ছামিনা বেগম (৪৫)। সাত বছর আগে মারা গেছেন স্বামী। অন্যের বাড়ি অথবা দিনমজুরের কাজ করে পেটে ভাত জোটে। যেদিন কাজ পান না সেদিন সন্তানদের নিয়ে থাকেন অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে। স্বাভাবিক সময়ে জীবন দুঃখ-কষ্টে কাটলেও বন্যা এলে পরিবার নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন তিনি। এখন বাড়ির চারদিকে থৈ থৈ পানি। নিজের নৌকা তো নেই, নেই একটি কলা গাছের ভেলাও।
বানের পানিতে ঘর থেকে বের হওয়ার উপায় নেই ছামিনার। দিনমজুরের কাজও মিলছে না। এই কঠিন সময়ে এতিম তিন নাতি জোবাইদুল (৩), মামুন (১৩), জাহাঙ্গীর (৫) ও এক ছেলে ছামিদুল (১৬) এবং মেয়ে আল্পনাকে (১৪) নিয়ে পড়েছেন মহাবিপদে। বন্যার কারণে কাজ করতে না পারায় এক বেলা খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে তাদের।
ছামিনা কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের মরছিয়ালপাড়া এলাকার মৃত আজগার আলীর স্ত্রী। এই বন্যায় শুধু ছামিনা নন, তার মতো শত শত খেটে খাওয়া ও দিনমজুর মানুষজন পড়েছেন মহাসংকটে।
ছামিনা বেগম বলেন, ‘বাড়ির চারিদিকে পানি, বের হতে পারছি না, কাজকর্মও নাই। কারও বাড়ি যে যাব তারও সুযোগ নাই। কোনো রকমে এক বেলা ভাত জুটলেও তরকারি নাই। খেয়ে না খেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছি। ক্ষুধার জ্বালা নিজে সহ্য করতে পারলেও ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর খাবারের কষ্ট দেখে সহ্য হয় না। এই ভরা বন্যায় কাজের জন্য কোথাও যদি যেতে ইচ্ছে করে ছোট ছোট ৪-৫টা বাচ্চাকে একা রেখে যেতে পারি না। যদি কোনো অঘটন ঘটে যায়। গত দেড় বছর ধরে মা-হারা তিন সন্তানকে মানুষ করছি। তাদের মা ক্যানসারে মারা গেছে। বাবা থেকেও নেই।’
ছামিনার ছেলে ছামিদুল বলেন, ‘আমি ঢাকায় কাজ করতাম। বন্যার কারণে যেতে পারছি না। এদিকে এখানেও কাজ নাই। বাড়িতে খাবারও নাই, খুব বিপদে আছি আমরা। আমরা খাই না খাই, ছোট ছোট তিনটা ভাগ্নেকে নিয়ে খুব সমস্যায় আছি।’
এদিকে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানি স্থায়ী হওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে বানভাসীদের। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবারের সংকটে পড়েছেন তারা। বন্যাকবলিত এলাকায় তীব্র হয়ে উঠছে গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও।
এদিকে সরকারি-বেসরকারি ভাবে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ করছেন অনেকেই।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল বাতেন সরকার বলেন, ‘সরকারি ভাবে আমার ইউনিয়নের জন্য ৪ টন চাল পেয়েছি, সেখান থেকে ১০ কেজি করে বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অনেক বানভাসি মানুষকে চাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।’
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানান, ৯ উপজেলার বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৩৩৮ টন চাল, নগদ ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ১ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, ১৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকার শিশু খাদ্য ও ১৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকার গো-খাদ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপদসীমার ওপর কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বন্যার পানি ধীর গতিতে কমতে শুরু করেছে।