২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ও বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির চাপে বড় দরপতন দেখা দিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হওয়া ৮৫ শতাংশ শেয়ারের পতনে প্রধান মূল্যসূচক কমেছে ৪৯ পয়েন্ট। কমেছে লেনদেনের পরিমাণও।
পাচার করা টাকা দেশে ফেরতের মাধ্যমে পুঁজিবাজার চাঙ্গা হবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের এমন বক্তব্যের পর টানা সাত কার্যদিবসের দরপতনের ধারা কাটিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ইঙ্গিত ছিল গত সপ্তাহের শেষ দুই কার্যদিবসে। ওই সাতদিনে ১৩৬ পয়েন্ট হারানোর পর গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুদিনেই প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৪ পয়েন্ট ফিরে পেয়েছিল। এতে আশাও জেগেছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। কিন্তু চলতি সপ্তাহের প্রথম দুদিনে ফের দরপতনের ধারায় পুঁজিবাজার।
গতকাল সোমবার প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৮০ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড কেনাবেচা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩৬টির দর বেড়েছে। বিপরীতে ৩২৫টি শেয়ারেরই দর কমেছে এবং অপরিবর্তিত থেকেছে ১৯টির দর। এতে ডিএসইএক্স ৪৯ পয়েন্ট হারিয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লেনদেনের মধ্যে ২৪৯টি এবং শেষ পর্যন্ত ১৭২টি সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হয়, যেখানে সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয় মাত্র একটি। সার্কিট ব্রেকারের সর্বনিম্ন দরে কেনাবেচা হওয়ায় সিংহভাগ শেয়ার ক্রেতাশূন্য ছিল। লেনদেনের পুরো সময়ে ৪৯টি শেয়ার রবিবারের তুলনায় কম দরে কেনাবেচা হয়। আরও ৬৬ কোম্পানির শেয়ার লেনদেনের মধ্যে সর্বোচ্চ আগের দিনের ক্লোজিং প্রাইসে কেনাবেচা হয়েছিল।
২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে কোনো সুবিধা না থাকায় বিনিয়োগকারীদের হতাশা থেকে দরপতন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে টাকার বিপরীতে ডলারের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি বড় পতনের উল্লেখযোগ্য কারণ বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। বিদেশিরা বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ার থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করতে থাকায় সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিনের লেনদেনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণই বেশি। সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকটও ব্যাপক। কোনো শেয়ার দুদিন বাড়লে তারপর আর শেয়ার ধরে রেখে ঝুঁকি বাড়াতে চান না অনেক বিনিয়োগকারী। কিছুটা মুনাফা পেলে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া যাদের আগ্রাসী ক্রয়ে শেয়ারদর বৃদ্ধি পায়, সে ধরনের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ কম। বরং কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার বিক্রির চাপ আছে। এটাও দরপতনের একটা কারণ হতে পারে।
বর্তমান বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট কতটা প্রকট, তা বুঝাতে শীর্ষ এক ব্রোকারেজ হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কোনো শেয়ারের দর পড়তে থাকলে দ্রুতই ওই শেয়ারের বিক্রেতা বেড়ে যায়। এরপর ওই শেয়ার ক্রেতাশূন্যও হয়ে যাচ্ছে। দরপতন ঠেকাতে নিচের সার্কিট ব্রেকার মাত্র ২ শতাংশ নির্ধারণ করার কারণে এ অবস্থা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
দর কমার সার্কিট ব্রেকার ২ শতাংশে বেঁধে দেওয়ার কারণে কোনো শেয়ারের দর একদিনে ২ শতাংশের বেশি কমার সুযোগ নেই। এ কারণে কোনো খাতেই সার্বিক দরপতন নির্দিষ্ট দিনে ২ শতাংশ ছাড়ানোর সুযোগ নেই। এ অবস্থায় গতকাল ২০ খাতের মধ্যে ১০টিরই গড়ে ১ থেকে দেড় শতাংশ পর্যন্ত দরপতন হয়েছে। সর্বাধিক ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ দরপতন হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের। এর বাইরে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, প্রকৌশল, বস্ত্র, সিরামিক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সেবা ও নির্মাণ এবং কাগজ ও প্রকাশনা খাতের সার্বিক দরপতনের হার ছিল ১ শতাংশের বেশি।
বড় পতনের মধ্যেও কিছু শেয়ারের দর বেড়েছে। বীমা খাতের নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি মেঘনা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার টানা নবম দিনে ১০ শতাংশ বেড়ে ২৩ টাকা ৩০ পয়সায় উঠেছে। গতকালও শেয়ারটি সার্কিট ব্রেকারের সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয়। কিন্তু এ দরেও আইপিওতে পাওয়া শেয়ার বিক্রিতে রাজি নন সিংহভাগ বিনিয়োগকারী। গতকাল কোম্পানিটির মাত্র দুই হাজার ৮৪৭টি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যার মূল্য ছিল মাত্র সাত হাজার টাকা।
এদিকে গতকাল ডিএসইতে ৮২২ কোটি টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ব্লক মার্কেটের এ লেনদেনের মধ্যে ব্যাংকের শেয়ারই লেনদেন হয়েছে প্রায় ১০২ কোটি টাকার। এর বাইরে পাবলিক মার্কেটে ৬৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। একক কোম্পানি হিসেবে ৬৫ কোটি টাকার লেনদেন নিয়ে শীর্ষে ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড।