ওঠানামার চক্কর

(প্রথম কিস্তির পর)

আদি চিলমারী বহুকাল আগে ব্রহ্মপুত্র নদে গিলে চরে ছেড়েছে ইউনিয়ন করে। চিলমারীর উপজেলা পরিষদ বসেছে থানাহাটে। রেলস্টেশন সেখান থেকে মাইল দেড়েক দূরে রমনা বাজারে। ব্রহ্মপুত্রের গ্রাসে গিয়ে রেললাইনের এখানেই শেষ। ‘রমনা বাজার স্টেশন’ নামের এটাই চিলমারীর রেলস্টেশন। এই স্টেশনের নামেই লোকাল ট্রেন ‘রমনা’। কুড়িগ্রাম-রমনা করত সেকালে। পয়লাবার ছাড়ত কুড়িগ্রাম থেকে সকাল ৮টার কিছু আগে-পরে। রমনা থেকে শেষবার ছাড়ত বিকেল ৪টা কি ৫টার দিকে। সেই ট্রেন নাকি চলত শম্বুক গোত্রীয় কেন্নো পোকার মন্থর গতিতে (মঙ্গা এলাকার লাইনের দুর্গতির চলন্ত প্রমাণ একবারে)! প্রথম বগির কারও দরকার হলে জমিনে নেমে ‘জলত্যাগ’ করে দিব্যি উঠতে পারে শেষ বগিটাতে বলে কৌতুক করত লোকে! সবই শোনা কথা, আমার নিজের কখনো ওঠা হয়নি (টাইমে মিলত না বলে)। কুড়িগ্রাম-চিলমারী সড়কের বাকি উলিপুর-থানাহাট অংশটুকুতে হেরিং-বোন-বন্ড হয়ে যায় আমার যাওয়ার আগ দিয়ে। কুড়িগ্রাম-থানাহাট লোকাল বাস সার্ভিস চালু হয় মাত্র দিন কয়েক আগে। কপালগুণে তাই বেঁচে গিয়েছিলাম আরও একখানা ‘ব্রেক’ থেকে! কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী পৌঁছাতে পেরেছিলাম একই লোকাল বাসে উঠে। তার আগে উলিপুরেই শেষ ছিল পাকা রাস্তা আর লোকাল বাস সার্ভিস। তখন চিলমারী যাওয়া-আসায় সাধারণের ভরসা কেবল ওই এক ট্রেন রমনা। চিলমারী উপজেলা কোর্টের মক্কেল-মোহরার, পেশকার-পেয়াদা, কেরানিরা অসাধারণ কেউ নয়। একসঙ্গে সবাই ভর করত ট্রেনটাতে। লোকাল বাস চালু হয়েছে তো কী হয়েছে! মায়া বসে তাদের গতিজড়তা থেকে গেছে রমনা ট্রেনেই! সেটাতে নাকি চলা যেত প্রায় মাগনাতে! গরিবানা কিছু বখশিশেই খুশি চেকার, টিকেট খুঁজত না খাতির করে (মঙ্গার দুঃখ বুঝত সরকারি লোকেও)! বখিল বাস-কনডাক্টর বোঝে না কিছুই, খাতির করে না ভাড়ায় এক পয়সাও! মক্কেল-মোহরার, পেশকার-পেয়াদা-কেরানিদের কোর্টে হাজিরার টাইম তাই আটকে থেকে গেছে ওই রেলের ঘণ্টাতেই! তার আগে ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে চরের তিনটা ইউনিয়নের মক্কেল আসে কী করে!  

নিয়মিত উকিল ছিলেন মোটে তিনজন চিলমারীতে। দুজনের আবাস উপজেলা পরিষদ চত্বরের আশপাশে। একজনের লাইসেন্সের বয়স বেড়ে ততদিনে ছাড়িয়েছে দুবছর! নিজের সেরেস্তা জমেনি তখনো। সিনিয়রের টাইম পিটিশন মুভই তার প্র্যাকটিস। রোজকার এ-দুজনের বাইরে আর একজন সার্কিট ডিউটির মতো সপ্তাহে তিন দিন নিয়মিত আসতেন লালমনিরহাট থেকে। চিলমারীর ওকালতিতে তিনিই ছিলেন নিয়ামক ব্যক্তি! প্রায় সব মামলা তারই হাতে লাগানো (বাদীপক্ষের আরজি দিয়ে)। তার হাত ফসকে যেত যে দু-একখানা সেগুলো চিলমারী ছাড়িয়ে পড়ত গিয়ে একেবারে কুড়িগ্রামে সিনিয়রদের হাতে। বেলা ১১টার আগে নিয়ামকের এসে পৌঁছানোর টাইম হতো না তার আসার দিন তিনটাতে। কুড়িগ্রাম থেকে সিনিয়রের আসার দিন হলে তো টাইমের বারোটা! হরেদরে সবার টাইম ঠেকে গিয়ে ওই রমনা ট্রেনের ঘণ্টাতেই! বেলা ১১টার আগে ঢোকা দায় আমার খাস কামরাতে। এজলাস রেডি করতে করতে তাদের যায় আরও আধা ঘণ্টা। কী করি নাচার! এতৎচক্রে আমার ওঠার (এজলাসে বসার) টাইমও উঠল সেই রেলের ঘণ্টাতে! বেলা সাড়ে ১১টার আগে উঠতে পারা যেত না কিছুতে। দেরি করে ওঠা হলে কি নামাতেও দেরি হবে! মঙ্গাপীড়িত উপজেলাটাতে মঙ্গা ছিল মামলাতেও। নথি ধরে গুনে গুনে পেয়েছিলাম মোটে ৫৩টি (সে আরেক কাহিনী! বলেছি ‘মামলার গোনাগুনি’-তে)! হাতেগোনা চার-পাঁচটি ছাড়া সবই ছ’মাস-তিনমাসের। সারা মাসে সাক্ষী-শুনানিতে ওঠে মোটে পাঁচ-ছ’টি। তাতে আবার বাদীপক্ষে সেই নিয়ামকই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে! অল্পের ভাগে কখনো সখনো অনিয়মিত সিনিয়র কোনো একপক্ষে! ঘুরেফিরে সাক্ষী-শুনানি যা একটু-আধটু হয় ওই নিয়ামকেরই সার্কিটের দিন তিনটাতে (টাইম পিটিশন পড়লে সে-দিনটাও মাটি)। তাতে বেলা গড়ায় একটা-দেড়টায় কোনোমতে। তারপরে পরিশ্রান্ত উকিল সাহেব, ফিরতে হবে ঘরে! সাক্ষী আর আসেইনি তো ঘর থেকে। শুনানির আর মামলাও নেই ডায়েরিতে। ফাঁকা এজলাসে সং সেজে ঢং ধরে বসা দেখে হাসবার লোক থাকে না একটাও! খামোখা আর বসে থাকা কেন তবে! নেমে পড়তে হতো তখনই। বাকি দিন তিনটাতে শুধু ওঠা আর নামা নামকাওয়াস্তে! টাইম পিটিশনে আর কতটুকুই-বা টাইম কাটে! কজলিস্টের ওপর ডায়েরি দিয়ে কষে ব্রিটিশ বেঁধে গেছে নিম্ন-আদালতকে। উকিল, মক্কেল, পাবলিক সবার জন্য রোজকার মামলার খবর রোজই লিখে দিতে হয় কজলিস্টে। ডায়েরিও রোজকারটা লিখতে হয় রোজই। মামলার খবরের পাশে তাতে লিখতে হয় সাক্ষী হলো কয়টা দোতরফাতে, কয়টা-বা একতরফাতে। মামলার খবরের আগেই কিন্তু লিখতে হয় তাতে বিচারককেই আপন হাতে, সেদিনে ঠিক কোন টাইমে কোর্টে এসে খাস কামরায় ঢুকলেন আর কোন টাইমে এজলাসে উঠে বিচারকাজে বসলেন। তেমনি আবার লিখতে হয় মামলার খবরের শেষে ঠিক কোন টাইমে বিচারকর্ম সেরে নামলেন এজলাস থেকে আর কোন টাইমে খাস কামরা ছেড়ে বিদায় হলেন কোর্ট থেকে। কোর্টের ডায়েরি বলে এটাকে। উকিল-মক্কেল-পাবলিক কারও দেখার নয়, কোর্টের কাছেই থাকে তা সংগোপনে। গোপন ডায়েরিখানা ওপেন করে পড়বেন শুধু জেলা জজ আর হাইকোর্ট ইন্সপেকশনের টাইমে। নিজের লেখায় নিজেই ধরা খাওয়ার নিদারুণ বন্দোবস্ত! ব্রিটিশের কী দারুণ বুদ্ধি! শুরুতেই ধরা খেয়ে গেলাম জেলা জজের হাতে। শিক্ষানবিশি ঘুচিয়ে সবে নেমেছি জজিয়তিতে, নবিশ একেবারে! ডায়েরিতে লিখতাম ওঠার টাইম প্রতিদিনই সাড়ে ১১টা। নামার টাইম, নামা হতো যেদিন যে-টাইমে। ওঠানামার আগে পরের বাকিটা টাইম ‘প্রশাসনিক ও অন্যান্য কাজ’। দেখেছি যে সত্যিকারের টাইমই লিখতে বলা আছে সিআরও-এর বিধিতে আর ডায়েরির ফরমে! ওঠানামার ধরাবাঁধা টাইমের হেরফের হলে তার কারণ লেখার কথাও স্মরণ করানো আছে ডায়েরির ফরমে। রোজকার হেরফেরের আমার একই কারণ সংক্ষেপে, ‘মামলার সংখ্যা স্বল্পতা’। রেলের ঘণ্টার কারণটা সংক্ষেপে লেখার কায়দা না পেয়ে টনটন করত মনটা! মাসখানেক যেতেই আচমকা পরিদর্শনে এসে হাজির জেলা জজ। গোপন খবরটা ফাঁস করে আগের দিনেই জেনে গিয়েছিল আমার পেশকার-সেরেস্তাদাররা। বিলম্বে হাজিরায় ধরা খায়নি কেউ! ধরা খেলাম ব্রিটিশের বুদ্ধিতে কষা সেই কোর্টের ডায়েরিতে। দেখে জেলা জজ বললেন: করেছ কী! এজলাস টাইমের গড়বড় প্রতিদিনই!

বললাম: সত্যিটাই লিখেছি স্যার! এই টাইমের আগে আর ওঠা যায় না, ওই টাইমের পরে আর নামা ছাড়া থাকা যায় না। ভেঙে বললাম সেই রমনা ট্রেনের ঘণ্টা আর নিয়ামকের সার্কিটের কারণটা। মামলা মঙ্গার কথা তো লেখাই আছে।

দেখেশুনে নরম হলো হুজুরের মনটা। এমন বেকায়দায় ধরাবাঁধা টাইমে ওঠানামা করার কায়দা বাতলাতে নিজেই পড়লেন বেকায়দায়! বেটাইমি ওঠানামায় আমার দোষ ধরেন কী করে! তাই বলে শুধু শুধু তো ছাড়া যায় না!

বললেন: নামার পরে বাসায় গিয়ে ঘুমাও তাহলে?

না, স্যার। উকিল সাহেবরা যায়। আমি স্যার খাস কামরায় থাকি।

এখানে ঝিমাও নাকি?

না, স্যার। ইজি চেয়ারে শুয়ে থাকলে আমার মাথা ধরে। টেবিল-চেয়ারে বসে কাজ করি। প্রশাসনিক ও অন্যান্য কাজ, ডায়েরিতে সত্যিটাই লিখেছি স্যার।  

তাই বলে এতক্ষণ?

জি স্যার। নথিপত্র সই ছাড়াও সমন-নোটিস ইস্যু হলো না কেন, হাওলা হলো না কেন, জারি হলো না কেন, ফেরত এলো না কেন, শামিল হলো না কেন, স্যুট রেজিস্টারে মামলা ওঠেনি কেন, নিষ্পত্তি নোট হয়নি কেন, রেকর্ড ফাইল ভাগ হয়নি কেন, নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া মামলার নথি রেকর্ডরুমে যায়নি কেন, তলবমতে নথি যায়নি কেন, আসেনি কেন, ঠিকমতো নকল দেয়নি কেন, প্রশাসনিক আরও সব কাজ করি। রায়-আদেশ লিখি, ফাঁকে জ্ঞানার্জনের জন্য ‘আইন পুস্তক ও সাময়িকী’ পড়ি। অন্যান্য এসব কাজের পরে আর সময় থাকে না স্যার। 

এবার ধরে বসলেন ডায়েরিতে লেখা টাইম নিয়ে। বললেন: যত যাই করো ওসব কাজের টাইম এজলাস টাইমের আগে আধা ঘণ্টা আর পরে আধা ঘণ্টা, এজলাস টাইম সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে চারটা। নির্ধারিত এই টাইমের বাইরে অন্য কোনো টাইম লেখা যাবে না ডায়েরিতে।

ভয়ে ভয়ে সবিনয়ে বললাম: তাহলে যে মিথ্যে লিখে ধরা পড়ব স্যার হাতে-নাতে! অতক্ষণের বিচারকাজ তো কোনোদিনই থাকে না ডায়েরিতে। 

বললেন: শুনানি না থাক, শুনানির প্রার্থনা নিয়ে বিচারপ্রার্থী আসতে তো পারে! সেই অপেক্ষায় বসে থাকাটাও বিচারকাজেরই অংশ, এজলাস থেকে নেমে খাস কামরায় বসে থাকলেও চলবে। মিথ্যে হবে কেন নির্ধারিত টাইম ডায়েরিতে লিখলে! 

(পরবর্তী অংশ আগামী কিস্তিতে)

লেখক

প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থকার; অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

  moyeedislam@yahoo.com