রিসিপশনসহ পুরো বিল্ডিংয়ের নিচতলায় পানি থৈ থৈ করছে। টানা বৃষ্টি হওয়ায় পানি কমছে না। আমরা যারা রোগীর স্বজন আছি খুব বেকায়দায় পড়ে গেছি।’

সোলাইমান নামে এক পথচারী বলেন, ‘ফটিকছড়ি থেকে শহরে একটি কাজে এসেছি। কিন্তু শহরে এসে খুব কষ্টে পড়ে গেছি। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। মুরাদপুরে এক কোমর পানি উঠে গেছে। আর এদিক-ওদিক যাওয়া যাচ্ছে না। দুয়েকটি যে গাড়ি চলাচল করছে; সেগুলোর ভাড়াও দুই-তিনগুণ বেশি নিচ্ছে।’

বীথি নামে বাদুরতলা এলাকার এক গৃহবধূ জানান, পুরো বাদুরতলা এলাকায় পানি আর পানি। গত দুদিন ধরে গলিতে এক কোমর আর প্রধান সড়কে হাঁটু সমান পানি উঠে গেছে। কোনোভাবে পানি কমছে না। মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতে বেরিয়ে ছিলেন। কিন্তু নিতে পারেননি। পানিও বেশি, তার ওপর রিকশাচালকরা ভাড়া হাঁকাচ্ছে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে দুই-তিনগুণ বেশি।

উপমা সুলতানা নামে বাকলিয়া ডিসি রোড এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, চার দিন ধরে বাকলিয়া ডিসি রোডসহ পুরো এলাকা এখন পানিবন্দি। প্রধান সড়ক প্রায় কোমর সমান আর অনেক গলি পুরোটাই পানিতে ডুবে গেছে। পানির কারণে কেউ বের হতে পারছে না। বৃষ্টি এরকম আরও দুই-চার দিন স্থায়ী হলে খাওয়াদাওয়া ও চলাফেরা করতেও কষ্ট হবে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ মাজহারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রামে গত চার দিন ধরে টানা বৃষ্টিপাত হচ্ছে। তবে মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টিপাত কমে আসতে পারে।

এদিকে, পাহাড় ধসে প্রাণহানির পর পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে লোকজন সরাতে সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি গতকাল এই দুই সংস্থার যৌথ উদ্যোগ ও সহযোগিতায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় অভিযানের নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. তৌহিদুল ইসলাম, কাট্টলি সার্কেলের এসিল্যান্ড ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, আগ্রাবাদ সার্কেলের এসিল্যান্ড মো. আল আমিন সরকার ও চান্দগাঁও সার্কেলের এসিল্যান্ড মো. মাসুদ রানা।

উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনে গিয়ে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রহমান বলেন, পাহাড়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরত যেসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে; সেখানে পুনরায় কেউ যাতে দখল করে আবারও স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারে; সেজন্য কাঁটাতার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে গাছ লাগানো হবে। যদি কেউ এই সীমানা ভেঙে বসতি গড়ে তোলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকেও বলেছি তাদের আওতাধীন পাহাড়ি জায়গায় নির্মিত অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করে সেখানে কাঁটাতারের বেড়া ও গাছ লাগিয়ে সংরক্ষণ করতে। পাহাড়ে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যেই ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে; সেখানে পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসরতদের আশ্রয় নেওয়ারও অনুরোধ জানান তিনি।